‘মানুষ কোঁকড়াতে শুরু করল কখন?’
‘শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে। শহরের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বসবাসের মান খারাপ হতে লাগল। জীবন যাপনের ক্ষেত্রে একটা থমকানি এল। একশো বছরেরও উপর লাগল এর থেকে বেরিয়ে আসতে। তবে এখন আবার তাম্র যুগের উচ্চচতায় মানুষ ফিরে গেছে।’
‘ডা. সরকার এ সম্পর্কে কী বলেন?’
‘প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মাপের সত্যতা উনি মানতে চান না। শুধু শক্তিমান আর লম্বা প্রাণীরাই পূর্ণ বয়সে পৌঁছতে পারবে বেঁচে থেকে। তাই ওনার মতে, সভ্য যুগে যখন দুর্বলদের পক্ষেও বেঁচে থাকা সম্ভব, তখন সভ্য যুগের সঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক যুগের তুলনা করাটা বোকামি, অর্থহীন। ওর মতে এখনকার গড়পড়তা লোকই পৃথিবীর ইতিহাসে সব থেকে লম্বা, আর উনি মানতে চান না যে আমরা বৃদ্ধির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। যতদূর মনে পড়ছে একদিন উনি আমায় বলেছিলেন, মানুষের আগামীকালে যতটা বৃদ্ধি ঘটবে অন্তত পরের ছয় দশকের বৃদ্ধি ধারণ করার মতো ক্ষমতা তার দেহ কাঠামোর গঠনের মধ্যে আছে।’
রাহুলের মনে পড়ল, অর্জুনের বাড়িতে সারদাচরণ ফিল্মের মধ্য দিয়ে প্রথম স্বর্ণকুমারীকে তাদের দেখান একবিংশ শতাব্দীর স্ত্রী জাতির অবিকল নমুনারূপে।
‘এটা কি খুবই গুরুত্বপূর্ণ?’ রাহুল বলল।
‘সরকারের কাছে অন্তত তাই। ওর হামবুর্গের রিসার্চ ওর কাছে জীবনের প্রধান আর একমাত্র জিনিস। ওনার যাবতীয় থিওরির মূল ভিতই এটা। ওর ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির থিওরিটা নিয়ে উনি একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে যান। কিন্তু আর কোনো বিশেষ সারবস্তু ওতে যোগ করতে পারেননি। বহু লোক, এমনকি আমরাও অবাক হয়ে ভাবি, আপনিও ভেবেছেন, সত্যিই কী এটা গুরুত্বপূর্ণ?’
প্লেনের লাউডস্পিকারে ঘোষণা হল জলপান দেওয়া হবে। প্লাস্টিকের ট্রে হাতে এয়ারহোস্টেসদের আনাগোনা শুরু হল। সামনের সিটের পিছন থেকে টেবল নামানো হতে লাগল। রাহুলও ডা. সুদ আলোচনা বন্ধ রেখে চিজ স্যান্ডুইচ ও একটি রসগোল্লা দিয়ে জলপান সারল। দুধ আর কফি—পট দু’হাতে নিয়ে একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কফি?’ রাহুল মাথা নাড়ল। তার পিছনেই এল আর একটি মেয়ে। ‘টি?’ রাহুল ‘ইয়েস’ বলতেই সে ঝুঁকে চায়ের লিকার এবং তারপর দুধ টেবলে রাখা কাপে ঢালতে লাগল। এই সময়টুকুর জন্য তার রাধিকা পাইনকে মনে পড়ল। বুক থেকে কোমরের ধরটা ঠিক একইরকম।
‘মি. অরোরা একটা কথা জানবেন, ‘ডা. সুদ আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এইসব লোকেরা এমন কিছু একটা করে ফেলতে পারেন যা আমাদের চিন্তাধারাকেই বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রতি একজনের সাফল্যের জন্য কয়েক ডজন লোককে ব্যর্থতা বরণ করতে হয়। পূর্ণতার বদলে তারা পায় শূন্যতা। ডা. সরকার এই শেষের দলে পড়েন। চণ্ডীগড় ছেড়ে তিক্ত মন নিয়ে তিনি চলে যান।’
‘ডা. সরকারের থিওরি সম্পর্কে এবার একটা বোকার মতো প্রশ্নই করব। তিনি প্রমাণ করতে চান, মানুষের কঙ্কাল গঠনগতভাবে দেহের বৃদ্ধিটা নেওয়ায় সক্ষম, তাই তো?’
‘তার আগে মানুষের বৃদ্ধি সম্পর্কে তাঁর যুক্তিটা কতটা নির্ভরযোগ্য সেটা দেখতে হবে। অনুপাত আর উপাদান বদল না করে কোনো প্রাণীরই নিজস্ব চেহারার বিশেষ একটা আকার ছাড়ানো, বদল ঘটানো প্রকৃতির পক্ষে অসম্ভব, এটা গত তিনশো বছর ধরে বহু বৈজ্ঞানিকই বলে এসেছেন।’
‘আচ্ছা কৃত্রিমভাবে কি শরীরের বৃদ্ধি সম্ভব?’
‘অ্যানাবলিক স্টিরয়েড? না, ওতে লম্বা হওয়া যায় না।’
‘তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি ঘটানো যায় না?’
‘বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটা এখনও বায়োলজিক্যাল ধাঁধা হয়ে রয়েছে।’
‘হরমোন টরমোন দিয়ে? বৃদ্ধিটা নিয়ন্ত্রণ করে তো এই দিয়েই?’
‘পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে সোমাটোট্রপিক—মানুষের বৃদ্ধির হরমোন বেরোয়—’
‘এই হরমোন কৃত্রিমভাবে যদি শরীরে দেওয়া হয় তাহলে কী হবে?’ রাহুলের ঘুরে বসার চেষ্টা থেমে গেল কোমরে বাঁধা সিটবেল্টে বাধা পেয়ে। সে অনেকখানি এগিয়েছে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে। এখন একটা ক্ষীণ আলো যেন দেখতে পাচ্ছে।
‘বিশেষ এক ধরনের বামনদের উপর এটা প্রয়োগ—’
‘বামনটামন নয়, স্বাভাবিক শিশুদের উপর যদি প্রয়োগ করা হয় তাহলে কী হবে?’
ডা. সুদ কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন। ‘জানি না, আমার কোনো ধারণা নেই। তা ছাড়া আমি তো কারণ দেখতে পাচ্ছি না এটা করার?’
‘কারণ হয়তো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লম্বা হবে।’
ডা. সুদ চুপ করে রইলেন।
‘স্বাভাবিক শিশুর দেহে বৃদ্ধির হরমোন ঢুকিয়ে দেওয়া নিশ্চয় বীভৎস চিন্তা, কেউই তা করবে না। যদি কোনো ঘাটতি থাকে তাহলে ঠিক আছে কিন্তু স্বাভাবিক শরীরে উচিত নয়। ব্যায়াম করে তো লম্বা হওয়া যায়?’ রাহুল বলল।
‘খুব সামান্য। বৃদ্ধিটা একটু তাড়াতাড়ি ঘটানো যায় মাত্র, তবে আপনি তো জানতে চাইছেন স্বাভাবিক উপায়ে লম্বা হওয়া ছাড়াও আর কোনোভাবে মানুষকে লম্বা করা যায় কিনা?’
‘একেবারে ঠিক কথাটাই বললেন।’
‘মধ্যযুগে লোককে ধরে এনে অত্যাচার করার জন্য, হাত আর পা বেঁধে দু—দিকে টানা হত। এতে লম্বা বোধহয় করা যায়। অত্যাচারের সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হত, সত্য আবিষ্কারের জন্য নাকি এটা করা হচ্ছে।’
রাহুল মাথা নেড়ে বলল, ‘এটা ভেবে দেখব।’
সাত
স্বর্ণকুমারীকে কমার্শিয়াল হাউসগুলোর কাছে বিক্রি করার কৌশল ভাঁজতে ব্যস্ত রইল রাহুল। কীভাবে প্রচার শুরু হবে, ধাপেধাপে কোনটের পর কোনটে আসবে সেটার খসড়া তৈরির কাজে সে নিজেকে এমন নিবদ্ধ রেখেছিল যে কলকাতার বা বর্ধমানের কোনো খবর রাখেনি।
