‘আমাদের দেশেও লোকে এখন টাকা বার করছে মাল কেনার জন্য। অলিম্পিকসে সোনা তো বটেই কেউ একটা কাঁসার মেডেল পেলে এখন ভারতের লোক মন্দির বানিয়ে তার পুজো করবে। পঁচিশ লাখ আসবে না, কি বলছেন আপনি!’ হীরাভাইয়ের অবাক হওয়াটাকে রাহুলের মনে হল যেন তার পেশাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলা হল। কিন্তু তাতে সে উসকে উঠল না।
‘দেখুন, স্বর্ণকুমারীকে দারুণ দেখতে, চমৎকার দৌড়য়ও। কিন্তু পঁচিশ লাখ টাকা টেনে বার করতে পারার মতো জোর ওর নেই।’
‘যদি ম্যারাথন আর দশ হাজার মিটার, দুটো সোনা জেতে?’ সারদাচরণ নিরাবেগ মুখ নিয়ে প্রশ্নটা করলেন।
রাহুল হেসে উঠল। মাথা নেড়ে বলল, ‘অসম্ভব। এবার কিন্তু আমরা আজগুবি কথায় চলে গেছি। এরপর কী বলবেন ১০০ মিটারেও সোনা জিতবে?”
‘না, তা বলব না, তবে মি. অরোরা মেয়েদের ম্যারাথন মাত্র দুটো অলিম্পিকসে হয়েছে আর দশ হাজার হয়েছে মাত্র একবার। বলতে গেলে দুটোই নতুন। এখনও পর্যন্ত দূরপাল্লা দৌড়ে কোনো মেয়ে একই অলিম্পিকসে এই দুটোর সোনা জেতেনি।’
‘এবারে যে কেউ জিতবে না তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি? ওলিম্পিকসে একটা ইভেন্টের জন্য পূর্ব জার্মানিতে একডজন মেয়ে ট্রেনিং পাচ্ছে দশ বছর বয়স থেকে। রাশিয়ানরা, চীনারাও এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। অসম্ভব, যে দেশের অলিম্পিকস দৌড়ে মেডেল জেতার ঐতিহ্য বলে কোনো ব্যাপার নেই সে দেশে একটা মেয়ে আনবে দু—দুটো সোনা! রূপকথায় এসব হয়।’
ঠান্ডা চোখে রাহুলের দিকে তাকিয়ে সারদাচরণ কথাগুলো শুনে বললেন, ‘ঠিক আছে। এটাই যখন আপনার ধারণা তা হলে কিছুক্ষণ না হয় রূপকথার জগতেই আমরা বাস করি। মি. অরোরা আপনার সুবিজ্ঞ মতামত দিয়ে যদি একটু উপকার করেন তা হলে ধন্য মনে করব। ধরুন আজগুবিটাই সত্যি হয়ে গেল। স্বর্ণকুমারী অলিম্পিকসে গেল আর দুটো সোনাও জিতল। এক অজ্ঞাত অনামা ভারতীয় মেয়ে, আপনার কথায় যাকে দারুণ দেখতে, দুবার সে বার্সিলোনা স্টেডিয়ামে সোনা পেল, আর সেটা দেখল ইতিহাসের বৃহত্তম টিভি দর্শকরা। আপনি যদি আগাম জেনে থাকেন এইরকম একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে আর আপনি যদি সেই মেয়েটির এজেন্ট হন আর বিজয় মঞ্চ থেকে তার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচার যন্ত্রকে চালু করার বোতামটি যদি টেপার অপেক্ষায় আপনার আঙুলের সামনে থাকে, তা হলে বাণিজ্যের দিন থেকে কত টাকা আপনি তুলতে পারবেন বলে আশা করেন?’
রাহুল কাঁধ ঝাঁকাল। ‘তা, মোটামুটি ভালোই হবে। তবে ডা. সরকার আমি দিবাস্বপ্ন নিয়ে বাণিজ্য করি না।’
‘পঁচিশ লাখ? পঞ্চাশ?’
‘হতে পারে। দেখুন, ম্যারাথন আর দশ হাজার মিটার দৌড়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান মাত্র সাত দিন। বিশ্ব পর্যায়ের মেয়েদের সঙ্গে ৪২ কিলোমিটার আর ১০ কিলোমিটার, দুটো এতবড়ো দৌড় টানার ধকল কোনো মেয়ের পক্ষে সওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া ড্রাগ টেস্টও আছে।’
‘ড্রাগের কথা তো আমরা বলিনি!’ সারদাচরণ আহত স্বরে বললেন, ‘আমরা যে প্রস্তাব দিচ্ছি তাতে কারচুপির কোনো ব্যাপারই নেই। আপনার কাছে এ সবই নতুন ব্যাপার কিন্তু আমরা এটা নিয়ে দু—বছর কী তার বেশিই হবে, দিন কাটাচ্ছি। এই প্রোজেক্টের কাজকর্ম, এর সাফল্যের সম্ভাবনা বুঝে উঠতে আপনার কিছুটা সময় লাগবে। তাই আমি বলছি আজকের মতো আলোচনাটা মুলতুবি রেখে রবিবার আবার বসা যাক।’
‘সেই ভালো। আলোচনায় আমি বসব কেননা অর্জুনের ডাক পেয়েই এসেছি। এত দিনের বন্ধুর মনে দুঃখ দেওয়া ঠিক হবে না ভেবেই বসব। তবে যত টাকা পাবেন বলে আশা করছেন সেই বিষয়ে আগাম একটা কথা বলে নিই। যে ভাবেই হোক ব্যাপারটা আপনারা হয়তো করে ফেললেন আর মেয়েটিও দুটো সোনা জিতে গেল, তাতেই যে পঁচিশ বা পঞ্চাশ লাখ আপনারা পাবেনই তার কোনো গ্যারান্টি নেই। মনে রাখবেন, আমরা কারবার করছি একজন মানুষ নিয়ে, বাজারে বেচার সাবান বা টুথপেস্ট নিয়ে নয়। কত আদায় হবে সেটা নির্ভর করছে, মেয়েটির নিজের উপর। তার পার্সোনালিটি, তার চেহারা, স্বভাব—চরিত্র, তার কথাবার্তার ধরন—ধারণ এই সবই তখন বিচার্য বিষয় হবে। আপনারা জানেন কি সোল অলিম্পিকসের পর ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ জয়নার কত টাকার কনট্র্যাক্ট পেয়েছিল?’
রাহুল প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হল এরা সবাই সেটা জানে কিন্তু তার মুখ থেকে শোনার জন্য চুপ করে আছে। বেশ, তা হলে আবার জানুক। ‘অলিম্পিকসে মিডিয়া ওর ডাক নাম দিয়েছিল ‘ফ্লো জো’ কিন্তু দু মাসের মধ্যে সেটা বদলিয়ে নাম রাখল ‘ক্যাশ ফ্লো’। বড়ো বড়ো কর্পোরেট বিজ্ঞাপনদাতারা সোল গেমসের পর অলিম্পিয়ানদের সম্পর্কে খুব বেশি উৎসাহ দেখায়নি। তার কারণ টিভি দর্শকদের রেটিং যা আশা করা হয়েছিল তার থেকেও অনেক কম হয়, দর্শকদের নিস্পৃহতাই এই রেটিং থেকে প্রকাশ পায়, তা ছাড়া ড্রাগের ঘটনায়ও গেমসে কলঙ্ক লেগেছিল। এই দুটি কারণে তারা আগ্রহ বোধ করেনি। কিন্তু ফ্লোরেন্স তিনটে সোনা, একটা রূপোর সঙ্গে এনডোর্সমেন্ট আয়ের মেডেলটা জিতে নেয়। সোল গেমসের আগে বক্তা হিসাবে ওর হাজির থাকার কী ছিল দশ হাজার ডলার, গেমসের পর হয় ২৫ হজার ডলার।’
‘এখন এক ডলারে কত টাকা?’ হীরাভাই ফিসফিস স্বরে বলল।
‘প্রায় ষোলো টাকা।’ রাধিকা বলল।
