‘তা হলে দু—চারটে কথা বলার জন্য প্রায় চার লাখ টাকা!’ হীরাভাই নির্ভেজাল বিস্ময় নিয়ে রাহুলের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘ফ্লোরেন্সের এজেন্ট এক—একটা প্রোডাক্ট এক বছরের জন্য এনডোর্সমেন্ট বাবদ তিন লক্ষ ডলার চেয়েছিল, দরাদরি করে সেটা আড়াই লক্ষ ডলারে দাঁড়ায়। পুতুল তৈরি করে এম সি এ, তারা বারবি ডল বানিয়ে বিরাট সফল হয়েছিল, সেই আদলে ‘ফ্লো জো’ ডল বানাবার চুক্তি করে ফ্লোরেন্সের সঙ্গে। সে জন্য লাইসেন্সিং কনট্র্যাক্টে সে প্রথমে পায় আড়াই লাখ ডলার আর পাচ্ছে বিক্রির একটা পার্সেন্টেজ। এ ছাড়া সফট ড্রিঙ্কস, অ্যাপারেল, ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও চুক্তি হয়। কিন্তু কথাটা হল, কেউ এত পেল না অথচ ও পেল কেন? ১৯৮৪—তে মেরি লু রেটন জিমন্যাস্টিকস সোনা জিতে এনডোর্সমেন্ট থেকে প্রায় আধ কোটি ডলার আয় করেছিল। এত টাকাই ১৯৭২—এ পেয়েছিল মার্ক স্পিৎজ। ফ্লোরেন্সের আয় বছরে দশ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছিল। সেটা কি শুধু রেকর্ড করা পারফরমেনসের জন্যই? সে তো অনেকেই করেছিল।
‘আসল ব্যাপারটা হল ইমেজ। সোলে যাওয়ার আগে থেকেই সে নিজের একটা স্বতন্ত্র ইমেজ তৈরি করে যাচ্ছিল সযত্নে। সোলে সেটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে অবিশ্বাস্য ১০০ মিটার রেকর্ড করে। নিউ ইয়র্ক ওয়াল্টার টমসনের ডিরেক্টর অফ ট্যালেন্ট তখন বলেছিল: ‘শী ইজ গ্রেট লুকিং, ওয়ারস কালারফুল কস্টিউমস অ্যান্ড ইজ আ পার্সোনালিটি।’ এক পা কাটা রানিং স্যুট, লম্বা লম্বা রঙিন নখ তার ইমেজকে ওরিজিনালিটি আর ফ্রেশনেস দিয়েছিল। নিউ ইয়র্কের আর একটা বিজ্ঞাপন এজেন্সি, ওগিলভি গ্রুপের কাস্টিং বিভাগের হেড বলেছিল, ফ্রোরেন্স এক ধরনের চরিত্র আর ওর আপিলটা সেখানেই। বিজ্ঞাপন কোম্পানির কর্তারা ওকে কর্পোরেট প্রতিনিধি হিসাবে সব থেকে আকর্ষণীয়া মনে করেছিল বলেই এখন সে প্রায় এক কোটি ডলারের মালিক।’
‘ষোলো কোটি টাকা।’ হীরাভাই বলল।
‘আমরা তো ২৫ লাখের বেশি ভাবতে সাহসই পাইনি! পাব কী করে, ভারতে অত বড়ো বড়ো কোম্পানিই যাদের প্রোডাক্ট পৃথিবী ছড়িয়ে বিক্রি হয়! বিজ্ঞাপনে খরচ করবে কাদের জন্য? খদ্দেররা তো গরিব।’ অর্জুন বলল।
সারদাচরণ চুপ করে এতক্ষণ শুনছিলেন। এবার কথাবার্তার মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্য বললেন, ‘মি. অরোরা, একটা কথা আপনাকে বলতে পারি, লাখ পাঁচেক টাকা যের আমরা এই প্রোজেক্টে ঢেলেছি সেটা একেবারেই কিছু না জেনে, না বুঝে অজ্ঞের মতো নয়। সত্যি কথাটা হল আমরা এখন টেলিভিশন যুগে। অন্যান্য স্পোর্টসের মতো দৌড়ও এখন এত ছক কেটে হচ্ছে যার ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও হাড্ডাহাড্ডি হচ্ছে। বিজয়ী আর বিজিতের মধ্যে পার্থক্যটা অতি সামান্য। অনিশ্চয়তা না থাকলে নাটকীয়ত্ব থাকে না, দর্শকদের জড়িয়ে পড়াটাও ঘটে না।’
‘যে মাঠে টিভি ক্যামেরা চলবে না, সেখানে স্পনসরসও থাকবে না, স্পোর্টসও আর হবে না।’ রাহুল কথাগুলো বলল সারদাচরণের সঙ্গে সুর মিলিয়ে। ‘এ পর্যন্ত আমি আপনার সঙ্গে একমত। কিন্তু নাটকীয়তা কি দূরপাল্লার দৌড়ে সম্ভব?’
‘সম্ভব, যদি অজানার, অপ্রত্যাশিতের পরশ তাতে থাকে। কিনিয়ার অ্যাথলিটরা কেমন চমক জাগিয়েছিল নিশ্চয় আপনার তা মনে আছে। ইথিওপিয়ার আবেবা বিকিলা? খালি পায়ে দৌড়ে রোমে ম্যারাথন জিতে আবার টোকিওতেও জিতেছিল। লোকে টগবগ করে উঠেছিল। মুখে মুখে তখন কিনো, টেমু, বিকিলার নাম। আফ্রিকার এই উত্থান কিন্তু আসলে এদের আরও দশ বছর আগে শুরু হয়েছিল। ১৯৫৪—য় ভ্যাঙ্কুভার কমনওয়েলথ গেমসে কিনিয়া দু’জন কিসি উপজাতির অ্যাথলিট পাঠায় দূরপাল্লা দৌড়ে অংশ নিতে। তখন পর্যন্ত বিশ্বাস করা হত দূরপাল্লা দৌড়ে শারীরগতভাবে সাদাদের সঙ্গে কালোরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্য নয়। ভ্যাঙ্কুভার যাবার পথে লন্ডনে ওরা ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়নশিপসে অংশ নেয়। তখন ব্রিটিশরা দূরপাল্লা দৌড়ে পৃথিবীর সেরা দেশগুলোর অন্যতম। সেই দুই কিনিয়ানদের একজন চেপকোনি ছয় মাইল দৌড়ে শুরু থেকেই প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে যায়। মাইল তিনেক পর অন্যরা তাকে পেরিয়ে যায় যেহেতু সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। দাঁড়াবার কারণটা জানলে নিশ্চয় তাকে মাপ করে দেবেন। তার হাঁটুর হাড় সরে গেছল। অন্যজনের নাম মাইওরো। সে নামে তিন মাইল দৌড়ে। শুরু থেকে সেও দারুণ গতিতে দৌড়ায়, এমনই গতি যে পৃথিবীর সেরা কয়েকজন দূরপাল্লার রানার কিছুক্ষণের মধ্যেই ৫০ মিটার পিছিয়ে পড়ে। সবাই ভাবল কয়েক চক্করের পরই দম ফুরিয়ে ট্র্যাকে মুখ থুবড়ে পড়বে। কিন্তু পড়েনি। তাকে হারাতে সেদিন নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়তে হয়েছিল।
‘ভ্যাঙ্কুভারে মাইওরো চতুর্থ আর চেপকোনি সপ্তম হয়েছিল তাদের ইভেন্টে। ট্যাকটিকস বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞ থাকায় ওরা মার খায়। কিন্তু ব্যাপারটা হল ওরা সেরা পর্যায়ের দূরপাল্লা দৌড় সম্পর্কে কোনোরকম পূর্ব ধারণা ছাড়াই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় হাজির হয়েছিল। স্রেফ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়েছিল জেতার জন্য। কাদের সঙ্গে দৌড়েছিল? বিশ্বের অভিজাতদের সঙ্গে,যারা কি না বহু বছর ধরে এক্সপার্ট কোচিং নিয়ে ফিটনেসের চূড়োয় পৌঁছেছে, নিবিড় ট্রেনিং আর নিয়মিত কম্পিটিশনের সাহায্যে। যখন সবাই ট্রেনিংয়ের গোপন রহস্যটা জানার জন্য ওদের চেপে ধরল তখন অবাক করে দিয়ে তারা বলল, হপ্তায় মাত্র তিন দিন তারা দৌড়োয়, তাও মাত্র তিন থেকে পাঁচ মাইল। এর সঙ্গে তুলনা করুন, ইউরোপীয়ান আর আমেরিকান রানারদের বাধ্যতামূলক হপ্তায় একশো মাইল দৌড়ের!’
