‘এবার ফিরব। তার মধ্যেই ওগুলো কপাকপ শেষ করে ফেলা চাই। মাঝে মাঝে না ভাঙলে বিধিনিষেধগুলো ঠিকমতো মানছ কিনা বুঝবে কী করে!’
সোনালির মুখে হাসি ফুটল। মোড়ক ছিঁড়ে চকোলেট বার করে ভেঙে আধখানা এগিয়ে ধরল। ‘বিধিভাঙা শেখাবার জন্য এটা আপনার প্রাপ্য কমিশন।’
‘কমিশন আমি কখনো ছাড়ি না।’ চকোলেট হাতে নিয়ে রাহুল বলল, ‘তুমি কথা বলা শিখলে কার কাছে?
‘টেপ করা কয়েকশো প্রশ্ন আর তার উত্তর আমাকে সপ্তাহে দু—দিন শুনতে হয়েছে। জেতার পর বার্সিলোনায় আমাকে প্রেসের লোকেদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। তাও আমাকে তৈরি করান হয়েছে।’
‘তোমার শাড়ি পরতে ইচ্ছে করে?’
‘ভীষণ। কিন্তু পরা বারণ। পা ফেলায় একটা বদ অভ্যাস নাকি হয়ে যাবে।’
‘কাল ম্যারাথন দৌড়েছ এখন তো তোমার বিছানায় শুয়ে থাকার কথা। পায়ে ব্যথা হয়নি?’
‘হয়েছে। এখনও কিরকম ভারী হয়ে রয়েছে। এই রকম আড়ষ্টতা হয় লং ডিস্ট্যান্স ট্রেনিংয়ের পর।’
রাহুল মুখ ফিরিয়ে সোনালির মুখটা দেখে নিয়ে এবার গাড়ির গতি বাড়াল। অন্ধকার নেমে গেছে। রাস্তায় দোকানে আলো জ্বলে গেছে। সুরুচি তাদের দেখতে না পেলে কিছু ভাবতে পারে। রাহুলের বরয়সও সুদর্শনত্বকে অভিভাবকরা দুশ্চিন্তার কারণ মনে করলে, খুব ভুল তারা করেন না।
ঠিক সময়েই মারুতি পৌঁছল। সুইচটা বদলানো ছাড়া আর কিছু করতে হয়নি। সুরুচি কিছু বলার আগেই রাহুল বলল, ‘আমার এক বোন এখানেই থাকে, বেকবাগানে, সোনালিকে দেখতে নিয়ে গেছলাম। বোন তো দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিল না এমন একজন নামী লোক তাঁর বাড়িতে এসেছে।’
‘কিন্তু দাদার বারণ ছিল কারুর সামনে…’
‘না না সেরকম হইচই ওখানে হয়নি।’ রাহুল লক্ষ করল সোনালির মুঠোয় তখনও ধরা দুটো চকোলেট বার, সন্তর্পণে জিনসের পকেটে সে ঢুকিয়ে দিল।
টিভি সেট নিয়ে ওরা ফিরে এল। রাহুলই দুহাতে ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে তুলল দোতলায়। ঘরে বসিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘এবার চলি, খুব ভালোই কথা হল। ডা. সরকারের সঙ্গে এবার কথা বলব।’
ছয়
‘তোমার একটা কল এসেছিল বর্ধমান থেকে।’
রাহুল ফেরামাত্র অর্জুন তাকে জানাল।
‘কল? দিল্লির? কিন্তু আমি তো বলেছিলাম কোনো কাজের কথা—’
‘কাজেই কথাই তবে তোমার অফিস থেকে নয়। বর্ধমান থেকে ডা. সরকারের। কাল সকালে আমার এখানে কনসরটিয়ামের মিটিং, নটায়, তুমি অবশ্যই থাকবে।’
‘কীজন্য, কিছু বলেছেন?’
‘হ্যাঁ। স্বর্ণকুমারীর কমার্শিয়াল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলোচনা। সব মেম্বারের সামনেই সেটা হবে।’
‘ভালো। আমি এখন একটু ঘুমোব।’
‘এই সন্ধেবেলায়?’
‘হ্যাঁ। কেন জানি হঠাৎই টায়ার্ড লাগছে।’
রাহুল তার ঘরের দিকে চলে গেল। এখন সে ভাবতে চায়। এই প্রোজেক্টেরই কথা নয়, সোনালির ভবিষ্যতের কথাও। তার দুঃখ হচ্ছে মেয়েটির জন্য।
রাহুল কাঁটায় কাঁটায় ন—টায় অর্জুনের বাড়ির একতলায় মিটিং রুমে ঢুকল। ছোটো ঘর। একটা লম্বা টেবল। দুধারে আটজন বসার জন্য আটটা গদি আটা চেয়ার। টেবলের মাথায় একটি। সেখানে এখন বসে আছেন ডা. সরকার। হীরাভাইকে সে চিনল কিন্তু অন্য দুজন তারা অপরিচিত।
ডা. সরকার হাত বাড়িয়ে একটা চেয়ার দেখিয়ে তাকে বসতে বললেন। সবাই তার দিকে তাকিয়ে। অর্জুনের পাশের চেয়ারে সে বসল।
‘মি. অরোরার সঙ্গে আমাদের দু—জন মেম্বারের পরিচয় এখনও হয়নি। আমার ডানদিকে রয়েছেন সুরজ সিং, ধানবাদে থাকেন, কয়লা আর ট্রাকের ব্যাবসা’ রাহুল মাথা ঝোঁকাল। সুরজ সিং বিশাল গোলাকার মুখ থেকে একটা শব্দ বার করল। বোধহয় নমস্কার বলল। ‘আর আমার বাঁ দিকে রয়েছেন প্রণব দত্ত। কলকাতাতেই থাকেন। জমির স্পেকুলেশন, ডেভেলপমেন্ট, অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরি এইসবের ব্যাবসা।’ রাহুল এবারও মাথা ঝোঁকাল। প্রণব দত্ত ডান হাতের দুটো আঙুল নাকের কাছে তুলল। ‘আর মি. অরোরার পরিচয় এখানে যারা রয়েছেন সবাই জানেন।’
সারদাচরণ সবার মুখের উপর চোখ বুলিয়ে আবার শুরু করলেন, ‘আজ সময় খুব কম। প্রণববাবু এগারোটার ফ্লাইটে বাঙ্গালোর যাবেন, সুরজবাবুও পাটনা যাবেন তার একটু পরেই, তাই যা সিদ্ধান্ত নেবার দ্রুতই নিতে হবে। আপনারা জানেন, মি. অরোরাকে এখানে আসতে বলেছি আমাদের প্ল্যান সম্পর্কে তাকে ওয়াকিবহাল করার জন্য। উদ্দেশ্যটা হল বার্সিলোনায় স্বর্ণকুমারীর জেতার পর তার হয়ে কমার্শিয়াল যা করণীয় তাই করার জন্য। মি. অরোরা, আপনি মোটামুটিভাবে এই প্রোজেক্ট সম্পর্কে একটা ধারণা ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন। ধরে নিতে পারি আপনার এজেন্সি এর সঙ্গে যোগ দেবে কি না সে সম্পর্কে আপনি একটা সিদ্ধান্তে এসেছেন।’
‘আপনি কি থাকবেন?’ হীরাভাই বলল।
‘প্রথমে কয়েকটা ব্যাপারে একটু পরিষ্কার হতে চাই।’ রাহুল টেবলে দুই কনুই রাখল। ‘সোনালি সরকারের এজেন্ট হিসেবে আপনারা রাহুল অরোরা অ্যাসোসিয়েকটসকে অর্থাৎ র্যা—কে একমাত্র স্বত্ব দিতে চেয়েছেন, যে সব কমার্শিয়াল গ্রুপ তার নাম, ছবি, পার্সোনাল এনডোর্সমেন্টে আগ্রহী তাদের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য। রেডিয়ো, টিভি, ফিল্ম, থিয়েটার, বই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ—সবেরই একমাত্র স্বত্ব। কিন্তু আমার এজেন্সির সুনাম রক্ষা করার কথাও আমাকে ভাবতে হবে। বড়ো বড়ো ব্যাবসা র্যা—কে বেশি গণ্য করে অন্যান্য এজেন্সির থেকে তার কারণ আমাদের লিস্টে শতকরা একশোভাগ নির্ভরযোগ্য লোককে আমরা রেখেছি। কোনো ব্যবসাদারের ব্রান্ড ইমেজ রাতারাতি ধ্বংস করে এমন একজন কাউকেও আমরা নিই না। বুঝতেই পারছেন খারাপ ধরনের কিছু যদি লোকে জানতে পারে—আমি এটা হবেই যে তা বলছি না—তাহলে আমার এজেন্সি স্বর্ণকুমারীর ব্যাপারে একেবারেই হাত ধুয়ে ফেলবে।’
