‘অলটিচিউডের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’ রাহুল বলল। কোথায় যেন একটা লেখায় সে পড়েছিল। ‘হয়তো কিনিয়া পর্বতের অঞ্চলে ওর বাস করে।’
‘এটা ঠিকই কথা, হালকা পাতলা বাতাসের মধ্যে ট্রেনিং করলে দম বাড়ে কেননা ফুসফুস আর হৃৎপিণ্ডকে বেশি খাটতে হয় পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছে দেবার জন্য। কিন্তু সমুদ্রের লেভেলে হপ্তায় ১০০ মাইল দৌড়লে যে উন্নতি হয় ততটা সম্ভব নয় ছ—হাজার ফুট উপরে হপ্তায় পনেরো মাইল দৌড়লে। না, মি. অরোরা, অলটিচিউড—এর কারণ নয়। কিনিয়ান দু—জন অত ভালো দৌড়েছিল, যেহেতু ট্র্যাকের টেকনিক্যাল ব্যাপার—স্যাপার সম্পর্কে কিছুই না জানার জন্য বা যাদের বিরুদ্ধে দৌড়চ্ছে তাদের বিরাট খ্যাতির বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞ থাকার। অতি সহজ সরল ভাবে তারা দৌড়টাকে নিয়েছিল হার—জিতের চ্যালেঞ্জ হিসাবে। অ্যাথলিটরা মনে করে সেরা প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে নামলে নিজেদের মানের উন্নতি ঘটবে। কথাটা হয়তো সত্যি। কিন্তু উন্নতি হবে কোন পর্যন্ত? যাদের বিরুদ্ধে দৌড়োচ্ছে তাদের স্তর বা সামান্য আর একটু উপর পর্যন্ত উঠবে। একই পর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে অবিরত প্রতিযোগিতা করার ফলে তাদের একটা ছাঁচ এসে যায়। এক মাইল দৌড়োনো মানে ট্র্যাকটা একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে চক্কর দিতে হবে। তারা বিশ্বাস করে, ট্রেনিং তাদের শারীরিক সম্ভাবনার পূর্ণতায় পৌঁছে দিচ্ছে, আসলে কিন্তু তা দিচ্ছে না। তাই যদি হত তা হলে আমাদের ধারণায় যারা যথেষ্ট ট্রেনিং পাওয়া নয়, সেই দুই কিনিয়ান ওদের সঙ্গে লড়াইয়ে রয়ে গেল কী করে?’
‘আপনি বলতে চান নিয়মিত কম্পিটিশন একজন অ্যাথলিটের উন্নতিকে সীমিত করে দেয়।’
‘ঠিক তাই।’ সারদাচরণ একটু উত্তেজিতভাবেই বলে উঠলেন। ‘স্বর্ণকুমারী যদি কোনো অ্যাথলেটিক ট্রেনিং সেন্টারে যোগ দিত তা হলে সেখানকার অন্যান্য মেয়েদের থেকে খুব খারাপ বা খুব ভালো কিছু হত না। মাঝারিয়ানার ফাঁদে যাতে না পড়ে সে জন্য ইচ্ছে করেই আমরা ওকে কম্পিটিশনের থেকে সরিয়ে রেখেছি। এজন্য অভিজ্ঞতা থেকে ও হয়তো বঞ্চিত হয়েছে কিন্তু তার বদলে লাভও করেছে কিছু। কিনিয়ানদের মতোই দৌড়কে সে ভাবমুক্ত মনে নিতে পেরেছে, পাবলিসিটির ডামাডোল শান্তি নষ্ট করছে না আর যথাসময়ে নামী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোক্ষম ঘা মারার ক্ষমতা ও রাখে। স্বর্ণকুমারী সম্পর্কে আর কিছু বলার থেকে বরং আপনার তাকে স্বচক্ষে দেখাই ভালো। পরশু রবিবার সকালে সে ম্যারাথনে নামবে। জীবনে তার প্রথম প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার উদ্যোগে পুরুষ আর মেয়েদের নিয়ে এটা হচ্ছে। পাঁচ লক্ষ টাকা টোট্যাল প্রাইজমানি। দু—বিভাগেই বিজয়ী পাবে এক লক্ষ টাকা। অশোকনগর থেকে শুরু হবে সকাল আটটায়, প্রথমে পুরুষরা, তার পনেরো মিনিট পর মেয়েরা স্টার্ট করবে। ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩৫ ধরে এসে বারাসাত, সেখান থেকে দমদম, ভি আই পি রোড ধরে উল্টোডাঙার মোড়, ইস্টার্ন বাইপাস পাস দিয়ে সল্ট লেক স্টেডিয়ামে শেষ হবে। এই রেসটা কিন্তু ওলিম্পিক ট্রায়াল হিসেবেও গণ্য হচ্ছে। আর ঠিক দু—মাস পর ৩১ জুলাই বার্সিলোনায় অ্যাথলেটিকস ইভেন্টগুলো শুরু হবে, প্রথম দিনেই থাকছে মেয়েদের ম্যারাথন।’
‘পরশু আমি দেখতে যাব।’ রাহুল দু—হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে বুঝিয়ে দিল আর সে কথা বলতে চায় না।
চার
‘ভোরবেলাতেই সারদাচরণ আর কোচ বিজয় সিনহা মোটরে রওনা হয়ে গেছল সোনালিকে নিয়ে অশোকনগরের উদ্দেশ্যে।
রাহুল আর অর্জুন পৌঁছল ম্যারাথন শুরু হবার আধ ঘণ্টা আগে, সাড়ে সাতটায়। ফুটবল মাঠে একটা সামিয়ানা খাটানো হয়েছে তার নীচে কাঠের মঞ্চ। সেখানে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে এক যুবক অবিরাম ঘোষণা করে যাচ্ছে। তিন—চারটি ফেস্টুন রাস্তায় আড়াআড়ি দড়ি দিয়ে বাঁধা। পুলিশ আর ভলান্টিয়াররা ভিড় ঠেলে রাখার ব্যস্ত। রেস শুরু হবার আগে বক্তৃতা হবে। পশ্চিমবাংলার ক্রীড়ামন্ত্রী বন্দুক ফুটিয়ে দৌড় শুরুর সংকেত দেবেন।
আবহাওয়া আজ খুব ভালো। এখন পর্যন্ত রোদের তাত বাড়েনি। তাপমাত্রা ৩১ ডিগ্রির কাছাকাছি রয়েছে। ফুরফুরে হাওয়া বইছে। পুরুষ আর মেয়ে রানারদের হাজিরা কলকাতাতেই নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাসে তাদের আনা হয়েছে। জানিয়েই রাখা হয়েছিল, সোনালি আলাদাভাবে আসবে অশোকানগরে।
সাত—আটটা মোটর আর পনেরোটা মোটর সাইকেল সংগঠকরা রেখেছে রানারদের সঙ্গে থাকার জন্য। দুটো অ্যাম্বুলেন্সও। ঘোষণা থেকে জানা গেল পুরুষ বিভাগে প্রতিযোগী ৭০ জন। মেয়েদের সংখ্যা ২১। আড়াইশো পুরুষ নাম পাঠিয়েছিল, তার মধ্য থেকে বাছাই করে ৭০ জনকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে সাতজন পুরুষ এসেছে,—নেপালের তিনজন, কিনিয়া ও ফিলিপিনস থেকে একজন করে ব্রিটেন থেকে দুজন। বিদেশি মেয়ে আছে চারজন। সিঙ্গাপুর, তানজানিয়া, শ্রীলঙ্কা আর অস্ট্রেলিয়া থেকে তারা এসেছে।
ছোটো গাড়ি মারুতি নিয়ে ওরা এসেছে। স্টাটিং পয়েন্ট থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরে গাড়িতে বসে খবরের কাগজ পড়ায় ব্যস্ত দু—জনেই। খেলার পাতায় আজকের ম্যারাথন প্রসঙ্গে যা সব বেরিয়েছে, সেগুলো খুঁটিয়ে ওরা দেখছিল। কে জিততে পারে তাই নিয়ে বিজ্ঞ আলোচনা রয়েছে। সম্ভাব্য বিজয়ী হিসাবে পুরুষদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ আর কিনিয়ান রানারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নামকরা নয় তবে ব্রিটিশটি গত দু—বছর লন্ডন ম্যারাথন দৌড়ে ৩১ ও ৪২ স্থান পেয়েছিল। গতবছর রটারডমে কিনিয়ানটি ৪৭ জনের পর শেষ করে। শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতেই ওরা ফেভারিট।
