সোনালি তাকিয়ে রয়েছে রাহুলের মুখের দিকে। মুখভাব থেকেই আঁচ করে নিয়ে বলল, ‘আপনি বোধহয় কিছু প্রশ্ন করবেন। করুন। বাবা বলে দিয়েছেন উত্তর দেবার জন্য।’
‘আচ্ছা সোনালি তুমি তো এখন নামী, সফল। তুমি কি দৌড়ে আর নামবে না যেসব কমার্শিয়াল সুযোগ এখন তোমার সামনে খুলে গেছে সেগুলোর ফায়দা তুলবে?’ রাহুল নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করল জবাব শোনার জন্য।
‘ওই জিনিসগুলো কী শুধুই বিশেষ কয়েকজনের জন্য? দৌড়ব তো বটেই। কমার্স সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই কম। জ্ঞান বলতে যদি ব্যবসাবাণিজ্য সংক্রান্ত কাগজ, ম্যাগাজিন পড়াকে বোঝায় তাহলে আমি একটা গবেট। ওহহ মি. অরোরা, আপনি কোন কমার্স কাগজের লোক?’
রাহুল হেসে ফেলল। জনসংযোগের ব্যাপারে সোনালির সোনার মেডেল পাওয়ার যোগ্যতা আছে।
‘আচ্ছা সোনালি আপনি কি কখনো পুরুষদের সঙ্গে রেসে নেমেছেন?’
‘এই সাতটা দিনই, ক্যামেরা হাতে ধরা পুরুষদের সঙ্গে তো নামতেই হল। কী তাড়া যে আমি খেয়েছি, একমাসের ট্রেনিংয়ের সমান প্রায়। তবে আপনার প্রশ্নে জবাবে বলছি, এখনও পর্যন্ত পুরুষদের বিরুদ্ধে দৌড়ইনি।
‘আপনি কি সম্পূর্ণ রমণী বলে নিজেকে মনে করেন?’ রাহুল ভালোমানুষের মতো মুখ করে জানতে চাইল।
সোনালির ভ্রূ কোঁচকাল। চোখটা নামিয়ে চট করে নিজের শরীরের উপর দিয়ে চাহনি বুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘এখানে আপনাদের সামনে এসে এতক্ষণ ধরে এত কথা বললাম, তার মধ্যে কিন্তু আমার মনে হয়নি এ সম্পর্কে কারুর মনে কোনোরকম সন্দেহ জাগতে পারে।’
কথাটা বলে সোনালি দু—হাত তুলে চুলের গোড়া বেঁধে রাখা ফিতের গেরোটা খোলার জন্য টানাটানি শুরু করল। বোতাম খোলা জামা সরে গিয়ে তার স্তনের ওপরের অংশ ও তাদের মধ্যের উপত্যকা রাহুলের দৃষ্টির সামনে বেরিয়ে এল। গেরো খোলার চেষ্টায় যে আন্দোলন তার দুই বাহু বেয়ে বুকে নেমে এল তাতে সামনে বসা পুরুষটি পুলক বোধ করল। রাহুলের মনে হল এটা বোধহয় শিখিয়ে পড়িয়ে রাখা জিনিসগুলোর মধ্যে নেই, সোনালির নিজেরই ব্যাপার, নিজস্ব সংযোজন।
‘সোনালি আজকের সন্ধ্যাটা কীভাবে কাটাবেন ভেবেছেন কি?’
একটু সন্ত্রস্ত ভাব সোনালির মধ্যে দেখা গেল। সে ঠোঁট কামড়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবল। ধীরে ধীরে চোখে ফুটে উঠল অসহায়তা। তারপই হেসে ফেলল।
‘এটা কি প্রেস কনফারেন্সের প্রশ্ন?’
‘না। আমার প্রশ্ন।’
‘জানি না। সন্ধ্যা আমি একাই কাটাই।’
কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খোলার আওয়াজ পাওয়া গেল। এক মহিলা কণ্ঠের কথা ভেসে এল, ‘কী মুশকিলে পড়লাম। মিস্ত্রি আসতে পারবে না। সেটা দোকানে দিয়ে আসতে হবে। এখন আমি দিয়ে আসি কী করে?’
‘পিসি।’ সোনালি বলল।
সুরুচি ঘরে ঢুকে রাহুলকে দেখে জিজ্ঞাসু চোখে সোনালির দিকে তাকালেন।
‘আজ আসবেন বলে বাবা যার কথা বলে গেছলেন।’
‘ওহ।’ সুরুচি নমস্কার করলেন। ‘দাদা তো সকালে বর্ধমান চলে গেলেন।’
‘আমায় উনি বলেছিলেন সে কথা। …আপনার টিভি সেট কি দোকানে দিয়ে আসতে হবে।’
‘ওদের দু—জন মেকানিকের মধ্যে একজন অ্যাবসেন্ট, আর একজন সার্ভিসে বেরিয়েছে। আউটডোরে যাবার মতো কেউ নেই। বলল, নিয়ে আসুন। অতবড়ো একটা ভারী জিনিস আমি নিয়ে যাই কী করে?’
‘আমার গাড়ি রয়েছে, যদি আপত্তি না করেন তো আমি পৌঁছে দিচ্ছি।’
‘আপনি!’
‘বাঃ প্রবলেম সলভড!’ সোনালি লাফ দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ‘তাহলে আমিও যাব।’
‘তুমি যাবে?’ সুরুচি ইতস্তত করলেন। ‘দাদা বলেছিলেন বাড়ি থেকে না বেরোতে।’
‘আমি গাড়িতেই বসে থাকব। কেউ আমাকে চিনতেও পারবে না। আরে আমি এখানে গোল্ড জিতিনি, এটা তো একটা অল ইন্ডিয়া রেস মাত্র! আমার অটোগ্রাফের জন্য একজনও এখন এগিয়ে আসবে না।’
‘আচ্ছা চলো, কিন্তু এই ড্রেসে নয়!’
‘পিসি, শাড়ি পরব।’
‘না, দাদার বারণ।’
‘জানতে তো পারবে না। জানেন মি. অরোরা, বাবা আমাকে কখনো শাড়ি পরতে দেননি। শাড়িতে নাকি স্ট্রাইড খারাপ হয়ে যায়। ইন্ডিয়ান মেয়েরা লম্বা করে পা ফেলতে পারে না নাকি শাড়ির জন্য। কিন্তু আমার যা ইচ্ছে করে। আমার একটাও শাড়ি নেই।’
‘সোনা যা বলছি শোন।’ সুরুচির গলা কঠিন হল। ‘যাও ট্রাউজার্স পরে এসো।’
শোবার ঘর যেত এত অনাড়ম্বর হতে পারে রাহুলের তা ধারণায় ছিল না। একটি ডাবল ইংলিশ খাট আর একটি স্টিল আলমারি। দুটি দেওয়াল তাক তাতে দুটি পর্দা ঝুলছে। বড়ো ঘরের একদিকে টিভি স্ট্যান্ডে একটি ছ—সাত বছর আগের মডেলের সেট। প্রায় একটা সুটকেসের মতো আকারে।
রাহুল দু—হাতে সেটটা তুলেই নামিয়ে রাখল। বেশ ভারী। তবে নীচে একতলা পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে তার অসুবিধে হবে না।
‘সরুন।’ সোনালি কাঁধ দিয়ে রাহুলকে মৃদু ঠেলে দিয়ে সরিয়ে দু—হাতে তুলে নিল সেটটা। ‘চলুন।’
যেন হালকা একটা মুড়ির ধামা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এমন সহজভাবে সোনালি একতলায় নেমে রাস্তা পর্যন্ত এল। রাহুল দরজা খুলে সেটটা ভিতরে তোলায় সাহায্য করল।
টিভি সার্ভিসিংয়ের দোকানে পৌঁছতে মিনিট চার—পাঁচ লাগল। তোলার মতো নামানোর কাজটাও করল সোনালি। দোকানের মালিক সেটটা পিছনের ঘরে নিয়ে গেল। একটিমাত্র স্টিলের চেয়ার দেয়াল ঘেঁষে। সুরুচিকে বসার জন্য রাহুল অনুরোধ করল।
‘ঘণ্টাখানেক তো লাগবে। আপনি বসুন, আমরা গাড়িতে গিয়ে বসছি। কিছু কথাবার্তা আছে সেটা সেরে নিই।’
