‘রাতে আমার বোন সুরুচি হঠাৎ বলল, তার মায়া হচ্ছে বাচ্চচাটার জন্য, বাচ্চচাটাকে তার খুব ভালো লেগেছে, সে অ্যাডপ্ট করবে। পার্ক সার্কাসে সে একা ফ্ল্যাটভাড়া নিয়ে থাকে। ভালো বেতন পায়। ওর পক্ষে কোনো অসুবিধেই হবে না। নানাদিক থেকে ব্যাপারটা নিয়ে আমরা দুজনে অনেকক্ষণ আলোচনা করি। আমাদের প্রস্তাব শুনে ব্রিগেডিয়ার তো খুব খুশি। পরদিন সকালেই আমরা আবার কার্শিয়াং গেলাম। কর্নেল বুড়ো তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সিন্ধুবাদের নাবিকের মতো বাচ্চচাটা তার ঘাড়ে চেপে বসেছিল। আমি বাচ্চচাটার বাবা—মায়ের কথা জানতে চাইলাম। কর্নেল পার্কস তখন ডেনিস ম্যাকব্রাইটের কাছ থেকে যা যা শুনেছিলেন তাই জানালেন আর সেটাই একটু আগে আমি আপনাদের বলেছি।
‘মায়াকাং চা—বাগান থেকে কার্শিয়াং—এ আসে একটা সুটকেশ নিয়ে। সে মারা যাবার পর কর্নেল সেটা খুলে তার মধ্য থেকে পান দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের এক ব্রিটিশ স্যাপার ইউনিটের নম্বর লেখা মেটাল রিস্টব্যান্ড, ছুটি মঞ্জুরের একটি চিঠি তাতে প্রাপকের নাম রয়েছে: সার্জেন্ট জে বি স্টিভেনসন। কয়েক ছড়া পাথরের মালা যা আপাতানি মেয়েরা ব্যবহার করে। এগুলো তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। আর মায়াকং—এর নিজস্ব বলতে ছিল কয়েকটি সাদাকোলো ফোটো। বলাবাহুল্য সেগুলো ভিঙ্কলারের তোলা। একটি ছিল গ্রুপ ফোটো, তাতে ম্যাকব্রাইট দম্পতি ও মায়াকাং দাঁড়িয়ে বাংলোর সামনে। তিন—চারিটি ছিল শুধুই মায়াকাং—এর, নানাভাবে পোজ দিয়ে লাজুক মুখ থেকে বোঝা যায় ফোটোগুলি ঠিক প্রকাশ্যে নয়, কারোর অনুরোধে, নির্দেশে একটু আড়ালেই তোলা। কয়েক বছর খামের মধ্যে অযত্নে পড়ে থাকায় ছবিগুলো হলুদ হয়ে গেছে। তবু বোঝা যায় কি অপরূপ সুন্দরী ছিল। মুখটা গোল, নাক চোখা, জোড়া ভ্রূ, বেশ বোঝা যায় ইংরেজ রক্ত আর শারীরিক প্রভাব এর উপজাতীয় হেরেডিটিকে বদলে দিয়েছে। গ্রুপ ফোটোয় মায়াকাং—এর পাশে দাঁড়ানো মিসেস ম্যাকব্রাইটকে খাটো দেখালো। কর্নেল আমাকে বলেন, মায়াকাং অন্তত পাঁচ ফুট ছয় বা সাত ইঞ্চি লম্বা ছিল। কিন্তু সবথেকে আকর্ষণীয় এবং মূল্যবান, অন্তত আমার কাছে, হান্স গুন্টার ভিঙ্কলারের ছবিটা। ম্যাকব্রাইটের পাশে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে। কার তোলা বলতে পারব না, হয়তো মিসেস ম্যাকব্রাইটের।
‘অন্তত সাড়ে ছ—ফুট লম্বা, উঁচু প্রশস্ত কপাল। পাতলা ভ্রূ, মেয়েদের নজরে পড়ার মতো মুখশ্রী, আর পাথরে কোঁদা শরীর। টোকিও অলিম্পিকসের পর প্রতিযোগিতামূলক রোয়িং—এ আর অংশ নেয়নি কিন্তু অভ্যাসটা যে ছাড়েনি সাত বছর পর ওর শরীর দেখে সেটা বোঝা যায়। মায়াকাংকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। ভিঙ্কলারের দেহের কাঠিন্যের মধ্যে একধরনের আকর্ষণ ছবির মধ্য দিয়েও অনুভব করা যায়।’
‘তাহলে আমাদের এই মেয়েটির নাম স্বর্ণকুমারী ভিঙ্কলার আর মায়ের নাম মায়াকাং স্টিভেনসন!’ হীরাভাই উৎসাহ নিয়ে সোফার কিনারে টেনে আনল তার নিতম্ব। ‘ইংরেজ ও অস্ট্রিয়ান রক্তের সঙ্গে এখনকার অরুণাচলের উপজাতীয় রক্ত মিশে তৈরি হয়েছে এই মেয়ে।’
‘সোলজার আর অলিম্পিক বোয়ার, এমন দুটি লোকের শরীরের খাটবার আর সহ্য করার ক্ষমতার ভাগও পেয়েছে!’ অর্জুন বলল।
সারদাচরণ এইসব কথা যেন শুনতেই পাননি, এমন ভাব মুখে ফুটিয়ে বলে চললেন, ‘বাচ্চচাটির আর তার মায়ের জন্মবৃত্তান্ত, যে সব ঘটনার যোগাযোগের মধ্য দিয়ে এই বাচ্চচা মেয়ের জেনেটিক প্রোফাইল গড়ে উঠেছে তা জানার যদি না আমি ওর সম্পর্কে আগ্রহী হইল তাহলে আমি একজন বাজে ফিজিয়োলজিস্ট হিসাবে গণ্য হব। ওকে দেখেই জেনে যাই চমকপ্রদ দেহ উত্তরাধিকারসূত্রে মেয়েটি পেয়েছে। বাচ্চচাদের দৈহিক পরিণতি লাভের ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার অস্থিকাঠামোর বয়স ধরে, তাতে আমার মনে হয়েছিল তারিখধরা বয়সের থেকে এই শিশু অন্তত চার—পাঁচ মাস এগিয়ে। এটা চার বছরের কমবয়সিদের পক্ষে খুব তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য। ওর পেশির গড়নও ছিল চমৎকার। চার দিন পর বাচ্চচাটিকে নিয়ে আমরা কলকাতায় ফিরে আসি।’
সারদাপ্রসাদ তীক্ষ্ন চোখে শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে তার এই বৃত্তান্তের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে লাগলেন। রাহুলের মনে হল, বাচ্চচাটিকে সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যটা যেন ওনার রিসার্চেরই একটা অঙ্গ। হয়তো সে লোকটি সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছে কিন্তু এখন পর্যন্ত উনি পালিত কন্যা সম্পর্কে যে ভাবে বললেন তাতে পিতৃসুলভ ভাবের থেকে বিজ্ঞানীর মনই যেন বেশি প্রকাশ পেয়েছে।
‘আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, আমি কিন্তু এখনও শিশুটির নাম উল্লেখ করিনি।’ সারদাচরণ চোখ রাখলেন রাহুলের উপর। ‘একটা মেয়ের পক্ষে নামটা অস্বাভাবিকই: আলি। আমি বা আমার বোন নামটা পছন্দ করিনি। কর্নেল জানিয়েছিলেন এটা ওর মায়েরই দেওয়া। কেন যে এমন একটা মুসলমানি নাম রাখল তা বলতে পারব না। নামটা পালটাব ঠিক করলাম কিন্তু তখুনি নয়। আগে সে আমাদের সঙ্গে সড়গড় হোক তারপর বদলাব। এক বছর পর, অ আ ক খ শেখার আগে, নামটাকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে সোনালি বলে ডাকতে লাগলাম। দেখলাম এটা ওর মনে ধরেছে।’
‘আমারও খুব ভালো লাগছে।’ হীরাভাই দু—হাত তুলে জানাল। ‘কানে দারুণ লাগছে—কাগজে, ম্যাগাজিনে, টিভি—তে শুধু স্বর্ণকুমারী সোনালি। হিট, সিওর হিট!’
