‘প্রস্তাবটা ভালো।’ প্রণব দত্ত বলল, ‘কিন্তু ষাট লাখের কম উঠলে কী হবে?’
‘আপনাদের ছ লাখ টাকা আপনারা পাবেনই, ট্রাস্টে তিরিশ লাখ টাকা তাহলে হবে না। মনে রাখবেন ষাট লাখের বেশি উঠে গেলে বাড়তি টাকাটা ট্রাস্টেই যাবে।’
‘আমার সায় আছে, ছ—লাখ তো গ্যারান্টেড।’ সুরজ সিং
‘যদি দুটো সোনা জেতে।’ রাহুল মনে করিয়ে দিল।
‘তাহলে চুক্তিপত্র তৈরি করার জন্য আমার উকিলকে বলছি।’ সারদাচরণ কথার সুরে জানিয়ে দিলেন এটাই পাকা সিদ্ধান্ত।
.
সেইদিনই বিকেলের ফ্লাইটে রাহুল দিল্লি ফিরল। দমদমে সিকিউরিটি চেকিংয়ের পর সে একটা চেয়ারে বসে যখন অপেক্ষা করছে তখন তার পরিচিত এক ডাক্তারকে হাতে ব্রিফকেস নিয়ে ঢুকতে দেখে সে দাঁড়িয়ে উঠে হাত নেড়ে ডাকল। ঘণ্টা দুয়েকের জন্য একজন সঙ্গী পেলে সময়টা তাহলে আর ব্যাজার হয়ে কাটাতে হবে না। ডাক্তার সুদের বোন কানাডায় টরন্টোয় থাকে। ডা. সুদ বোস্টনের টাফটস ইউনিভার্সিটিতে বায়োকেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট করতে গেছলেন। সেখান থেকে সাতদিনের জন্য বোনের সঙ্গে দেখা করতে আসেন তখন রাহুলের সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়েছিল।
বেঁটেখাটো, গৌরবর্ণ, টাই সুট পরা ডা. সুদ রাহুলকে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন।
‘কেমন আছেন ডা. সুদ? অনেকদিন পর, চিনতে পারছেন?’
‘অবশ্য অবশ্য। আপনি আমার খোঁজ না রাখলেও আমি কিন্তু রাখি। এখন তো আপনি বিরাট ব্যবসা বানিয়েছেন। আপনার এক ক্লায়েন্ট আমার পেশেন্ট, তার কাছ থেকে খবর পেয়েছি।’
‘কে আমার ক্লায়েন্ট?’
‘ডান্সার কৃষ্ণমোহিনী। তার পায়ের একটা ব্যাপার। নাচতে শুরু করার পরই পা ভারী হয়ে যাচ্ছে। স্টিফ হয়ে যাচ্ছে মাসল। ব্যথা শুরু হচ্ছে।’
‘কৃষ্ণমোহিনীর এরকম অবস্থা তাতো জানতাম না, কিছু তো আমায় বলেনি। এখন ও আর কোথায়?’
‘গত সপ্তাহে আমার কাছে চণ্ডীগড়ে এসেছিল।’
‘সিরিয়াস?’
‘হ্যাঁ সিরিয়াসই। নাচ একদম বন্ধ করতে বলেছি, অন্তত যতদিন না ব্লাড সুগার নর্ম্যাল হয়।’
রাহুল মনে মনে উদবিগ্ন হলেও মুখে তার চিহ্নও রাখল না। যেন কিছুই নয় এমন ভাব করে প্রসঙ্গ ঘোরাল। ‘আপনি চণ্ডীগড়ে কোথায় এখন, হসপিটালে?’
‘আমি আছি ইনস্টিট্যুট অব হিউম্যান সায়েন্সে। একদিন আসুন না।’
রাহুলের মাথার মধ্যে নামটা ধাক্কা দিল। ডা. সরকার এইখানেই তার গবেষণা নিয়েছিলেন। কীসের যেন গবেষণা?
‘আচ্ছা আপনাদের ইনস্টিট্যুটে ডা. সরকার বলে কেউ কি ছিলেন?’
‘ডা. সরকার? হ্যাঁ ছিলেন তো। চেনেন নাকি?’
‘না। তবে ওর এক আত্মীয়কে চিনতাম। তার কাছে শুনেছিলাম উনি কী একটা বিষয়ে ওখানে…।’ কথাটা অসম্পর্ণ রেখে সে ডা. সুদের মুখভাব লক্ষ করল। কিরকম যেন, তাচ্ছিল্য, শ্রদ্ধা, ভয় সব মিলিয়ে একটা ভাব ওর মুখে।
এয়ারক্র্যাফটে চড়ার জন্য ঘোষণা হচ্ছে। দরজার দিকে হুড়মুড়িয়ে সবাই ছুটেছে বাসে ওঠার জন্য।
‘প্লেনে উঠে আপনাকে বলব ওর কথা, ‘ড. সুদ যেচেই বললেন রাহুলকে।
রানওয়ে দিয়ে ছুটে জমি ছাড়ায় এবং সিট বেল্ট বাঁধার নির্দেশ জ্বলা অক্ষরগুলো নিভে যাবার পর ডা. সুদ পাশে বসা রাহুলকে একগাল হেসে বললেন, ‘এই সময়টায় আমি একটু ভগবানের নাম করি। এত কাজ যে ফুরসত পাই না।’
‘তবু তো টেকঅফের সময় করেন, ল্যান্ডিংয়ের সময় ভগবানকে ভুলে যান না তো? তখনও করবেন কিন্তু।’
‘নিশ্চয় করি। একটু বেশিই করি।’
‘ডা. সরকার সম্পর্কে বলবেন বলেছিলেন। আচ্ছা, একটা কথা বলে রাখি, কোনো একটা ব্যাপারে আমি ওর সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক। দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব হিরেডিটি অন হিউম্যান গ্রোথ নামে উনি একটা প্রোজেক্ট শুরু করেন যখন হামবুর্গে ছিলেন, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘একটা প্রোজেক্টে, যার সম্পর্কে আপনকে বলতে পারব না, কেননা কথা দিয়েছি কাউকে এখন জানান যাবে না, উনি এবং অনেকে ইনভেস্ট করেছেন। কেন, কী উদ্দেশ্য করেছেন সেটা বুঝতে পারছি না বলেই কেমন যেন ধাঁধার মতো লাগছে। কোন ব্যাপারটা ওকে মোটিভেট করছে? আচ্ছা ওকে আপনি চেনেন কতটা?’
‘চণ্ডীগড়ে ওর বিভাগেই আমি এক বছর ছিলাম। বছর তিনেক আগে উনি স্বেচ্ছায় রিটায়ার করে চলে যান। কাজের বাইরে ওর সম্পর্কে কিছু জানি না। শরীর সম্পর্কে ওর কিছু থিওরি আছে।’
‘কী সেগুলো?’
মানুষের শরীরের বৃদ্ধি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়াতেই বহু বছর কাটিয়েছেন। তাই থেকে সিদ্ধান্তে এসেছেন প্রতি দশকে এক সেন্টিমিটার করে গড় মানুষের বৃদ্ধি ঘটছে। সরকারের স্টাডিটা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণেই এটা সম্পর্কে আগেও স্টাডি হয়েছে। তাদের গবেষণা হয়েছিল কমবয়সিদের নিয়ে যখন শরীরের পুরো বৃদ্ধি ঘটেনি, অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সরকার কাজ করেন পরিণত শরীরের মানুষ নিয়ে। মুশকিলটা হল, সরকারের কথা মতো, মানুষ প্রতি দশকে এক সেন্টিমিটার করে বাড়তে থাকলে একদিন তো কিংকংয়ের আকার নেবে? দুশো বছর পরে সবাই তো কুড়ি সেন্টিমিটার বা আট ইঞ্চি লম্বা হয়ে যাব! প্রশ্নটা হল, মানুষের হাড়ের গঠন যেভাবে সাজানো তাতে কি এই বৃদ্ধির সঙ্গে তা তাল রাখতে পারবে? উনি এ সব কথা মানতে চাইলেন না।’
‘কেন তাল রাখতে পারবে না?’
‘এখন মানুষের গড় উচ্চচতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। এটাই চূড়ান্ত আর মানুষের দেহ কাঠামো প্রস্তর যুগের মানুষের থেকে এখন পর্যন্ত খুব একটা বদলায়নি। কঙ্কাল মেপে দেখা গেছে প্রস্তর যুগে মানুষের গড় উচ্চচতা ছিল পাঁচ ফুট নয়, তাম্র যুগে পাঁচ—আট, লৌহ যুগে পাঁচ—ছয়। আবার মধ্য যুগে পাঁচ—সাত।
