আয়নার খুব কাছে মুখটা এনেও সে বয়স বুঝতে পারছিল না। সামনের চুল উঠে গিয়ে কপালটাকে চওড়া করে দিয়েছে। সেখানে দুটো রেখা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভুরুতে কয়েকটা চুল খোঁচা হয়ে উঠে রয়েছে। কানদুটো ছোটো, পাশে ছড়ানো; কিছু চুল খুব ভালোভাবেই কানের গর্ত থেকে উঁকি দিচ্ছে; চোখদুটো গোল, ভিতরে বসা; নীচের ঠোঁটটা পুরু, কাঁধটা সরু, বুকের খাঁচাটা ছোটো, পেটটা ঝুলে থলথলে। মোটা কোমরের দু—ধারে চর্বির ভাঁজ। বাহুদুটি শীর্ণ, মেয়েদের মতো নরম।
অনন্ত একটি একটি করে নিজের দেহের ত্রুটি বার করে খসড়া থেকে প্রথমে স্বাস্থ্যবান কথাটা বাদ দিয়েছিল। তবে পঁয়ত্রিশ বছরটা এমনই, শোনামাত্র মনে হয় পরিণত যুবক, বয়সটা যেন ত্রিশের থেকে একটু বেশি অথচ চল্লিশের কাছাকাছি নয়। কিন্তু সে সাহস পায়নি নিজেকে ত্রিশের দিকে নিয়ে যেতে।
তবু নিশ্চিত হবার জন্য তার কাছাকাছি বয়সিদের সে লক্ষ করে গেছে দু—দিন ধরে। রাস্তায়, বাজারে, বাসে সর্বত্রই তার চোখ ছুঁকছুঁক করেছে। যাকেই মনে হয়েছে মধ্য—তিরিশ তন্নতন্ন করে তার গড়ন, হাবভাব, চলনের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, আর মনে হয়েছে পঁয়ত্রিশে যা হওয়া উচিত তার সেই রকম শরীর নয়। সে উনচল্লিশই লেখে।
খসড়ায় হাজার টাকা আয় বসাবার সময় সে দ্বিধায় পড়েছিল। হাজার কথাটা শুনতে ভালো, মনেও গাঁথে। তা ছাড়া সে তো মাইনের টাকা গুনেগুনে বউয়ের হাতে তুলে দেবে না।
তবে পাত্রীদের তরফ থেকে খোঁজখবর নিশ্চয়ই করবে। নিশ্চয় অঘোর এস্টেটে কেউ যাবে, কে কত মাইনে পায় সেটা বার করে নেওয়া মোটেই শক্ত নয়। তারা জেনে যাবেই সে একটা মিথ্যাবাদী। হাজার টাকাটা সে কেটে দেয়। বিজ্ঞাপনের ফর্ম ভরতি করে, টাকা দিয়ে দুপুরে খবরের কাগজের অফিস থেকে বেরিয়ে আসার পরই অদ্ভুত একটা উত্তেজনা তাকে গ্রাস করে। সারাদিন তার শরীরের তাপ এমন অবস্থায় থাকে যে রাত্রে হোটেলে ভাত মুখে দিতে পারে না। দু—গ্রাস কোনোরকমে চিবিয়েই উঠে পড়ে।
‘কী হল অনন্তবাবু, রান্নায় কিছু…’
মালিক অবনী দত্তর উদবিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘শরীরটা ভালো নেই।’
‘তাই বলুন। এতদিন খাচ্ছেন, এমন তো কখনো দেখিনি। অম্বলটা বোধহয় বেড়েছে।’
‘হ্যাঁ।’
রাতে ঘুম এল না। সারা একতলায় সে একা। বিজ্ঞাপনেও ‘একা’ শব্দটা বসিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনটা সে দিল কেন? তার কি বিয়ে করার বা কোনো স্ত্রীলোককে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়ার খুবই দরকার! এতটা বছর তা হলে কাটল কী করে!
ঘর পেয়ে অলু চলে যাবার পর, যখন সে আর মা একই কথা, একই অভ্যাস, একই গণ্ডির মধ্যে দিন, হপ্তা, মাস, বছর কাটিয়ে গেছে তখন সে কিছু বোধ করেছিল কি?
কীভাবে তার দিন কেটেছে? অনন্ত গত পাঁচ বছরের এমন কোনো স্পষ্ট ছবি দেখতে পেল না যা দিয়ে সে কোনো তারিখ, কোনো ঋতু, কোনো মানুষকে শনাক্ত করতে পারে। তার ইন্দ্রিয়গুলো এমন কোনো আবেগ ধরে রেখে দেয়নি যা তাকে ভালো কোনো স্মৃতি দিতে পেরেছে। দেখাশোনার সব কিছুই তার কাছে অর্থপূর্ণ আবার অর্থহীন মনে হয়েছে।
একঘেঁয়ে দিন, ভ্যাপসা অথবা ভিজে। ছোটোবেলা থেকে সে একই গন্ধ পেয়ে আসছে বিছানা, আলমারি, বাসন, কলঘর সবকিছু থেকেই। বাজার যাওয়া, অঘোর এস্টেটে যাওয়া…খাতা, বিল—বই, তাগিদ, মামলা, ভাড়াটেদের হাজার অভিযোগ। আর হাঁটা, যেটা তার একমাত্র বিলাস।
গৌরীদের চায়ের দোকানটা উঠে গেছে, কমলা বাইন্ডার্সের প্রসাদ ঘোষ মরে গেছে, তার ছেলে এখন বসছে। পুরোনো লোকদের মধ্যে আছে শুধু ল্যাংড়া গুরু দাস। অন্য কোথাও কাজ জোটাতে পারেনি।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ছে বটে, একটা ছেলে কিছুদিন কাজ করেছিল…সে তো বহু বছর আগে, পরেশদা তারপরই কোরণ্ডটা অপারেশন করাতে গিয়ে মরে গেল।’
একদিন সে সিনেমা দেখতে টিকিট কেটে হলে ঢুকেছিল। হিন্দি ছবি, কিছুক্ষণ পরই বিরক্ত বোধ করতে থাকে। বিরতির সময় বেরিয়ে আসে। এতগুলো লোক টানটান হয়ে চেয়ারে বসে দেখছে অথচ তার ভালো লাগল না।
সন্ধ্যায় গঙ্গার ধারে গেছে। কিছুক্ষণ বসে থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে। পার্কে বসে তাস খেলা দেখেছে। মা চুপ করেই থাকে, ইদানীং আর বেশি কথা বলত না। সাধন বিশ্বাস একরাতে থ্রম্বসিসে মারা গেলেন। সে শ্মশানে গেছল। উৎপল এখন বাবার চেয়ারটায় বসে। পাড়ার দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি ছিল গত বছর।
অনু বছর সাতেক আগে কটক থেকে এসেছিল ওর স্বামীর গলব্লাডার অপারেশন করাতে। সঙ্গে আসে শুধু ভাসুরপো। সারাদিন খুব চিন্তায় থাকত। এখন সে নতুন বাড়িতে থাকে, বার বার যেতে বলেছে। চিকিৎসায় হাজার দশেক টাকা খরচ করে গেছে।
অলুর সঙ্গে দেখা নেই সাড়ে তিন বছর। বেহালায় থাকে। মা দিল্লি যাবার দিন দশ আগে বিকেলে এসেছিল, তার সঙ্গে দেখা হয়নি। শান্তনুকে এক সন্ধ্যায় নীলরতন হাসপাতালের গেটের কাছে দেখেছিল কথা বলছে একজনের সঙ্গে। শান্তনু টলছিল। লোকটিকে বারবার জড়িয়ে ধরছিল। সে দূর দিয়ে চলে যায়।
মাসে দু—তিনবার যখন সে এন্টালির বাড়িতে যায় মিনতি করের সঙ্গে তখন দেখা করে কিন্তু আর ভালো লাগে না কথা বলতে। আর ভালো লাগে না ছবিটার দিকে তাকাতে। নন্দকিশোরের ভাইপো একতলায় ওর ঘরের সামনে লম্বা প্যাসেজটায় সন্ধ্যার পর চোলাই মদের কারবার ফেঁদে বসে। এলাকায় এখন সে নামকরা মস্তান। অনন্ত সাহস পায় না কিছু বলতে। নন্দকিশোর পানের দোকান একজনকে ইজারা দিয়ে কসবায় চলে গেছে। সে মাসে মাসে পাঁচশো টাকা পায় দোকান থেকে। নন্দকিশোর চারটে গোরু কিনে কসবায় খাটাল করেছে, রেশন দোকানও দিয়েছে। মাসে একবার দু—বার আসে। চোলাইয়ের কথা বলতেই, ম্লান মুখে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে, ‘সবই এই। দিনকাল কীরকম করে যে বদলে গেল। কত ভালো ছেলে ছিল। আমার কথায় ওকে কাজ দিলেন…আমার লজ্জা করে।’
