‘আপনি কী বলতে চান?’ সুরজ সিং বলল।
‘রক্ষাকবচ বলতে যা বোঝায়, তাই। ধরুন আপনাদের মধ্যে কেউ সতীপ্রথার পক্ষে আন্দোলনে যোগ দিলেন, আর ঠিক করলেন আপনার যুক্তির পক্ষে তার মুখ দিয়ে দু—চার কথা বলবেন। যে মুহূর্তে সে এই ব্যাপারে মুখ থেকে কথা খসাবে সেই মুহূর্তেই কমার্শিয়াল দিক থেকে সে খতম হবে।’
‘না, না, আমরা সতীপ্রথার বিরুদ্ধেই।’ হীরাভাই কথাটা বলে সুরজ সিংয়ের দিকে পানমশালার কৌটো এগিয়ে দিল।
‘স্বর্ণকুমারীর চরিত্র হতে হবে দৃষ্টান্তযোগ্য এবং বিতর্কের বাইরে, এটাই আমরা ধরে নিচ্ছি।’ সারদাচরণ বললেন। ‘তাহলে আপনাদের কারুরই এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই বলেই মনে হচ্ছে। মি. অরোরা এ ক্ষেত্রে কী আমরা—’
‘এখনও বাকি আছে। প্রোমোশনাল ক্যাম্পেনের সময়টা ঠিক করার কথাটা এখনও বাকি। অলিম্পিকের ঠিক পরেই, সব থেকে সুবিধাজনক সময়ে, যখন পাবলিক ইন্টারেস্ট একেবারে তুঙ্গে আপনারা চান ঠিক সেই সময়ে ধাক্কা দেবার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা তৈরি করে রাখতে। তা করতে হলে খুঁটিনাটি যাবতীয় কথাবার্তা অলিম্পিকসের আগেই চালাতে হবে। স্বর্ণকুমারীর সাফল্যের উপরই শর্ত সাপেক্ষে চুক্তিগুলো হবে কিন্তু গেমসের আগেই ব্যবসার কর্তাদের সঙ্গে অবশ্যই কথা বলা শুরু করতে হবে। কিন্তু তারপর ওর দুটো লং ডিস্টান্স সোনা জেতার স্বপ্ন কিন্তু আর গোপনে রাখা সম্ভব হবে না।’
‘এটাও আমরা মেনে নিচ্ছি ম্যারাথনে তো ধরেই নেওয়া যায় ও নির্বাচিত হয়ে গেছে। দশ হাজার মিটারেও হলে, তখনই তো ব্যাপারটা লোকে বুঝে নেবে।’ সারদাচরণ বললেন।
‘ট্রায়ালের পর একমাস মাত্র সময় পাচ্ছেন, তাতে হবে?’ প্রণব দত্ত এই প্রথম মুখ খুললেন। ঋজু, ব্যক্তিত্ব ভরা কণ্ঠস্বর।
‘হতেই হবে।’ রাহুল বলল।
‘মি. অরোরা আপনি কত পারসেন্ট নেবেন?’ হীরাভাই ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে পানমশলার কৌটোটা টেনে আনল সুরজ সিংয়ের সামনে থেকে।
‘এই কাজটার জন্য পনেরো পারসেন্ট।’
‘হায় নারায়ণজি, তাহলে আমাদের জন্য কত থাকবে?’ হীরাভাই শুকনো মুখে তাকাল।
‘পঁচাশি,’ রাহুল ঝুঁকে বলল, ‘হিসেব করতে সুবিধে হবে মনে হলে আপনি আমাকে কুড়িই দেবেন।’
‘আমরা কত তুলতে পারব বলে আপনি মনে করেন?’ প্রণব দত্ত দ্রুত কাজের কথায় এল। তাকে প্লেন ধরতে হবে।
‘যদি দুটোই জেতে আর তারপরও শ্বাস টেনে যায়, তাহলে আমার অনুমান ষাট লাখের মতো।’ রাহুল শান্ত গলায় বলল।
কিছুক্ষণ ঘরটা নীরব থাক। সবাই মানসাঙ্কে ব্যস্ত।
‘আমি রাজি।’ হীরাভাই বলল।
‘আমিও।’ অর্জুন নিজের মতো জুড়ে দিল।
‘মি. অরোরাকে কমিশন দিয়ে আমাদের যা থাকবে তাকে পাঁচ ভাগ করলে প্রত্যেকের নয় লক্ষের কিছু বেশি হবে।’ সুরজ সিং বলল।
‘আমার কোনো আপত্তি নেই।’ প্রণব দত্ত মাথা হেলাল।
‘এক সেকেন্ড, স্বর্ণকুমারী এর থেকে কত পাবে?’ রাহুল জানতে চাইল।
সারদাচরণ তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘নিশ্চয়, আমি ওর ব্যবস্থা করব। আমরা স্বর্ণকুমারীর নামে একটা কর্পোরেশন গঠন কর। আমরাই বোর্ডের সদস্য হব। লাভের আমার অংশ থেকে যা পাওয়া যাবে তাতে ওর বাকি জীবন চলে যাবে।’
‘কিন্তু বোর্ডে তো স্বর্ণকুমারী নেই।’ রাহুল বলল।
‘বয়সটা খুবই কম।’ সারদাচরণ মাথা নাড়লেন। বরং ওর তরফে একটা ট্রাস্ট ফান্ড করা হোক। আমার ভাগ্যের একটা বড়ো অংশ ওকে দেওয়া হবে।’
‘কত বড়ো অংশ?’
‘এখনও তা ঠিক হয়নি, তবে আমার ইচ্ছে অন্তত এক তৃতীয়াংশ। আপনার অনুমান ঠিক হলে, তাহলে তিনলাখ।’
রাহুল দ্রুত চিন্তা করল। বোর্ডে যোগ দিলে সোনালির বিশেষ কিছু লাভ হবে না। বরং ট্রাস্ট পড়াই ভালো। এইসব ব্যবসায়ীদের সঙ্গে টাকাপয়সার ব্যাপারে দর কষাকষির সুযোগ কম, তবে যতটা নিংড়ে বার করা যায় করে দেখবে।
‘স্বর্ণকুমারী কর্পোরেশন প্রস্তাবটাই মনে হয় ভালো। কিন্তু যেটা আমাকে চিন্তায় ফেলেছে সেটা হল, আয়ের টাকার কতটা স্বর্ণকুমারী পাবে। খবরের কাগজ যদি জানতে পারে স্বর্ণকুমারীর প্রত্যক্ষ কোনো রকম অধিকার এই কর্পোরেশনে নেই তাহলে লেখালেখি শুরু হবে। এর থেকে ট্রাস্টই ভালো। কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকার কতটা অংশ ট্রাস্টে যাচ্ছে, এই নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। হিসেবে দাঁড়াচ্ছে পাঁচ পার্সেন্ট। খবরের কাগজ বলবে মাত্র পাঁচ! এটা তো একটা মেয়েকে শোষণ, বঞ্চনা। আমি আপনাদের সমালোচনার জন্য বলছি না, শুধু পাবলিক রিলেশনের কথা ভেবেই বলছি।’
‘আপনি বলছেন মেয়েটির অংশ বাড়িয়ে দিতে?’ প্রণব দত্ত ভ্রূ বাঁকিয়ে বলল।
‘পঞ্চাশ পার্সেন্ট করলে ভালো হয়।’
ঘরে আবার নীরবতা বিরাজ করল। সেটা প্রথম ভাঙল হীরাভাই।
‘যদি ফিফটি পার্সেন্ট করা হয় তাতে আপনার সুবিধেটা কী?’
‘আমার স্বার্থ হল লোককে কী বলা হচ্ছে। কাগজ ক্ষেপে উঠলে প্রোজেক্টের প্রচুর ক্ষতি হবে।’
‘কীভাবে স্বর্ণকুমারীর অংশ বাড়াতে বলছেন?’ সারদাচরণ হুঁশিয়ার গলায় বললেন।
‘দেখুন সত্যিকথা বলতে, আপনারা ষাট লাখ টাকা উঠবে এটা কখনো ভাবতে পারেননি। অঙ্কটা হয়তো ভুলও হতে পারে। তবে সম্প্রতি কয়েকজন সে পর্যায়ে রাস্টারের কনট্রাক্ট নিয়ে কথাবার্তা চালিয়ে আর মেয়েটির মার্কেটে বিকোবার মতো প্রবল পার্সোনালিটি দেখে মনে হয়েছে ষাট লাখের মতো উঠতে পারে। শুনে আপনারা যে অবাক হয়েছিলেন সেটা আমি দেখেছি।’ রাহুল থেমে তার পরের কথাটার জন্য ওদের প্রস্তুত করাল। ‘মি. পটেল, মি. দত্ত, মি. সিং, মি. হালদার প্রত্যেকের জন্য ছয় লাখ টাকা গ্যারান্টি দেওয়া, পাবেনই। যদি ষাট লাখ ওঠে তাহলে আমার এজেন্সিও নেবে ছয় লাখ। সোনালি পাবে মোট টাকার পঞ্চাশ ভাগ। লোকে তাই জানবে। সে নিজের ভাগ থেকে তার বাবাকে কত দেবে সেটা বাপ—বেটির নিজেদের ব্যাপার।’
