‘দেশের জন্য কিছু করছি ভাবাটা খুবই জোরালো প্রেরণা। নিজের জন্য যত জোরে দৌড়বে তার থেকেও বেশি জোরে দৌড়বে ভারতের জন্য। স্পোর্টসে এটা খুবই পুরনো একটা আপ্ত বাক্য: তুমি আরও ভালো করবে যদি কোনোকিছুর প্রতিনিধিত্ব কর—কলেজ, ক্লাব বা পাড়ার। বার্সিলোনার জন্য তুমি নিঃসঙ্গ হয়ে তৈরি হয়েছ। এখন অলিম্পিকস এসে পড়েছে এখন বিজয়দা তোমাকে তেরঙ্গা ঝান্ডা দেখাবে।’
সোনালি মন দিয়ে কথা শুনছে। ওর চোখ—মুখই বলে দিচ্ছে এই ধরনের কথাবার্তার সঙ্গে ওর পরিচয় নেই।
‘আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানার আছে। এখন যে কথাগুলো বললেন, এইসব কথা আমার বোঝা দরকার।’
রাহুল গাড়িতে স্টার্ট দিল। সোনালি অবাক হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছে, তার আগেই রাহুল বলল, ‘এভাবে বসে থাকতে ভালো লাগছে না। একটু ঘুরি। টিভি সেটটা ভালো হয়ে ওঠার আগেই ফিরে আসব।’
ধীরে চালিয়ে সে জগদীশ বোস রোড ধরে দক্ষিণে গিয়ে বেকবাগান মোড়ের থেকে পশ্চিমে বেঁকে তারপর আবার দক্ষিণে শরৎ বসু রোড ধরল।
‘কেন বার্সিলোনায় জিততে চাই, আপনার এই প্রশ্নটার উত্তর আমি দেব। পরিষ্কার জানাচ্ছি, আমি জিততে চাই। এটা ডা. সরকার বা বিজয় সিনহা বলছে না, আমি বলছি।’
‘স্বর্ণকুমারীও বলছে না?’ রাহুল প্রশ্ন তুলল।
‘ঠিকই, স্বর্ণকুমারীও নয়। আলি, আমি আলি মায়াকাং দুটো সোনার মেডেল জিততে চাই। কেন চাই বলতে গেলে আমাকে কীভাবে মানুষ করা হয় সেটাও বলা দরকার। এ সম্পর্কে ডা. সরকার কিছু কি আপনাকে বলেছেন?’
‘খুব কিছু নয়। তোমাকে বাড়িতে পড়ান হয়েছে।’
‘টিউটর ছিল। কলেজে পড়ার মতো না হলেও মোটামুটি জ্ঞান আছে। শরীরের দিকে কী ধরনের নজর দেওয়া হয়েছিল সেটা তো তখন বাড়িতেই বললাম। ওরা যদি আমার শরীরের দিকে নজর না দিতেন তা হলে আমি চ্যাম্পিয়ন হতেই পারতাম না। আমার কার্ডিয়োভাসকুলার সিস্টেম অত্যড়ত ভালো।’
‘পিসির সঙ্গে তুমি দু—তিন বছর আগেও থাকতে।’
‘হ্যাঁ। ভালো মন, নরম ধরনের। স্কুল মিসট্রেস, শাসন, ডিসিপ্লিন এইসব ব্যাপার ভালোবাসেন। আমাকে অ্যাথলিট হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে কখনো মাথা ঘামননি। বাবা আমাকে বর্ধমানে নিয়ে গেলেন ওখানে নতুন হসপিটালে চাকরি পেয়ে। তখনই পুরোপুরি আমার দিকে নজর দিলেন। আর উনি অত্যন্ত জেদি প্রকৃতির মানুষ। কয়েকজনের কাছ থেকে প্রোজেক্টের জন্য টাকা পেয়ে ট্রেনিং ক্যাম্প করলেন, সারান্ডার নির্জন জঙ্গলের পথে দৌড়োবার জন্য চক্রধরপুরের কাছে বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। মেডিক্যাল টেস্টের, ফিজিওথেরাপির যন্ত্রপাতি সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি আর বিজয়দা বছরের কয়েকটা মাস ওখানে কাটাই, তখন বাবাও সপ্তাহে একদিন যেতেন আমার শরীরের, ট্রেনিংয়ের প্রগ্রেস পরীক্ষা করতে। নিঃসঙ্গ, নির্জনে কী অবস্থায় যে দিন আর রাত কাটিয়েছি। ঘাম ঝরান, রক্ত ঝরান আমার ক্ষেত্রে খুব হাস্যকর ছেঁদোকথা। ট্রেনিং শেষে এক একদিন বিজয়দা কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছেন। হেঁটে আসার ক্ষমতা থাকত না। তিনি যা ট্রেনিং শিডিউল করে দিতেন তার এক মিলিমিটার কম কাজ হলে বেত দিয়ে মেরেছেন। ওলিম্পিকে জেতার জন্য এসবও আমি মানতে রাজি। মি. অরোরা আমি জানি আমি বার্সিলোনায় জিততে পারি। সেটা নিশ্চিত করার জন্য যদি কঠিন ট্রেনিং না করি তাহলে সেটা বিশ্বাসঘাতকতাই হবে, নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। বুঝতে পারছেন, আমার কাছে এখন পর্যন্ত জীবনের অর্থ, বেঁচে থাকার মানে সবকিছুই নির্ভর করছে জেতার উপর। এখন যদি সব ছেড়েছুড়ে বিয়ে করে সংসারে বসে যাই—একবার তা ভেবেও ছিলাম—তাহলে এতগুলো বছর শুধুই নষ্ট করেছি বলা ছাড়া আর কিছু কি বলা যাবে? কিন্তু আমি তা চাই না। আমি আমার সোনা দুটো চাই, আমার জীবনকে কিছু একটা দিতে চাই যাতে মনে হবে এখনো আমি বেঁচে আছি। তারপর একদিন ফুলস্টপ দিয়ে দেব।’ গাড়ির উইন্ডশীল্ডের কাচে তর্জনীর ডগ্য চেপে ধরল এবং ঘষতে ঘষতে বলল, ‘তারপর খুঁজে দেখতে থাকব আসলে আমি কে?’
‘একটা পর্যায় পর্যন্ত এটা ঠিকই আছে।’ রাহুল সামনের রাস্তা থেকে পাশের দোকানগুলোর দিকে নজর ফেরাল।
‘আমি জানি আপনি কী বলবেন। বলবেন ফুলস্টপ দেওয়া সম্ভব হবে না, তাই তো? বার্সিলোনার পর আমি স্বর্ণকুমারী হয়ে যাব। তখন আর আমি কে, এই খোঁজের সময় আর থাকবে না।’
‘তুমি কি স্বর্ণকুমারী হতে চাও?’
সোনালি মুখ ঘুরিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। ভাবছে।
‘এটা হওয়া কি খুবই দরকারি?’ রাহুল মৃদু স্বরে চাপ দিল উত্তর পাবার জন্য।
হঠাৎ তারদিকে ঘুরে বসে সোনালি ব্যাকুল চোখে তাকল। ‘আমি চাই, স্বীকার করছি আমার দরকার।’
‘সব মেয়েই চাইবে।’
‘কিন্তু তারা সবাই এটা জানে তারা কে, কোথা থেকে তারা আসছে। এটা গোড়ার ব্যাপার, এখান থেকে তাদের শুরু হয়। আমার মনেই হয় না এটা আমার আছে।’
‘ডা. সরকারকে বলেছ?’
‘ওর কথা হল, তুমি হচ্ছ স্বর্ণকুমারী। এটা যখন মেনে নেবে তখন আর তোমার কোনো উদবেগ থাকবে না।’
রাহুল গাড়ি থামাল। নেমে গিয়ে সামনের স্টেশনারি দোকান থেকে চারটে চকোলেট বার কিনে এনে সোনালির কোলের উপর ছুড়ে দিল।
‘এসব কিন্তু খাওয়া—’ প্রতিবাদ করে উঠল সোনালি। রাহুল তাকে থামিয়ে দিল দুহাত তুলে।
