‘প্রতিদিন, মাসের পর মাস সকাল থেকে রাত এইরকম একটা জীবন, ভালো লাগে? বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে না?’
‘তার মানে?’
‘এটাই ওদেরকে বলা, যথেষ্ট হয়েছে আর নয়, এবার আমাকে কলকাতায় বেড়াতে নিয়ে চলো। সেখানে সিনেমা দেখব, নিউ মার্কেটে ঘুরব, পার্ক স্ট্রিটে রেস্তোরাঁয় খাব, মেট্রোয় চড়ব।’
‘না, বলব না এসব।’ অপ্রত্যাশিত বদলে গেল সোনালি। ‘আমি ওলিম্পিক সোনা জিততে চাই। সিনেমা দেখা, ঘোরাঘুরি খাওয়াদাওয়ার জন্য বাকি জীবন তো রয়েছে।’
‘তুমি এর থেকে কী পাবে আশা করো?’
‘জেতাটাই আমার কাজ, এই জন্যই তো জন্মেছি। কারুর যদি ট্যালেন্ট থাকে তাহলে সেটা নষ্ট করা কি উচিত? আপনার ট্যালেন্ট আপনি কীভাবে কাজে লাগান?’
‘ট্যালেন্টেড লোকেদের জন্য টাকা কামানোয়। সেই জন্যই তারা আমায় ডাকে।’
‘কারা ডেকেছে?’
‘যেমন ধরো, ইমদাদ আলি, গজল গায়। নাম শুনেছ?’
‘আহহ, ওর গানের টেপ আছে আমার কাছে। ওকে চেনেন?’
‘আমি ওর এজেন্ট। কোথায় টেপ করলে?’
‘রেডিয়ো থেকে। আচ্ছা ওর মতো লোকেদের সঙ্গে কি কথা বলার সুযোগ আমার হবে? আপনার কী মনে হয়?’
‘বার্সিলোনার পর, কে বলতে পারে হয়তো ইমদাদই তোমার সঙ্গে আলাপ করার জন্য ব্যস্ত হবে।’
‘আমি ভালো আলাপী নই।’
‘কে বললে নও, দিব্যিই তো আমার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছ।’
‘কথা বলা শেখার জন্য সপ্তাহে দু—ঘণ্টা আমাকে ইন্টারভিউ দেওয়ার ক্লাস করতে হয়।’
‘তার মানে?’ রাহুল অবাক হয়ে গেল।
‘বাবা চলে গেছেন ট্রেনিং সম্পর্কে আপনি যা জানতে চান, জানাতে শুধু, খুব ব্যক্তিগত কথা নয়। তাই আপনাকে বলছি, বার্সিলোনায় দুটো সোনা জেতার পর প্রেস ইন্টারভিউ রুমে আমাকে যেতে হবে। তখন সেসব প্রশ্ন হবে বা হতে পারে এটাকে তারই উত্তর দেওয়ার রিহার্সাল বলতে পারেন।’
‘আশ্চর্য তো! কী ধরনের প্রশ্ন করা হয়?’
‘ঘরের চারদিকে চারটে টেপরেকর্ডার থাকে। তাতে প্রশ্নগুলো নানান লোকের গলায় ইংরিজিতে টেপ করা থাকে। একের পর এক রেকর্ডারের সুইচ টিপে চালান হয়। আমি উত্তর দিতে যাই। উত্তরগুলো আগেই আমাকে লিখে দেওয়া হত, এখন আর তার দরকার হয় না আমি নিজেই উত্তর দিতে পারি।’
‘কয়েকটা প্রশ্ন বল তো।’
‘যেমন ধরুন, গেমসের আগে কি বিশ্বাস করতে তোমার পক্ষে দুটো সোনার মেডেল জেতা সম্ভব?’
‘বাহ, তুমি কী জবাব দেবে?’
‘নিজের ওপর কনফিডেন্স থাকা দরকার। একদিক থেকে বলতে গেলে আমি এখনও বিশ্বাসই করতে পারছি না দুটো সোনা জিতেছি। কিন্তু বার্সিলোনায় এসেছি জিততে, হ্যাঁ জিততে, কথাটা অবশ্য অহংকারীর মতো শোনাচ্ছে কিন্তু আমি নিজের চিন্তাকে গোপন করায় অভ্যস্ত নেই। জবাবটা কেমন হল?’
রাহুল মন্তব্য না করে বলল, ‘আর একটা প্রশ্ন।’
‘আর একটা? আচ্ছা।’ সোনালি মুহূর্তের জন্য চিন্তা না করে বলল, ‘অলিম্পিকসে এখনো পর্যন্ত ম্যারাথন যে জিতেছে সে আর অন্য কোনো ইভেন্ট সেই গেমসে আর জিততে পারেনি শুধু একজন ছাড়া চেকোশ্লোভাকিয়ার এমিল জেটোপেক, ঠিক চল্লিশ বছর আগে। এখন তুমি এটা করলে। নিজেকে এখন তোমার কেমন লাগছে? আমার উত্তর, শুনে খুবই ভালো লাগছে। তবে বেশি প্রশংসা করবেন না, হেল্টাথলনে যে মেয়েটি সোনা জিতল তারই বেশি প্রশংসা প্রাপ্য। সে দৌড়, ছোঁড়া, লাফানো কতরকমের বিষয়ে অংশ নিয়েছে, আর আমি? শুধু দৌড়েছি মাত্র। …কেমন লাগছে? আমার শৈশবে মারা যাওয়া মায়ের ছবির দিকে তাকালে যেমন লাগে সেইরকম এখন লাগছে।’
দারুণ! রাহুল মনে মনে তারিফ জানাল। মিডিয়া এই দিকটা লুফে নেবে।
‘আর একটা?—মিস সরকার আপনি যে এত কঠোর ট্রেনিং করে গেছেন, এটা কী আত্মত্যাগ নয়? উত্তর : আত্মত্যাগ? ছেলেদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি না করাটাই কী আত্মত্যাগ? সে জন্য তো দিনের শেষে কয়েক ঘণ্টা সময় তো হাতে থাকেই, সন্ধের পর তো আর মাঠে বা রাস্তায় দৌড়ানো যায় না কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যান্য কাজ তো করা যায়।…এই শুনে নিশ্চয় সবাই হেসে উঠবে।’
‘আমারই হাসি পাচ্ছে এখন।’ রাহুল মুচকি হেসে সোনালির মুখভাব লক্ষ করল। কি যেন একটা কামনার ছায়া ওর মুখে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে ভেসে চেলে গেল।
‘কিন্তু আপনারা যা ভাবছেন তাতে আমার আপাতত কোনো আগ্রহ নেই। সন্ধ্যার পর আমার সময় কাটে বই পড়ে, গান শুনে।’ আর একটা প্রশ্ন : মিস সরকার একটা কি সত্যি যে ভিলেজে অন্যান্য ভারতীয় মেয়েদের থেকে আপনি একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলেন? উত্তর : ‘সোনালি বলুন আমি কিছু মনে করব না। হ্যাঁ, কথাটা অনেকটা সত্যি। দেখুন ওরা তো বহুদিন ধরে নানান জায়গায় ট্র্যাক মিটগুলোয় নামছে, পরস্পরকে খুব ভালোই চেনে। আমি একেবারেই নতুন, মাত্র দু—মাস আগে প্রথমবার একটা রেসে নামি। সুতরাং মেয়েদের কাছে আমি অপরিচিতই। আর আমাদের স্বভাব নয় গায়ে পড়ে বন্ধুত্ব করা।’ আর একটা প্রশ্ন : ‘সোনালি তোমার কি কোনো সংস্কার আছে বা দৈবে বিশ্বাস করো? যেমন বিশেষ কোনো জুতো জামা বা ম্যাসকট?’
আহ? মাল বিক্রির কী দারুণ সুযোগ! রাহল মনে মনে উত্তরটাও বানাল: হ্যাঁ আছে। আমার কাস্টম—মেড অ্যাডিডাস জুতো আর নাইকে মোজা।
‘আমার উত্তর: না কোনো সংস্কার নেই। তবে এখন থেকে এই মেডেল দুটোই আমার তাবিজ।’
খুব বেশি ভেবেচিন্তে সোনালিকে উত্তর দিতে হচ্ছে না, আগে থেকেই এগুলো তাকে মুখস্থ করানোর জন্য। কিন্তু যেভাবে কথা বলছে তাতে একধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ফুটে বেরিয়েছে। চমৎকার অভিনেত্রী! রাহুলের মনে হল, প্রেস কনফারেন্স মাতিয়ে দেবার মতো ক্ষমতা ওর আছে। হয়তো মাসের পর মাস রগড়ানিরই ফল এটা। এবার আমি যদি একটা দুটো প্রশ্ন করি যেটা সম্পর্কে ওকে তৈরি করে রাখা হয়নি।
