তার গাড়ির সামনে চরটি মেয়ে দৌড়োচ্ছে। কোনোরকমে পা ফেলেছে বলাই উচিত। মনে হচ্ছে আর মিনিট দশেক পরেই তুলে নিতে হবে। মুমূর্ষু, মৃত্যুমুখীন জন্তুকে দেখে শকুনিরা যেমন পাক দিতে দিতে নেমে আসে, সেইরকমই সংগঠকদের একটা ছোটো ভ্যান এই চারজনের পিছন পিছন চলেছে।
‘এদের ক্রস করে এগিয়ে যাও। তারপর তো সামনের রাস্তা ফাঁকাই।’ রাহুল অধৈর্য হয়ে বলল। ‘সবাই এগিয়ে গেছে, একজনকেও তো দেখা যাচ্ছে না। চলো চলো, ওভারটেক করো।’
অর্জুন তাই করল। মারুতিটা হঠাৎই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গতি নিল। মেয়ে চারটিকে বাঁ দিকে রেখে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল। পথে আবার পাঁচজনকে এক বাঞ্চে দৌড়তে দেখল। তাদেরও পাশ কাটিয়ে মারুতি এগিয়ে গেল।
‘মনে হচ্ছে সোনালি প্রথম বাঞ্চে আছে।’ অর্জুন বলল।
‘কতক্ষণ হল স্টার্ট হয়েছে?’
‘ঠিক সওয়া আটটায়। এখন হল—, ‘অর্জুন কবজি তুলল। রাহুলওতার ঘড়িতে চোখ রাখল।’ ন—টা আটচল্লিশ, তার মানে এক ঘণ্টা তেত্রিশ মিনিট রেস চলছে। অযথা দেরি করিয়ে দিল। এই জায়গাটা বামনগাছি।’
পথের ধারে টেবল পাতা। সেখানে বরফজল গ্লাসে নিয়ে ভলান্টিয়াররা অপেক্ষা করছে। গ্লুকোজ, পাতিলেবুও রয়েছে। অর্জুন গাড়ি থামিয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাই খবর কী? আমরা প্রেসের লোক। মেয়েদের মধ্যে প্রথম গেছে কারা বলতে পারেন?’
‘প্রথমে গেছে একজন মেমসাহেব, কী যেন নামটা?’
‘ডেবি ট্যাটারসল।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। তার প্রায় দুশো গজ পিছনে নিগ্রো মেয়েটা। আর তার কুড়ি গজ পিছনে একজন।’
‘কীরকম তাকে দেখতে, ইন্ডিয়ান কি?’
‘৫১ নম্বর। দাঁড়ান, লিস্ট দেখে বলছি।’ লোকটি টেবলে বসা একটি লোকের কাছ থেকে জেরক্স করা নামের তালিকাটা চেয়ে নিল।
‘৫১ নম্বর সোনালি সরকার। বাঙালি মেয়ে। কিন্তু দেখলে তো মনে হয় না!’
‘কতক্ষণ আগে ওই তিনজন গেছে?’
‘তবু, আন্দাজে বলুন।’
‘কী জানি ঘড়ি দেখেনি।’
রাহুল দাঁত চেপে মনে মনে অশ্রাব্য বিশেষণে তাকে ভূষিত করল। একটি বালক হঠাৎ বলল, ‘তখন সওয়া ন—টা হবে।’
‘তার মানে এক ঘণ্টায় ওরা এখানে পৌঁছেছে। ওদের পরের মেয়েরা কতক্ষণ বাদে এল?’
‘ওহহ, সে অনেক পর পর। ওদের পরের মেয়েটা তো দশ মিনিট বাদে, তার পর একসঙ্গে দুটো মেয়ে পনেরো মিনিট বাদে। ধুঁকছে, মনে হয় না শেষ করতে পারবে। বোধহয় প্রথম দিকে জোরে ছুটে ফেলে এখন আর সামলাতে পারছে না। তা স্যার আপনারা কোন কাগজের লোক?’
‘প্রাভদা।’ বলে অর্জুন মারুতি ছেড়ে দিল।
বারাসাতে ঢুকেই একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানল, প্রথমে গেছে ডেবি, তার পিছনে একইসঙ্গে ক্যাথি আর ৫১ নম্বর। আর তাদেরও পিছনে দশ—বারোজন পুরুষ।
‘বুঝলেন দাদা, ওই মেয়ে তিনটের যা দম আর স্ট্যামিনা দেখলাম, অনেক পুরুষকে হারিয়ে দেবে। পনেরো মিনিট আগে স্টার্ট নিয়ে কি না মেয়েমানুষের কাছে পিছিয়ে পড়ল! রামো, রামো। ভালো করে একটু লিখে দেবেন।’
‘দোব?’
‘কী পেপার আপনার?’
‘নিউ ইয়র্ক টাইমস।’ রাহুল জানলার কাচ তুলে দিল।
মধ্যমগ্রামের মোড়ে পৌঁছবার আগেই তারা মেয়ে রানারদের পেতে শুরু করল। ক্লাসপায়ে, দরদর ঘামতে ঘামতে প্রায় জগ করার মতোই তারা এগোচ্ছে। তাদের একে একে ছাড়িয়ে গিয়ে একটি ভারত মেয়েকে পেল আর মুখে ক্লান্তির ছাপ ফুটলেও, দীর্ঘ সরু পায়ের কদমে তা ধরা পড়ছে না। হাতকাটা ব্লাউজটা ভিজে জবজবে। মাথায় বরফজল ঢালার জন্য কিংবা ঘামের জন্যও হতে পারে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। ওর পাশে পাশে মোটরবাইকে এসকর্ট চলছে।
‘শীলা নাসডু বোধ হয়।’
‘ওর বেস্ট টাইম তো দু—ঘণ্টা চুয়াল্লিশ মিনিট?’
‘ওই টাইটাই যদি শীলা রাখে মানে এখনো পর্যন্ত ওই গতিতেই ছুটে থাকে তা হলে সোনালিরা আরও কম টাইমে ফিনিশ করবে।’
‘কত কমে?’ রাহুল সামনে তাকিয়ে কয়েকজন পুরুষ প্রতিযোগীকে দেখতে পেল।
‘দু—ঘণ্টা পঁয়ত্রিশ? দু—ঘণ্টা বত্রিশ। ওই দু—ঘণ্টা তিরিশ? পেসটা ডেবিই সেটা করেছে, ওকে চেঞ্জ করেছে দু—জন?’
‘এই টেম্পারেচারে, এমন হিউমিড কন্ডিশনে এই রকমটাইম রাখা, মনে হয় না সম্ভব।’
বাঁদিকে দমদম এয়ারপোর্টের পাঁচিল। একটা এয়ারবাস নামার জন্য এখন ইনবাউন্ড হয়ে পি—লুপ টার্ন নিচ্ছে। এবার রানওয়ের সঙ্গে একই লাইনে আসবে। রাহুল আকাশের দিকে তাকিয়ে প্লেনের অবতরণ লক্ষ করায় ব্যস্ত।
অর্জুন ব্রেক কষে মারুতিকে থামাল। রাস্তায় একটা ট্রাক উলটে রয়েছে। ভিড় জমে গেছে। ওলটানো ট্রাকের পাশ দিয়ে একটামাত্র গাড়ি যাবার জায়গা রয়েছে। হলুদ—কালো চৌখুপ্পি ঘর কাটা একটা হাইওয়ে পেট্রল জিপ দাঁড়িয়ে। গাড়ি চলাচল বন্ধ করে ম্যারাথন রানারদের আগে পথ করে দেওয়ার কাজে পুলিশ ব্যস্ত।
‘হয়ে গেল!’ হতাশ স্বরে অর্জুন দু—হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙল। ‘এখান থেকে বেরোতে বেরোতে ওরা তো ভি আইপি রোড ধরে ফেলবে।’
পুরুষ রানার ক—জন বেরিয়ে গেল। দমদম থেকে আসা কিছু গাড়ি ছাড়া পেল। শীলা নাইডুর জন্য পথ করে দিতে আবার গাড়ি চলা বন্ধ। এর পর মধ্যমগ্রামের দিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে যেতে দেওয়া হল।
যশোর রোড থেকে বাঁদিকে ঘুরে ভিআইপি রোডে পড়েই অর্জুন মারুতিকে সত্তর কিলোমিটার বেগে ধাওয়া করাল। কৈখালি ফেলে রেখে বাগুইআটির মোড় পার হয়ে দেখল ক্যাথি বোডো আর তার পঞ্চাশ মিটার আগে দু—জন পুরুষ ছুটছে। সামনে যত দূর চোখ যায় আর কোনো রানারের টিকিও দেখা যাচ্ছে না।
