সুরুচি চেয়ারে বসলেন। তার আগে জেনে নিলেন, ‘সেটটা বাড়িতে আবার পৌঁছে দেবেন কি?’
‘নিশ্চয় দেব।’ রাহুল একঘণ্টা সোনালির সঙ্গে কাটাবার সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নয়। তারা দু—জনে গাড়িতে এসে বসল। গাড়ি থেকে সুরুচিকে দেখা যাচ্ছে না।
‘ছ—টা প্রায় বাজে, এই সময়টায় তুমি করো কী?’
‘এখনও তো সূর্যের আলো রয়েছে, দৌড়ই।’
‘এই সময় মেয়েরা বেড়ায়, ওই দ্যাখো তিনটে মেয়েকে।’ রাহুল আঙুল দিয়ে দেখাল। সোনালি একবার মুখ ফিরিয়ে দেখল মাত্র।
‘ওরা কেউ অলিম্পিকস সোনা জিতবে বলে ট্রেনিং করে না।’
রাহুল চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।
‘তোমার বাবা, মানে পালিত বাবা, চান অলিম্পিকসের পর আমি তোমার এজেন্ট হই। যখন ওকে প্রথম দেখি তখন ধরে নিই লোকটার মাথায় ছিট আছে, মনে মনে ঠিক করে ফেলি এই প্রোজেক্টের ছায়া মাড়াব না। কিন্তু যতই তুচ্ছভাবে ব্যাপারটা নিই না কেন মনের কোণে একটা লোভ তো আছে! আমি একজন ব্যবসায়ী, কিছুটা প্রতিষ্ঠিতও। ভাবতে আমার ভালোই লাগে যে আমি এগোচ্ছি। এই ভাবটা যেদিন ভাবতে পারব না সেদিনও আমার রিটায়ার করার সময় হয়েছে ধরে নেব। মনের কোণে স্বার্থসিদ্ধির ইচ্ছাটা আমায় বলল, তুমি দাঁও মারতে পার, স্বর্ণকুমারী প্রোজেক্টের কমিশন তোমার নেওয়া উচিত। এখন যদি ওরা আমাকে বলে, মশাই কি ঠিক করলেন? আমি বলব, হ্যাঁ। আমি একটা চান্স নেব। তবে এটা এখনো কিন্তু চান্সই। তুমি যে মেডেলটা জিতবে বলে আশা করছ সেটা অন্য কেউ জিতে নিতে পারে। সে জন্যও কিন্তু আমি চান্স বলছি না। আমার কাজটা খুব একটা সুন্দর ব্যাপার নয়। আমার কারাবার মানুষ নিয়ে। সফল, নামি, চ্যাম্পিয়ান এইসব হল আমার খদ্দের। বড়ো বড়ো মালটিন্যাশনালস আর কর্পোরেশনকে অফার দিই এদের পাবার জন্য দর দিন। আমার খদ্দেররা সিন্দুক ভরায় টাকায় আর আমি তার একট অংশ নিই। ব্যবস্থাটা ভালোই, অনেকের কাছে তো খুবই ভালো।’
‘ইমদাদ আলি?’
‘হ্যাঁ। চমৎকার লোক। মেয়েরা ওকে ভীষণ পছন্দ করে আর ও সেটা মনপ্রাণ দিয়ে চায়। ওর সবকিছু গেঁথে আছে একটা জিনিসেই—প্রশংসায়, তারিফে। টাকা, মেয়েমানুষ, দেশে দেশে ঘোরা এসব ওর ভালো লাগে কিন্তু তখনই চনমন করে ওঠে যখন আসরে বসে। কিন্তু অ আরও পাঁচটা বছর যাক, যখন ওর চেহারার জলুস কমবে, গলা নষ্ট হবে তখন লোকটার মধ্যে প্রাণ বলে আর কিছু থাকবে না। তখন প্রকৃত অর্থেই, অল্পবয়সি উঠতি গাইয়েদের সঙ্গে দাপট দেখাতে গিয়ে ও নিজেকে মেরে ফেলবে, অনেকেই মরেছে। আর যদি বেঁচে থাকে তাহলে জীর্ণ, শূন্য জীবন নিয়ে, হালকা চটুল গানে সফল হবার চেষ্টা করতে করতে বেঁচে থাকবে। এটা ইমদাদ জানে, এই নিয়ে আমি ওর সঙ্গে কথাও বলেছি। অন্য ধরনের কিছু করাটা ওর প্রকৃতিতেই নেই। আমার ধারণা ও আর বছর দশেক বাঁচবে। কিন্তু তাই নিয়ে আমার বিবেক মোটেই বিচলিত হচ্ছে না। শুনে আমার সম্পর্কে কী মনে হচ্ছে সোনালি? লোকটা নিষ্ঠুর, শয়তান?’
সোনালি মুখ নামিয়ে একটু ভাবল। ‘আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি।’ থম হয়ে যাওয়া চাহনি তুলে তারপর বলল, ‘আপনি কী বলতে চান আমরাও ওইরকম হবে?’
‘বলতে চাই আমি একটা অর্থলোলুপ পিশাচ। যাতে ভাঙিয়ে টাকা রোজগার করতে পারব মনে করব, তাকে ঠেলতে ঠেলতে ধ্বংসের কিনারা পর্যন্ত নিয়ে যাব।’
‘কিন্তু তাদের কতদূর কী সম্ভাবনা সেটা আপনি প্রথমে তাদের জানিয়ে দেন নিশ্চয়।’
‘আমার মনের শান্তির জন্য সেটা করি বটে, বিবেককে চোখ ঠারা আর কী!’
সোনালি রাস্তায় লোক চলাচল দেখতে লাগল। চোখে আনমনা চাহনি। অন্যমনস্ক ভাবেই কপালে নামা চুলগুলো তুলে দিতে দিতে বলল, ‘থামলেন কেন। আমার ভাগ্যে তাহলে কী আছে সেটা বলুন।’
‘ওটাতেই গোলমাল।’
‘আহহ বলুন।’
‘ইমদাদ আলিকে আমি বুঝি, কিন্তু সোনালি সরকারকে নয়।’
‘কেন বোঝেন না? আমি সাধারণ একটা বাঙালি মেয়ে যে দুটো সোনার মেডেল জিততে চায়।’
‘কেন?’
‘কী বলতে চান?’
‘খুব মামুলি একটা কথা দিয়েই জিজ্ঞাসা করছি, সোনালি কীসের তাড়নায় তুমি জিততে চাইছ?’
ভ্রূ কোঁচকাল সোনালি। যেন হদিশ করতে পারছে না প্রশ্নের উদ্দেশ্যটাকে। ‘এটা কি খুবই দরকারি জানার জন্য?’
‘এই বিকেলে আমার কাছে দরকারি।’
‘তাহলে আর একটা মামুলি কথা দিয়েই উত্তর দিই। এটাই আমার জীবনের ধরন।’
রাহুল লক্ষ্য করল সোনালি অন্যমনস্ক হয়ে তার শার্টের গলার কাছে একটা আলগা সুতো ছেঁড়ার চেষ্টা করছে। রাহুলের মনে হল, সে আবার আটকে গেল। সোনালি মন খুলে কথা বলতে তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু ওর ভিতরে যে পাঁচিল গাঁথা হয়ে গেছে সেটা এত উঁচু, এত শক্ত যে ওর পক্ষে সেটা ডিঙোন বা ভাঙা সম্ভব হল না। ‘চল কোথায় গিয়ে চা খাই, পিসি কি আপত্তি করবেন?’
‘জানি না, তবে আমি চা খাই না।’
‘সত্যিই খাও না নাকি আমার সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বলছ?’
‘আপনি খুব খোলাখুলি, রাখঢাক না করে আমার সঙ্গে কথা বলছেন বলে আপনাকে আমার ভালোই লাগছে। আগে কেউ কখনো আমায় বলেনি যে টাকার জন্যেই তারা এর মধ্যে জড়িয়েছে, এর মধ্যে মানে আমাকে সোনা জেতাবার প্রেজেক্টের মধ্যে। সবসময়ই শুনে আসছি, আমার ট্যালেন্টকে চিনিয়ে দিতে বা আমার সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দিতে বা ভারতের জন্য সোনা এনে দিতে ওরা এটা করছে। আপনি হাসছেন! বিজয়দা কিন্তু এটাই আমাকে অবিরত বলে যাচ্ছেন।’
