মেয়েদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান ডেবি ট্যাটারসলকে বিজয়ী প্রায় বলেই দেওয়া হয়েছে। গত সোল ওলিম্পিকসে সে এগারো স্থান পেয়েছিল ২ ঘণ্টা ৩২ মিনিট ৬ সেকেন্ড সময় করে। এখন বয়স ৩১। দুই ছেলের মা। সোনা বিজয়িনী পোর্তুগালের রোজা মোতার থেকে তার সময় মাত্র ছয় মিনিটরে একটু বেশি ছিল। অন্যান্যদের যা সময় দেওয়া হয়েছে তাতে ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের কমে আর কেউ নেই। ভারতীয় মেয়েদের মধ্যে সেরা সময় অন্ধ্রপ্রদেশের শীলা নাইডুর ২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট। তিনটি বাঙালি মেয়ে রয়েছে তাদের দু—জনের সময় সওয়া তিন ঘণ্টার কাছাকাছি। ‘তৃতীয় মেয়ে সোনালি সরকার, তার সেরা সময় কত, তা জানা যায়নি।’
মোটর থেকে নেমে রাহুল স্টার্টিং পয়েন্টের দিকে এগিয়ে গেল। প্রায় দুশো লোকের জটলা যার মধ্যে ৭০ জন দৌড়বে। সে খুঁজছিল সারদাচরণ আর সোনালিকে। সামিয়ানার পিছনের মাঠেও একটা ভিড়। মেয়ে প্রতিযোগীরা সেখানে জড়ো হয়েছে। বেশিরভাগ মেয়েই ট্র্যাকসুট পরা, ওয়ার্ম আপে ব্যস্ত।
রাহুল পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। মেয়েদের মধ্যে তাকাতে তাকাতে একজনকে দেখে তার চোখ আটকে গেল। নিশ্চয়ই স্বর্ণকুমারী। দৈর্ঘ্য, গায়ের রং আর মুখের গড়ন তার চেনা। পরশু রাতে ফিল্মে দেখা মেয়েটিকে সে এর মধ্যেই ভুলতে পারে না। সম্ভবত কুড়ি বছর পর দেখালেও চিনে ফেলবে।
দু পা ফাঁক করে ঝুঁকে ক্যারিসথেনিকসে রত সোনালি। পরনে উজ্জ্বল হলুদ ট্র্যাকসুট। হলুদ ফিতে দিয়ে চুল টেনে বেঁধে রাখা। পাশে দাঁড়িয়ে বিজয় সিনহা তার গা গরমের ব্যায়াম দেখছে আর কথা বলে যাচ্ছে। রাহুল কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে এই প্রথম চাক্ষুষ করছে স্বর্ণকুমারীকে।
বিজ্ঞাপনের লোকেদের সামনে কোনো প্রোডাক্টকে যখন হাজির করা হয় বা কোনো দ্রব্যের বাজারে ছাড়ার জন্য ঢাক—ঢোল পেটানোর অনুষ্ঠান হয় তখন চোখ এবং মন ভোলানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত নিতম্ব, স্তন ইত্যাদি অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র প্রোডাক্টের দিকেই নজর রেখে যাওয়ার কাজটা রাহুল শিখে ফেলেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ব্যাপারটা উলটো। এখানে কামনা করার মতো রমণীয় মূর্তি ধরে হাজির প্রোডাক্ট স্বয়ং। ক্যামেরা লেন্স মারফত সে স্বর্ণকুমারীর প্রতিটি রোমকূপের গোড়া পর্যন্ত দেখে নিয়েছে, তার পরিসংখ্যানও পড়ে ফেলেছে, তার জন্মমৃত্তান্ত জেনে গেছে, কিন্তু একটা জিনিস সে জানত না যেটা এখন জানল—মেয়েটির যৌন আবেদন। হৃৎস্পন্দন গতি দ্রুত হল, শরীরে আবেগ সঞ্চার করল, মনের মধ্যে ঝড় তুলল জাতীয় বস্তা—পচা কথা বাদ দিয়ে সোজা কথায় রাহুলের মনে হল লক্ষ মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে আলাদা হয়ে যায় পুরুষের মধ্যে যে পাশব কামনা জাগাবার ক্ষমতার জন্য, এই মেয়েটির মধ্যে তা রয়েছে।
স্বর্ণকুমারীর জন্য ট্র্যাকসুটের থেকেও আরও বেশি মোহময় পোশাকের কথা রাহুল ভাবতে পারে কিন্তু তার কোনো দরকার আছে বলে তার মনে হল না। ওর পুরো অস্তিত্ব থেকেই এটা ফুটে বেরোচ্ছে। স্বর্ণকুমারী তার থেকে ইঞ্চি দুয়েক লম্বা, তা হোক। আকর্ষণের কারণটা ওর শরীরের পরিসংখ্যানের ব্যাপার নয়, যদিও চমৎকার ওর গড়নের সামঞ্জস্য। ওর শরীরের আদলের জন্যও নয়। রাহুলের মনে হল মেয়েটি তাকে আকর্ষণ করছে সফলতার জন্য। রাহুলের মনে হল মেয়েটি তাকে আকর্ষণ করছে সফলতার জন্য। যেন ও ধরেই নিয়েই, পৃথিবীর সবাইকে হারিয়ে জিতে নিয়েছে। এই ধারণা বা বিশ্বাসটাই ওর চোখে—মুখে, দেহের গতিতে ধকধক করে যাচ্ছে।
অর্জুন কাছে এসে দাঁড়াল। কাঁধ থেকে ক্যামেরা ঝুলছে। সিগারেট প্যাকেট এগিয়ে দিতে রাহুল একটা বার করে নিয়ে ধরাল।
‘স্বর্ণকুমারীকে দেখছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী মনে হচ্ছে?’
‘খুবই আকর্ষণীয়।’
এই সময় সোনালি তার ওয়ার্ম আপ শেষ করে সামনে তাকিয়ে দু—জন লোককে দেখে হেসে মাথা ঝাঁকাল। মনে হল, যেকোনো অপরিচি লোক যদি বন্ধুর মতো চাহনিতে তার দিকে তাকায় তা হলেই সে হেসে মাথা নাড়বে।
‘ডা. সরকারকে দেখছি না যে?’
‘অর্গানাইজারদের সঙ্গে কথা বলছে। পুরুষদের রেস এবর শুরু হবে, দেখবে না?’
‘বক্তৃতার ব্যাপারগুলো চুকে যাক। ততক্ষণ স্বর্ণকুমারীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা যাক।’ রাহুলের কথা শেষ হতে—না—হতেই মাইকে গমগম করে ঘোষণা হল ক্রীড়ামন্ত্রীকে এবার মালা দেওয়া হচ্ছে। রাহুল স্বর্ণকুমারীর দিকে এগিয়ে গেল।
‘গুডমনিং, আপনিই কি সোনালি সরকার?’
‘হ্যাঁ।’ অবাক চোখে সে তাকাল।
‘আমি প্রেসের লোক, পিটিআই। কয়েকটা প্রশ্ন করব।’
‘রেসের সময় হয়ে এল, পরে প্রশ্ন—ট্রশ্ন করবেন।’ বিজয় সিনহা ভারিক্কি চালে বলল। ‘মেন্টাল প্রিপারেশন নিয়ে ফেলেছে, এখন আর ডিস্টার্ব করা উচিত নয়।’
‘না না, আমার মেন্টাল ব্যালান্স ঠিকই থাকবে। হ্যাঁ বলুন, কী প্রশ্ন?’
রাহুলের ভালো লাগল ওর স্বচ্ছন্দ ঝরঝরে ভঙ্গিতে কথা বলার ধরন। চোখে কৌতূহলের পরিমাণ দেখে তার মনে হল, জীবনে কখনো কোনো সাংবাদিকের সম্মুখীন হয়নি।
‘অনেকেরই টাইমিং কাগজে বেরিয়েছে, আপানারটা নেই। আপনি এর আগে কখনো ম্যারাথনে নামেননি। কিন্তু প্রাইভেট ট্রায়াল নিশ্চয় দিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ দিয়েছি।’
‘তখন টাইমিং নেওয়া হয়েছিল নিশ্চয়।’
