একদিন বিকেলে সে অর্জুনের টেলিফোন পেল বাঙ্গালোর থেকে।
‘কী ব্যাপার অর্জুন?’
‘এসেছি স্বর্ণকুমারীর টিমের সঙ্গে।’
‘কেন? হঠাৎ বাঙ্গালোরে?’
‘তুমি কোনো খবর রাখ না দেখছি। এখানে মেয়েদের একটা মিট হচ্ছে। এটাকে অলিম্পিক ট্রায়ালের ট্রায়াল বলতে পার। ইন্দো—সোভিয়েত কালচারাল এক্সচেঞ্জ বলে একটা ব্যাপার আছে জানো তো? একটা সোভিয়েত অ্যাথলেটিক্স টিম শ্রীলঙ্কায় গেছল। ইন্ডিয়া গভমেন্ট সেটাকে ভারতে আনিয়েছে। উদ্দেশ্যে, ওদের সঙ্গে কম্পিট করিয়ে আমাদের অ্যাথলিটরা কতটা আন্তর্জাতিক মানের সেটা পরখ করা। ‘সাই’ থেকে বিশেষ করে বলা হয়েছে সোনালি দশ হাজার মিটারে যেন অবশ্যই নামে। লং ডিসট্যান্সে দুটো রুশি মেয়ে এসেছে আর আমাদের তরফে নামবে চারটে মেয়ে। তাদের একজন সোনালি। ওর ম্যারাথন টাইমিং দেখে চমকে গেছে তো! বিশ্বাসই করতে চায় না পাতিয়ালার এনআইএস কর্তারা। ওরা একবার দেখে নিতে চায় স্বচক্ষে।’
‘কিন্তু ক—দিন হল সোনালি ম্যারাথন দৌড়েছে? দু—সপ্তাহ?’ রাহুল দেওয়াল ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাল। তারিখটা দেখে নিয়ে চট করে হিসেব করে ফেলল, ‘ঠিক সতেরো দিন। এর মধ্যেই আবার।’
‘ডা. সরকারও তো তাই বলছেন। তিনি তো রাজিই হননি। কিন্তু গভমেন্ট প্রেশার। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেই দিয়েছে এই মিটটায় না নামলে অলিম্পিকের জন্য সিলেকশন পাওয়া শক্ত হবে। ডা. সরকারের শর্ত, সোনালি সিলেক্টেড হলে পাতিয়ালা বা অন্য কোথাও গিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকা বা কোনো এনআইএস কোচের আন্ডারে ট্রেনিং নেওয়ায় তিনি রাজি নন। গভমেন্ট তাতে রাজি প্রোভাইডেড এই মীটে যদি তেমন কিছু ফল দেখাতে পারে।’
‘ডা. সরকার রাজি হয়েছেন তো?’
‘তা না হলে এখানে সবাই এসেছি কেন? উনি বুদ্ধিমান লোক। ব্যাপারটা কোনো জায়গায় শেষ মুহূর্তে আটকে যাক এটা চাইবেন না। তবে গজগজানি আজ বিকেলেও দেখেছি। বিজয় সিনহা সোনালিকে ওয়ার্ম—আপ করাতে নিয়ে যাবার পর আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হল। তোমার কাছ থেকে আর কোনো খবর না পেয়ে উনি খুব উদবিগ্ন।’
‘আমি পেপার ওয়ার্কে ব্যস্ত। কাদের কাছে অ্যাপ্রোচ করব, কখন করব, কী বলে করব সেই সব ঠিক করায় একটু সময় লাগে। ভালো কথা, মিট করে?’
‘কাল, দুপুরে। তোমার পক্ষে আসা কি সম্ভব?’
‘এত শর্ট টাইমে! দিল্লি—বাঙ্গালোর ফ্লাইট সকালে একটা আছে। আচ্ছা আমি ট্র্যাভেল এজেন্টকে ফোন করছি, যদি পাই চলে যাব। কোথায় হবে? সোনালির ইভেন্ট তো…”
‘কান্তিরবা স্টেডিয়ামে। আমি ওয়েস্ট এন্ড হোটেলে আছি, ওরা তিনজনও রয়েছে। দ্যাখো যদি পার। গুড নাইট।’
টেলিফোন রিসিভার না রেকেই রাহুল ডায়াল করল তার ট্র্যাভেল এজেন্টের অফিসে। কথা বলে সে আশ্বস্ত হল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তারা টিকিট পাঠিয়ে দিচ্ছে। সকাল দশটায় ফ্লাইট। দুপুর বারোটা নাগাদও যদি সে বাঙ্গালোরে নামে তাহলে পৌনে একটার মধ্যে স্টেডিয়ামে পৌছতে পারবে। অবশ্য এই হিসেবটা আন্দাজের করল কেননা স্টেডিয়াম যে বাঙ্গালোরে নামে তাহলে পৌঁনে একটার মধ্যে স্টেডিয়ামে পৌঁছতে পারবে। অবশ্য এই হিসেবটা আন্দাজেই করল কেননা স্টেডিয়াম যে বাঙ্গালোর শহরে কোথায় তা সে জানে না।
পরদিন সকাল ন—টায় পালাম এয়ারপোর্টে এসে রাহুল জানল, ফ্লাইটের বিলম্ব হবে অন্তত এক ঘণ্টা। বোম্বাই থেকে প্লেনটির আসার কথা কিন্তু যথাসময়ে আসছে না। রাহুল একবার ভাবল ফিরেই যাই। নিশ্চয় ভিভি কভারেজ দেবে। লাইভ না হলেও ভিডিও করে রাতের দিকে দেখাতে পারে। তারপরই সোনালির চেহারাটা তার চোখে ভেসে উঠল। লালমাটির রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে। কাঁদের উপর চুল লাফিয়ে উঠছে। পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে গোছ থেকে শার্টস পর্যন্ত পায়ের পেশি ফুলে উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছে। বুকে আলগোছে একটা কাঁপন লাগল। সে ঠিক করে ফেলল প্লেনের জন্য অপেক্ষাই করবে।
রাহুল বাঙ্গালোরে নেমে কান্তিরবা স্টেডিয়ামে পৌঁছে যখন গ্যালারিতে বসল, তখন মেয়েদের দশ হাজার কিলোমিটার দৌড় প্রায় শেষ হবার মুখে। স্টেডিয়ামে দর্শক হাজার দুই। অ্যাথলেটিক্স দেখতে ভারতে এখনও কোথাও ভিড় হয় না। ডা. সরকার বা অর্জুনকে খোঁজার সময় নেই। সে পাশের লোককে জিজ্ঞাসা করল, ‘কত পাক এখন চলছে?’
‘কুড়ি শেষ হল।’
রাহুল দেখে অবাক হল, দুটি রুশি আর চারটি ভারতীয় মেয়ে একসঙ্গে ছুটছে। কুড়ি পাক অর্থাৎ আট হাজার মিটার পর্যন্ত ভারতের মেয়েরা এইভাবে রুশিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে, এটাই তাকে অবাক করেছে।
তার চোখ আটকে রইল সোনালির উপর। রুশি মেয়েদের নাম সে জানে না। সকালে দিল্লির কাগজে এই মিটের কথা ছোটো করে এক কোণায় ছাপা হয়েছে বলে কিন্তু কারোর নাম দেওয়া হয়নি। তবে এটুকু সে জানে শ্রীলঙ্কায় রাশিয়ানরা তাদের নামি কোনো অ্যাথলিটকে পাঠবে না। দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির ছেলেমেয়েদেরই ওরা দুর্বল দেশগুরলোয় পাঠায়। গোহারান হারিয়ে দিয়ে বন্ধু দেশকে বিষণ্ণ করে দেওয়াটা ভালো কূটনীতি নয়।
রাহুল ধরে নিল এই মেয়ে দুটি উঁচুমানের নয়। সোনালিকে নয় সে বাদই দিল, অন্য তিনটি মেয়েও যখন পাল্লা দিচ্ছে তখন ওরা আন্তর্জাতিক মানের হতেই পারে না।
প্রথমে রুশি মেয়ে দুটি, তাদের গোড়ালিতেই সোনালি, সমান পদক্ষেপে। তার দশ মিটার পিছনে তিনটি ভারতীয় মেয়ে। কিন্তু এই দশ মিটার ব্যবধানটা একটুএকটু করে বেড়ে যাচ্ছে। রাহুল পাশের লোকটিকে অযাচিতই বলল, ‘এবার এই তিনজনের দম ফুরিয়ে আসছে। ওদের সঙ্গে পাল্লা না দিলেই পারত।’
