‘হয়েছিল।’
‘কত?’
সোনালি বললে যাচ্ছিল সময়টা কিন্তু তার আগেই বিজয় হাঁই হাঁই করে উঠল। ‘নো নো, ডোন্ট ডিজক্লোজ ইট বিফোর দি রেস।’
‘এত গোপনীয়তার কি আছে? ওয়ার্ল্ড বেস্ট টাইম কী?’ রাহুল ইচ্ছে করেই একটু ব্যঙ্গের রেশ মাখাল তার কথায়। সোনালির চোখ দপ করেই আবার হাসিতে ভরে গেল।
‘ওয়ার্ল্ড বেস্ট! হতে পারে।’ সামান্য কাঁধ ঝাঁকাল সোনালি। ক্রীড়ামন্ত্রীর বক্তৃতা অপ্রত্যাশিতভাবে এত সংক্ষিপ্ত হবে বোধহয় কেউ তা ভাবেনি। তাই রেহাই পাবার আনন্দে হাততালি খুব জোরেই পড়ল।
‘ভারত থেকে কোনো মেয়ে অলিম্পিকসে ম্যারাথনে যায়নি। আপনি কি মনে করেন যেতে পারেন? এটা তো অলিম্পিক ট্রায়ালই।’
‘ভারতের মেয়েরা নিশ্চয়ই যেতে পারে। সোল গেমসের সিকসথ পোজিশন টাইমিং টাচ করলেই কোয়ালিফাই করতে পারবে। আই ও এ সেইরকমই জানিয়েছে। অবশ্য গতবারের মতো যদি হয় তা হলে কোনো কোয়ালিফাইং টাইমিংয়ের প্রশ্নই থাকবে না।’
‘আপনি পি টি উষার সোল যাওয়ার ব্যাপারটা বলছেন?’
সোনালি উত্তর না দিয়ে শুধু হাসল।
‘সোল ওলিম্পিকসে সিকসথ পোজিশনের টাইমিংটা কত ছিল জানেন কি?’
‘দু—ঘণ্টা আটাশ মিনিট সাত সেকেন্ড।’
ব্যস্ত ভঙ্গিতে সারদাচরণকে আসতে দেখা গেল।
অর্জুন ফিসফিস করে রাহুলের কানে বলল, ‘পিটিআই এবার কেটে পড়ো।’
‘দাঁড়াও না।’
‘গুড মর্নিং মি. অরোরা, মি. হালদার। কতক্ষণ এসেছেন?’
‘মিনিট কুড়ি। কথা বলছিলাম আপনার মেয়ের সঙ্গে।’
‘নিশ্চয়। বুলন কথা।’ সারদাচরণ প্রত্যয় ভরে সোনালির দিকে তাকালেন।
‘তোমার সঙ্গে পরিচয়—’
‘হয়ে গেছে, হয়ে গেছে।’ রাহুল ওনাকে থামিয়ে দিয়ে সোনালির দিকে তাকাল। ‘আজ কি ওই টাইমিং টাচ করতে পারবেন?’
‘পারতেই হবে নয়তো বার্সিলোনা যাওয়ার জন্য। তাতেও কোয়ালিফাই করতে পারেন। কলকাতায় সল্ট লেকে তো অলিম্পিক ট্রয়ায়াল হবে সামনের মাসেই।’
‘হ্যাঁ মাস্টার্স মিট হবে।’
বন্দুকে ফায়ারিংয়ের শব্দ এবং জনতার উচ্ছ্বাস ধ্বনিতে বোঝা গেল পুরুষদের যাত্রা শুরু হল। ওরা সবাই মুখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল রাস্তা ধরে প্রায় ধাক্কাধাক্কি করে সত্তরটি লোক মন্থর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য পাঁচ কিলোমিটার পর থেকেই ভিড়টা পাতলা হয়ে ওরা দ্রুত পা ফেলার মতো ফাঁকা জায়গা পেয়ে যাবে।
রাহুলের চোখে পড়ল কালো ট্র্যাকসুট পরা এক শ্বেতাঙ্গ বিদেশিনীকে। পুরুষদের স্টার্টিং দেখতে গেছল, ফিরে এসে কিট ব্যাগটা তুলে নিয়ে এক কৃষ্ণাঙ্গী বিদেশিনীর সঙ্গে কথা বলছে। ক্যামেরা হাতে। কাঁধে পেটমোটাব্যাগ ঝোলান দু—জন লোক তাদের দিকে এগিয়ে গেল। বোধহয় প্রেস ফোটোগ্রাফার।
‘ইনিই নিশ্চয় ডেবি ট্যাটারসল। আর অন্যজন কে?’
‘তানজানিয়ার ক্যাথি বোডো।’ সোনালি একঝলক তাকিয়ে নিয়ে বলল। ‘ডেবি ওয়ার্ল্ড ক্লাস রেসার, ক্যাথির বেস্ট টাইমিং জানি না।’
‘এই রেসে কোয়ালিফাই করার জন্য দৌড়বেন তার মানে দু—ঘণ্টা আটাশ মিনিটের মধ্যে—’ রাহুলের কথা ডুবে গেল মাইকে গাঁক গাঁক করে ওঠা ঘোষণায়। যেসব মেয়ে এখনো স্টার্টিং লাইনে আসেনি তাদের শেষবারের মতো অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
সোনালিরা দ্রুত সেদিকে রওনা হল। যাবার সময় সে হাত নেড়ে রাহুলকে চেঁচিয়ে বলল, ‘দেখা যাক, বার্সিলোনা যেতে পারি কি না।’ কথাটা বলেই সে একটা চোখ টিপল।
‘চলো, স্টার্টিংটা দেখি।’ চোখ থেকে ক্যামেরা নামিয়ে অর্জুন বলল।
‘তুমি যাও, আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি।’
‘বেশ। আমি তা হলে গোটাকয়েক স্ন্যাপ নিয়ে আসি।’
রাহুল গাড়িতে এসে পিছনের সিটে পা গুটিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। কাল মাঝরাতের পর ঘুমিয়ে আর ভোরে ঘুম থেকে ওঠার জন্য তার এখন ঘুম পাচ্ছে। ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে জেগে উঠলে মেয়েদর রেসের ১৫ কিলোমিটার পর থেকে দেখা যাবে। তার আগে দেখার মতো কিছু তো ঘটবে না। ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত মেয়েরা স্বচ্ছন্দে দৌড়ে যাবে।
ঘুমে আচ্ছন্ন চেতনায় রাহুল অস্পষ্টভাবে বন্দুকের শব্দ শুনল। সময় এখন কত দেখার জন্য বাঁ হাতের কব্জিটা চোখের সামনে আনার জন্য তার মস্তিষ্ক নির্দেশ পাঠাল কিন্তু বাঁ হাত তা মানতে চাইলনা। আবার নির্দেশ গেল। বাঁ হাত চেষ্টা শুরু করল। একটু একটু করে হাতটা বুকের কাছ থেকে উঠে ঝপ করে পড়ে গেল গাড়ির মেঝেয়। আধমিনিটের মধ্যে রাহুলের বুক ওঠা—নামা করতে লাগল গভীর শ্বাস—প্রশ্বাসের নিয়মিত তালে।
একটা স্পিড ব্রেকারে গাড়িটা লাফিয়ে উঠতেই তার ঘুম ভাঙল। ধড়মড়িয়ে উঠে বসেই সে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, গ্রামের মতো একটা জায়গা কিন্তু যথেষ্ট পাকা বাড়িও দেখা যাচ্ছে। দোকানগুলোয় কিছু কিছু বিলাস দ্রব্যও রয়েছে। রাস্তার ধারে সারি দিয়ে লোক। বাচ্চচা কোলে বউ থেকে লাঠি হাতে বৃদ্ধ, নানান বয়সি মানুষ, চোখে—মুখে উত্তেজনা, হাসিমুখ। চিৎকার করে অল্পবয়সিরা হাত নাড়ছে।
মাথা ঝাঁকিয়ে রাহুল বলল, ‘কতক্ষণ হল শুরু হয়েছে? আমরা এখন কোথায়? সোনালির কী হল?’
‘ট্রেস করতে পারছি না। এইসব অর্গানাইজাররা এমন ব্যবস্থা করেছে! আমাকে এগোতে দিল না বাঞ্চের সঙ্গে। বলল নিয়ম নেই। পিছন পিছন গাড়ি গেলে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। বললুম পাশে পাশে যাব। তাও অ্যালাওড নয়। হোয়াট আ ব্লাডি অ্যারেঞ্জমেন্ট! তোমার অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি,প্রেসের গাড়ি, টিভি—র গাড়ি, নিজেদের গাড়ি যাচ্ছে আর আমার কম্পিটিটার রয়েছে কিন্তু আমার গাড়ি যেতে পারবে না!’ অর্জুন প্রবল বিরক্তিভাবে ক্লাচ আর ব্লেক একসঙ্গে চেপে ধরল।
