‘সোনালি আর ডেবি, তা হলে এই দু—জনই এখন লিড করছে।’ রাহুল নিশ্চিত স্বরে বলল।
কৃষ্ণপুর আসছে। দূর থেকে ওরা দু—জনকে দেখতে পেল। দু—পাশে মোটরবাইক, পিছনে একটা ছোটো ভ্যান তাতে সাদা একটা পতাকা বাঁধা। মোটর থেকে বেরিয়ে আছে একটি মাথা, ডা. সরকারের। মারুতি গিয়ে মোটরের পিছনে ফেউ নিল।
‘রাহুল তোমার তো রুমালটা সাদাই। চটপট ওই পতাকার মতো লাগাবার ব্যবস্থা করো, নইলে আটকে দেবে।’
‘কী দিয়ে লাগাব, একটা স্টিক চাই, একটা লাঠিফাটি অন্তত যদি—।’
অর্জুন মারুতিকে রাস্তার বাঁ দিক ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে প্রায় লাফিয়েই নামল। হাত দুই লম্বা একটা বাখারি কুড়িয়ে এনে গাড়িতে উঠল।
‘এটার সঙ্গে বেঁধে নাও, আর জানলার বাইরে উঁচিয়ে ধরে থাক। আমি ঠিক ভ্যানটার পিছু পিছু যাব।’
‘রুমালটা যে বাঁধব, একটা দড়িটড়ি—’রাহুল পিছনের সিটের দিকে তাকাল।
‘জুতোর ফিতে খুলে বাঁধো।’
পাশাপাশি দু—জন ছুটে যাচ্ছে। সোনালির পরনে গাঢ় হলুদ শর্টস ও বগলকাটা গেঞ্জি। চুলের রাশ গোছা করে টেনে বাঁধা। মাথা সোজা করে রাখা। পায়ে হলুদ জুতো। সোনালি আগাগোড়াই সোনালি। তার পাশে লাল ব্লাউজ আর কালো শর্টস পরা ডেবি ট্যাটারসল। সোনালির থেকে অন্তত এক বিঘৎ খাটো। কৃশ তনু। মাথাটি একটু ডান দিকে হেলানো।
পিছন থেকে দু—জনের মুখ দেখা যাচ্ছে না। রাহুলের মনে হল ডেবি যেন একবার মুখটা সোনালির দিকে ফেরাল আর হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দিল। বাঙ্গুর অ্যাভিন্যু ছাড়িয়ে লেকটাউন এসে গেল। ডেবি এবার থার্ড গিয়ারে তুলল তার গতি। সোনালি তার সঙ্গে লেগে রয়েছে।
এইবার রেসটা ট্যাকটিকাল পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওয়ার্ল্ড ক্লাস রানারের সঙ্গে দৌড়বার কোনো অভিজ্ঞতাই সোনালির নেই। ডেবির জমিয়ে রাখা দম আর শরীরের ক্ষমতা কতটা সোনালিকে সেটা এবার বুঝে নিয়ে নিজের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু বুঝতে পারবে কি? রাহুল উৎকণ্ঠা নিয়ে লক্ষ করতে লাগল।
কিনিয়ান দুই অ্যাথলিটের কথা ডা. সরকার বলেছিল। সহজ সরলভাবে দৌড়টাকে নিয়েছিল শুধুই হারজিতের একটা চ্যালেঞ্জের মতো। তার ভাবমুক্ত মনে দৌড়য় নিজেদের স্বাভাবিক ক্ষমতাকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে গিয়ে। রাহুল ভাবল, সোনালিও কি তাই করছে? ডেবি যতই ট্যাকটিকাল দৌড় দৌড়ক না, সোনালি তার ফুসফুস আর পেশির উপর ভরসা রেখে দৌড়ে যাচ্ছে। তার মধ্যেও কতটা শক্তি জমানো আছে তা এখনও প্রকাশ পায়নি।
‘কটা বাজে?’ অর্জুন জানতে চাইল। রাহুল ঘড়ির দিকে চোখ রেখে সময়টা বলতে যাচ্ছে তখনই ‘আরে সোনালি—’ বলে স্টিয়ারিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়ল।
সোনালি আচমকা গতি বাড়িয়েছে। সামনে উলটোডাঙ্গা ব্রিজ। ডেবিও সঙ্গে সঙ্গে গতি বাড়াল। রাস্তার দু—ধারে কাতারে কাতারে মানুষ। উলটোদিক থেকে আসা যানবাহন থেমে পড়েছে। প্রবল চিৎকার শুরু হয়েছে দু—জনের মধ্যে, কে এগিয়ে যাবে লড়াই শুরু হতে দেখে।
ব্রিজের শীর্ষ পর্যন্ত দু—জনে পাশাপাশি, তার পরই সোনালি একটু একটু করে ডেবিকে পিছনে ফেলে দিতে শুরু করল। ৪২,১৯৫ মিটার দৌড়ের শেষ দু—হাজার মিটারে যে এইরকম গতিতে দৌড়ানো যায় রাহুলের সেটা কল্পনার বাইরেই ছিল। তার মনে হল, ম্যারাথনের নয়, সে যেন দেড় হাজার মিটার দৌড়ের ফিনিশ দেখছে।
ভিআইপি রোড থেকে বাঁয়ে ইস্টার্ন মেট্রোপিলিটান বাইপাসে যখন সোনালি ঘুরল ডেবি তখন কুড়ি মিটার পিছিয়ে গেছে। গতিটা ধরে রেখে সোনালি, বাঁ দিকে বিধান নগর আর ডান দিকে মানিকতলা ও বেলেঘাটার মাঝ দিয়ে ছুটে যেতে লাগল। দূরে একটা বিরাট ফেস্টুন দেখা যাচ্ছে। তাতে ইংরাজিতে লেখা ‘ফিনিশ’।
সল্ট লেক স্টেডিয়ামের বাইরের ফটকের সামনে রাস্তার উপর সাদা রংয়ে দাগ টানা। সেখানে ইলেকট্রনিক ঘড়ি জ্বলজ্বল করে সময় নির্দেশ করছে। দাগের ওধারে কর্মকর্তাদের জটলা। ফিনিশের পঞ্চাশ মিটার আগে থেকে রাস্তার পাশে শাল খুঁটিতে বাঁশের বেড়া। পুলিশ দাঁড়িয়ে দশ গজ অন্তর।
আর যেতে দেওয়া হবে না গাড়িকে। পুলিশের নির্দেশে ফিনিশিংয়ের প্রায় আধ কিলোমিটার আগে অর্জুন রাস্তা ঘেঁষে মারুতিকে থামাল।
‘ফিনিশটা দেখা হল না।’ আক্ষেপ করল রাহুল।
‘যা দেখেছি তাই যথেষ্ট।’
সামনের ভ্যানটাকেও পুলিশ আটকে দিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে সারদাচরণ ও বিজয় দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। তাদের বাম বাহুতে সবুজ কাপড়ের পটি জড়ানো। সেটাই তাদের ছাড়পত্র।
‘সবুজ রুমাল আছে?’
অর্জুন মাথা নেড়ে বোঝাল নেই। দু—জনে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়াল। সোনালির মাথার চুলের গোছাটা তার পিঠের উপর ঝাপটাচ্ছে, এইটুকু ছাড়া তারা ওর আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না রাস্তায় বহু লোক নেমে পড়ায়।
সোনালি দু—হাত আকাশের দিকে তুলে দিল। একটা উল্লাস সেখানকার জনতার কণ্ঠ থেকে হাউইয়ের মতো শূন্যে উঠে গেল। সঙ্গে সঙ্গে অর্জুন ও রাহুল কবজি তুলে প্রায় একইসঙ্গে ঘড়ির দিকে তাকাল। পরস্পরের মুখের উপর অবাক চাহনি রেখে প্রায় একই সঙ্গে দু—জনে বলে উঠল, ‘দারুণ!’
‘দু—ঘণ্টা চব্বিশ মিনিট পঞ্চান্ন বা দু—চার সেকেন্ড এধার—ওধার! সোল অলিম্পিকসে তো সোনা জিতে যেতে পারত সোনালি, ইয়ে….স্বর্ণকুমারী!’ অর্জুনের উত্তেজিত স্বরে কয়েকটি ছেলে তার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এল।
