‘এসব ব্যাপারে তখন আমরা চিন্তা করিনি। আর পাঁচটা স্কুলে যাবার বয়সি মেয়েদের মতোই সে পার্কসার্কাসে নাসিরুদ্দীন রোডের বাড়িতে বড়ো হয়ে ওঠে।”
রাহুল ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘স্কুলেই কি ওর স্পোর্টসের ক্ষমতাটা জাহির হয়ে যায়নি। ফিল্মে তো আপনি বললেন ও জীবনে কখনো মেয়েদের সঙ্গে কমপিট করেনি।’
‘ঠিকই। যদি ভালোভাবে আমার কথা শুনে থাকেন, আমি বলেছি ওর স্কুলে যাবার বয়সের কথা, স্কুলে গেছে এমন কথা বলিনি। আমার বোন ওকে বাড়িতেই পড়াত, এ জন্য প্রাইভেট টিউটরও ছিল।’
‘কেন?’
‘এটা আমরাই ইচ্ছাতে হয়েছে। ওর মানসিক, শারীরিক বিকাশের জন্য সম্ভাব্য সবরকম সুযোগ যাতে পায়, সেজন্যই স্কুলে দিইনি। পুষ্টি সম্পর্কে, ব্যায়াম সম্পর্কে আমার নিজস্ব যে চিন্তা সেটা থেকে পুরোপুরি উপকার পাওয়া সোনালির পক্ষে সম্ভব হত না যদি ও স্কুলে ভরতি হত। বাড়িতে আমরা ওর সুষম খাদ্যের দিকে বা দেহের ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ আর খেলাধুলার দিকে নজর দিতে পারব। শরীরের দিক থেকে ও যা পেয়েছে সেটা তো প্রকৃতিরই দান। যাদের এমন খেলোয়াড়ি শরীর তাদের এমন এক ধরনের শিক্ষা দরকার বা চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করায়, দাবি জানায়। ওর বয়সি বাচ্চচাদের স্কুলে যে শরীর শিক্ষা দেওয়া হয় সেটা একদমই বাজে। ফলে একঘেঁয়ে বিরক্তি বোধ করত আর বাড়তি ওজন শরীরে জমত।’
সারদাচরণের যুক্তি শুনতে শুনতে রাহুলের মাথা গরম হয়ে উঠছিল। নিজেকে যথাসাধ্য সংযত রেখে সে বলল, ‘ওর সামাজিক উন্নতি ঘটাবার কথাটা কি ভেবেছিলেন?’
‘নিশ্চয়। ছ—বছর বয়সে ওকে নাচের স্কুলে ভরতি করানো হয়, রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতারের ক্লাবে গিয়ে সাঁতারও কাটত। দু—জায়গাতেই ওর বন্ধু সংখ্যা কম ছিল না। ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত সোনালি এইভাবেই বড়ো হয়ে ওঠে। ছোটো থেকেই ওকে পার্কসার্কাস ময়দানে দৌড় করাতাম। ওর অগ্রগতির হিসাব রাখতাম। ষোলো বছরে ওকে রেস কোর্সে নিয়ে গিয়ে ট্রায়াল নিলাম আর তাই থেকে একটা জিনিস বুঝলাম, ঠিকমতো ট্রেনিং ব্যবস্থা করলে আর প্রথম শ্রেণির কোচের উপদেশ পেলে সোনালি অলিম্পিকসে যাবার মতো পর্যায় দু—তিন বছরের মধ্যেই পৌঁছবে। এমনকী সোনার মেডেলও জিততে পারে। যদি বলি এই প্রথমবার আমার মনে ওর অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হবার সম্ভাবনার কথাটা জাগল, তাহলে মিথ্যে বলা হবে। এই চিন্তাটা বহু বছর আগেই মাথার মধ্যে ডিম পেড়েছিল। কিন্তু সেটা ফুটিয়ে বাচ্চচা বার হতে দিইনি অর্থাৎ আমার আকাঙ্ক্ষার বোঝা বাচ্চচার কচি কাঁধের উপর চাপিয়ে দিতে চাইনি। তবে কোনো শিশু কৈশোরে পৌঁছে যদি বিরাট ট্যালেন্ট প্রকাশ করে বা বড়ো কিছু করার সম্ভাবনা দেখায় তাহলে আমার মনে হয়, অভিভাবকদের এটা নৈতিক কর্তব্য সেই ট্যালেন্টকে লালন করার, বাড়িয়ে তোলার জন্য তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করা। পৃথিবীতে খেলার ইতিহাসে এইরকম বাবা—মায়ের কথা প্রচুর পাওয়া যাবে। যথাযোগ্য উৎসাহ পেলে ট্যালেন্টেড ছেলেমেয়েরা পৃথিবীর সেরাদের হারাতে পারে।’
‘আর কমপক্ষে লাখ পঁচিশ টাকা তো ব্যাঙ্কে আসতে পারেই।’ হীরাভাই আন্দাজে একটা হিসাব দিয়ে ফেলল।
‘রানার হিসাবে সোনালির সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা আমার করা উচিত আর সে জন্য যা যা প্রয়োজন বিশেষ করে কোচ, জিমন্যাসিয়াম, দূরপাল্লা দৌড়ের জন্য উপযুক্ত রাস্তা, এগুলো যাতে সে পায় তার ব্যবস্থাও করা দরকার। এসবের জন্য টাকা লাগে কিন্তু আমার অত টাকা নেই।’
‘আর সেই টাকার ব্যবস্থা করতে ওনার সঙ্গে আমাদের যোগ দেওয়া।’ অর্জুন জানিয়ে দিল রাহুলকে।
‘হ্যাঁ, ব্যাপারটা সেইরকমই।’ সারদাচরণ হাসলেন। রাহুলকে লক্ষ্য করেই বললেন, ‘স্পনসর করার মতো লোকেদের কাছে টাকার জন্য যাব ভেবে প্রথমে অর্জুনবাবুর কাছেই ব্যাপারটা বলি। উনি তো শোনামাত্রই উৎসাহিত হলেন। আমার এই প্রোজেক্টকে একটা বাণিজ্যিক প্রস্তাবের রূপ দিয়ে কয়েকজন চেনালোকের কাছে কথা পাড়ি। কিছু টাকা যদি ফিরে পাবার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে লোককে টাকা ইনভেস্ট করার জন্য তো বলা যায় না। হীরাভাইবাবু তাদের মধ্যে একজন যিনি টাকা দিয়েছেন সোনালিকে সামনের ওলিম্পিকসে স্বর্ণকুমারী হয়ে ওঠার কাজে মদত দিতে। এ পর্যন্ত চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। মোট খরচ ধরা হয়েছে, পাঁচ লাখের কিছু বেশি।’
রাহুল মুখ তুলে সিলিংয়ের দিকে তাকাল।
‘আমরা পঁচিশ লাখ কমপক্ষে আশা করছি, তাহলে সুদসমেত ইনভেস্টমেন্টের টাকাটা ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। আর সেই জন্যই আপনাকে আমাদের দরকার।’
চারজোড়া চোখের দৃষ্টি রাহুলের মুখে বিঁধে গেল। শুকনো হেসে সে বলল, ‘পঁচিশ লাখ!’
‘আপনি কার্ল লিউইস বা রেটন বা ফ্লোরেন্স জয়নার কত টাকা কামিয়েছে তা নিশ্চয় জানেন? মার্ক স্পিৎজের কথা ভাবুন!’ হীরাভাই নামগুলো উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিল সে এই ব্যাপারে খেলো নয়, খবর রাখে।
‘ওরা প্রত্যেকে আমেরিকান। সে দেশে টাকা ফেলে জিনিস কেনার লোকের সংখ্যা বিরাট আর তাদের কাছে ওরা কিছুদিনের জন্য দেবদেবী পর্যায়ে উঠে গেছিল, মিডিয়াই উঠিয়ে দিয়েছিল। আর ওদের সাফল্যের বহরটাও মনে রাখবেন। কেউ তিনটে, কেউ চারটে, কেউ সাতটা সোনা, তার সঙ্গে অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড!’
