একজন লোক কথা বলতে আসবে, সোনালি তা জানে। জেনেও সে জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখেনি উপযুক্ত পোশাক পরে। রাহুলের মনে হল, তার আসার গুরুত্বটা এই মেয়েটি ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারেনি বা বাইরের লোকের সামনে এইরকম পোশাক পরাটাকেই হয়তো ও স্বাভাবিক মনে করে। কিংবা হয়তো ওর উপর হুকুম হয়েছে, লোকটাকে তালগোল পাকিয়ে দাও যাতে সে আমাদের সঙ্গে হাত মেলায়। সে জন্য যা করতে হয় করো। যাই হোক না কেন রাহুল ঠিক করে ফেলল খুব হুঁশিয়ার হয়ে পা ফেলবে। সেক্স বিষয়ে কোনো চিন্তাকে মনে স্থান দেবে না। সে এসেছে তথ্য সংগ্রহ করতে। সোনালি কীভাবে বড়ো হয়ে উঠেছে সেটা জানা দরকার। নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হয়ে না ওঠা বা এইরকম খোলামেলা মনোভাব ওর মধ্যে গড়ে উঠল কী করে? দেহে যৌবন আসার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা যে স্বাভাবিক লজ্জার, আড়ষ্টতার অন্তর্গত হয় তার ছিটেফোঁটাও সোনালির মধ্যে নেই।
‘আমার কিন্তু কাগজ পড়া বারণ ছিল।’ সোনালি বাচ্চচা মেয়ের মতো ফিসফিস করে বলল গোপন খবর জানাবার ভঙ্গিতে।
‘তাহলে পড়লে কেন?’
‘বাহ, ইচ্ছে করে না!’
‘আর কী কী ইচ্ছে করে?’
‘আর কী কী—’, সে কয়েক সেকেন্ড চিন্তায় ডুবে থেকে আচমকা বলল, ‘আপনি অরোরা, তার মানে পাঞ্জাবি, তাহলে এত ভালো বাংলা বলেন কী করে? আপনার বাব মা কি বাঙালি?’
‘আমি কলকাতাতেই জন্মেছি, বড়ো হয়েছি, আমার মেলামেশা ছিল বাঙালিদের সঙ্গে।’
‘ঠিক ঠিক। আমার মা আর দিদিমা আপাতানি ট্রাইবের ছিল। এখন যেটা অরুণাচল বলা হয় সেখানে আছে এই ট্রাইব।’
‘তুমি কী মনে করো তুমি বাঙালি নও? তোমার বাবা…’
‘আমি তো পালিত মেয়ে।’
রাহুল লক্ষ করল কথাটা বলার সময় সোনালির মুখটা দুমড়ে গেল। সেটা রাগে, না হতাশায়, না আক্ষেপে বুঝতে পারল না। প্রসঙ্গ বদলাতে সে বলল, ‘আর কাউকে এখানে দেখছি না যে? ডা. সরকারের বোন, তিনি কোথায়?’
‘পিসি? টিভি মেকানিক খুঁজতে গেছে। কাল ছেকে সেটটা চলছে না। টিভি না দেখলে পিসির ঘুম আসে না।’
রাহুল ঘরের চারধারে চোখ বোলাল। কোথাও টিভি সেট দেখতে পেল না।
‘এ ঘরে নয়, পিসির বেডরুমে আছে ওটা।’ সোনালি আঙুল দিয়ে বাঁ দিকের দেওয়ালটা দেখাল ‘ছোটোবেলায় আমিও ওইঘরে থাকতাম। এই ঘরটা ছিল আমার খেলার ঘর। কী নিয়ে খেলতাম জানেন ক্লাইম্বিং ফ্রেম, দড়ি, গরাদ ধরে ব্যায়াম। রোজ আমাকে বাধ্য করা হত এই নিয়ে খেলতে, সকালে আর বিকেলে। আমার খারাপ লাগত না। তবে বাবার একটা থিওরি আছে অক্সিজেন বেশি টানা বিষয়ে, সে জন্য আমার বুকের খাঁচাটা বড়ো করার চেষ্টা হত। দিনে একবার আমার বুকের পাঁজরে বেল্ট লাগানো মোটা কাপড় বেঁধে তারপর সেটা টানা হত। খুব লাগত, ব্যথা হত। রোজ একবার করে এটা করা হত। আমার যে কী রাগ হত, ঘেন্না করতাম। ইঞ্জেকশনকেও ঘেন্না করতাম।’
‘ইঞ্জেকশন? কীসের?’
‘বোধহয় আয়রন ঢোকানো হত শক্তি বারবার জন্য। সপ্তাহে একটা, ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত নিয়েছি। খাবারদাবার সম্পর্কেও খুব কড়াকড়ি ছিল, চিনির তৈরি কিছু একদম নয়।’
‘তোমার শরীরের জোর কতটা বাড়ছে বা কমছে, সেটা কি ডা. সরকার মাপতেন?’
‘প্রতি শনিবার, পুরো ব্যায়াম করিয়ে সব লিখে রাখেন। এখানেও তাই হয়।’
রাহুল কথাবার্তা এবার অন্যদিকে ঘোরাতে চাইল। একই বিষয়ে বেশিক্ষণ কথা না বলে নানান মুড, আবেগ, বোধ, বুদ্ধি যাতে ধরা পড়ে তাই করা উচিত।
‘কই বললে না তো, কী কী ইচ্ছে তোমার করে?’ রাহুল সিগারেট প্যাকেট পকেট থেকে বার করে কী ভেবে আবার পকেটে রাখতে যাচ্ছিল, সোনালি বারণ করল।
‘খান না। সিগারেটের গন্ধ আমার ভালো লাগে।’
‘সিগারেটের ধোঁয়া অ্যাথলিটের ফুসফুসের পক্ষে ক্ষতিকর।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু বাবা তো এখানে নেই। বিজয়দা আমাকে জিমে ওয়ার্ক করাবার সময় লুকিয়ে লুকিয়ে খায়। বাবা তা জানে না।’
‘ডা. সরকারকে তোমরা ভয় করো?’
সোনালি চুপ করে রইল।
‘আচ্ছা তোমার ওয়ার্ক আউটের কথা বলো। শুনেছি খুব মর্ডান ইকুইপমেন্টস আছে তোমাদের বর্ধমানের জিমনোসিয়ামে। নানারকম ফিজিওলজিক্যাল টেস্ট করার ব্যবস্থাও আছে। সত্যি?’
‘নিজে দা দেখলে, শুধু মুখের কথা শুনে বুঝতে পারবেন না।’
‘পারব। তুমি বলো।’
‘ওখানে আমার মনের আর শরীরের কন্ডিশনিং করা হয়। বাবা আর বিজয়দা করান। যেমন ধরুন ট্রিডমিল।’ সোনালি সোজা হয়ে বসল। তার দুটি গাল ও চোখ দিয়ে উদ্দীপনার আভা ফুটে বেরোল। নিজের সাম্রাজ্যে যেন নির্বাসিতা রানি ফিরে যাচ্ছে, এমন একটা উত্তেজনা তার অবয়বে ছড়িয়ে পড়েছে।
‘ট্রিডমিল হল, রোলারের ওপর রবারের শিট পাতা থাকে। তার একদিকে থাকে ইলেকট্রিক মোটর। সেটা চালালে রোলার ঘুরতে থাকে আর সেইসঙ্গে বেল্টের মতো রাবারের শিটটাও। সেই চলন্ত রাবার শিটে দাঁড়িয়ে, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, ছুটতে হয়। যত জোরে শিটটা চলবে তার সঙ্গে তাল রেখে তত জোরে ছুটতে হবে, ছোটার স্পিড কমলেই দড়াম করে চিৎপটাং। আমাকে দেড়ঘণ্টা ট্রিডমিল করতে হয় সপ্তাহে দুদিন। করার সময় আমাকে মন্ত্রের মতো বলতে হয় ‘আমি সোনা জেতার জন্য দৌড়চ্ছিল।’ এটা বলতে বলতে কী রকম একটা ঘোরের মতো ব্যাপার মাথায় তৈরি হয়, তখন দৌড়তে খুব কষ্ট হয় না। কাল যখন ফিনিশিং থেকে একমাইল দূরে ডেবি ট্যাটারসলকে ফেলে রেখে স্পিড তুললাম তখন এটাই মনে মনে বলছিলাম। এছাড়া করি ওয়েট ট্রেনিং। রোড রানিং, ফিল্ম দেখা, মালিশ, মোটিভেশন, আলট্রা ভায়োলেট…।’
