মিনতি কর এখন আর উচ্ছেদের ভয় দেখেন না। ওষুধ কোম্পানিটা উঠে গেছে। সেখান থেকে চব্বিশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। ভাড়া দিতে চেয়েছিলেন। অনন্ত বলেছে দরকার কী, যেমন চলছে চলুক।
‘সন্ধের পর বড্ড ভয় করে। ঘর থেকে বেরোতে পারি না, কলঘরেও যেতে পারি না…আর কী বিশ্রী গন্ধ। দরজা জানলা বন্ধ করে রাখি, হাঁপিয়ে যাই।’
অনন্ত চুপ করে শোনে। বৃদ্ধা হয়ে গেছেন কিন্তু যথেষ্ট সমর্থ। টিউশনি করে যাচ্ছেন, দোকান, বাজার, রান্না, জল তোলা নিজেই করেন। কিন্তু কতদিন করবেন? সে বিষণ্ণ হয়ে যায়। ওর ভালোবাসা এখনও কুড়ি—পঁচিশ বছর আগের মতো তীব্র আছে কি? ছবি আগলে থাকতে থাকতে ব্যাপারটা কি অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়নি? এখন তার মনে হয় বাড়াবাড়ি, দেখানেপনা।
সন্ধ্যায় অনন্ত বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে শুয়ে থাকে। একটা ট্রানজিস্টর কিনেছে। মাঝে মাঝে শোনে। গান, বাজনা, কথিকা শোনার কোনো বাছবিচার নেই। নাটক হলে মা দরজার কাছে এসে বসে। দোতলায় টিভি এসেছে। সে এখনও টিভিতে কোনো অনুষ্ঠান দেখেনি।
পাত্রীর জন্য বিজ্ঞাপনটা কেন দিল তার কোনো কারণ অনন্ত খুঁজে পায়নি। অমর হঠাৎ মাকে নিয়ে চলে যাবার পর আচমকা নিঃসঙ্গতার যে গর্তে সে পড়ে গেছে তাই থেকে উঠে আসার জন্যই কি একজন সঙ্গী চাইছে? কিন্তু সে ছোটোবেলা থেকেই তো নিঃসঙ্গ।
তিরিশ হাজার টাকার কাছাকাছি ব্যাঙ্কে জমেছে। ভাবলে তার অবাক লাগে। কী করবে টাকাগুলো! কোনো শখ, কোনো বাবুয়ানি নেই ফলে তার কোনো খরচ নেই। মিনতি করের মতোই কি দিন কাটাতে হবে? যদি কঠিন অসুখ করে, সেবা—শুশ্রূষার দরকার হয়, কে তাকে দেখবে!
রাত্রে অনন্তর ঘুম হল না। তার মনে হল, স্ত্রীর থেকেও তার বেশি দরকার একটা মানুষ, যে কিছু একটা করবে তার নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে।
রবিবারের কাগজে তার বিজ্ঞাপনটা বেরোবার সাতদিন পর সে খবরের কাগজের অফিস থেকে এগারোটি চিঠি আনল। রাত্রে চিঠিগুলো মন দিয়ে পড়ল। সবগুলোই কলকাতার এবং স্বয়ং পাত্রীদেরই লেখা। তিনটি চিঠি বেছে নিয়ে সে স্থির করল উত্তর দেবার আগে লুকিয়ে এদের একবার দেখে নেবে।
ঊর্মিলা দেব স্কুল—শিক্ষিকা। তার চিঠিতে দেওয়া ঠিকানা মতো সে স্কুলে বেরোবার সময় আন্দাজ করে জীর্ণ একটা বাড়ির দিকে চোখ রেখে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে রইল। অবশেষে সেই বাড়ি থেকে একজনকে বেরোতে দেখল যাকে তার মনে হল স্কুল—শিক্ষিকা। সামনে দিয়ে যাবার সময় একবার অনন্তের দিকে চাইল। তাদের চোখাচোখি হল। অনন্তের মনে হল বিনা অনুমতিতে তার দিকে তাকানোর জন্য যেন কৈফিয়ত চাইল চাহনি মারফত। এসব মেয়েমানুষ খাণ্ডারনি হয়। সে নাকচ করে দিল ঊর্মিলা দেবকে।
তার দ্বিতীয় অভিযান সত্তরের—বি রাধিকাপ্রসন্ন মিত্র লেনে। একতলা টিনের চালের বাড়ি। রাস্তার দিকে সামনের ঘরে দুটি জানালা। পিছনে একটা বটগাছ। চাকুরে নয় সুতরাং বাড়ি থেকে বেরোবার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। দু—দিন বাড়িটার সামনে দিয়ে সে হেঁটে গেল। জানলায় একটা মুখও দেখতে পেল না, দরজাটাও বন্ধ।
তৃতীয় দিন বিকেলে সে কড়া নাড়ল। মিনিট দুয়েক পর ভিতর থেকে নারীর কণ্ঠে প্রশ্ন এল, ‘কে?’
‘আমি, একবার কথা বলতে চাই।’
দরজা খুলে আটপৌরে ঢিলেঢালা বেশে, ঘুম—ভাঙা ফুলো চোখে যে দাঁড়াল তার নাম রেবতী সেনগুপ্ত। মাজা গায়ের রং, দীর্ঘাঙ্গী, ভ্রূ—র চুল তুলে চোখদুটি সাজানো, চোখা নাক, ডিম্বাকৃতি মুখ এবং মুখ বিস্ময়।
‘কাকে চাই!’
‘এখানে কি রেবতী সেনগুপ্ত থাকেন?’
‘আমিই।’
‘আপনি কি কাগজের একটা পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনের কোনো জবাব দিয়েছেন?’
রেবতী বিব্রত হল। শাড়ির আঁচলটা কাঁধে তুলে দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, দিয়েছি…আপনি?’
‘বিজ্ঞাপনটা আমি দিয়েছি, আমার জন্যই।’
রেবতী তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, ‘একটু দাঁড়ান’।
দরজা ভেজিয়ে ভিতরে চলে গেল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই একটি তরুণী দরজা খুলে তাকে ভিতরে আসতে বলল। মুখের আদল থেকে মনে হল রেবতীর বোন।
দরজার পাশেই ঘর। তক্তাপোশে লোটানো তোশক আর বালিশ একটা রঙিন নকশাদার বেডকভারে ঢাকা। অনন্তের মনে হল, এখুনি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ঘরের দরজায় এক প্রৌঢ়া বিধবা দাঁড়িয়ে।
‘রেবতী আমার বড়োমেয়ে। আমার তিন মেয়ে, তারপর এক ছেলে। ওদের বাবা সাত বছর আগে মারা গেছেন। বিজ্ঞাপনটা রেবতীই প্রথম দেখে।’
‘আমার নাম অনন্ত দাস। চিঠির জবাব না দিয়ে নিজেই চলে এলুম। বিজ্ঞাপন বা চিঠি থেকে সবকিছু বোঝা যায় না তো। চক্ষু—কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হয়ে যাওয়াই ভালো, আমারও বাবা নেই, বছর কুড়ি হল মারা গেছেন।’
সেই প্রথম তার রেবতীদের বাড়িতে যাওয়া। এরপর বাকি চিঠিগুলো নিয়ে তাকে আর মাথা ঘামাতে হয়নি।
সেদিন ঘণ্টাখানেক সে ছিল। রেবতী তাকে চুম্বকের মতো টেনেছে, তাকে উত্তেজিত করেছে, রাত্রে ঘুম হয়নি।
এরপরও তিনবার সে গেছে। পরিবারের সকলের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তার নিজের কথা, ভাই বোন মায়ের কথা, কষ্ট করে সংসার চালানো, অঘোর এস্টেটে অপ্রত্যাশিত চাকরি পাওয়া, বোনেদের বিয়ে, অমরের চলে যাওয়া, মা—র ক্যানসার—সবই সে বলেছে।
ওদের নিজেদের বাড়ি, দু—খানি ঘর। তিনদিনের মধ্যে দু—দিনই সন্ধ্যার সময় রেবতী বাড়ি ছিল না।
