‘তিনসুকিয়া থেকে ডিব্রুগড়, এখানেই সেই সাহেব মেয়েটিকে ফেলে রেখে, ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাওয়ার মতোই ওখানকার ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। তারপর সে যে কোথায় গেল তার হদিশ আর পাওয়া যায়নি। সেই মেয়েটি, যার নাম আমি জানতে পারিনি, তারপর লেডোয় কয়লার খনিতে মজুরের কাজ পায় আর যথাসময়ে একটি মেয়ের জন্ম দেয়। নবজাতকের নাম রাখে মায়াকাং। মেয়েটির মার সঙ্গে সেখানে আলাপ হয় এক খাসি যুবকের। দুজনে স্বামী—স্ত্রীর মতো বাস করতে থাকে। তারপর তারা চলে আসে ডুয়ার্সের এক চা—বাগানে। মায়াকাং যখন সতেরো বছরের তখন ওর মা মারা যায় রোগে ভুগে, সম্ভবত, টাইফয়েডে। মায়াকাং সুন্দরী ছিল। তার মাতৃকুল আপাতানি। এই উপজাতিদের সৌন্দর্যের জন্য খ্যাতি আছে। ওর পিতৃকুল ইংরাজ মায়াকাং—এর চোখের রং ছিল কটা, পিঙ্গল।
‘এরপর মায়াকাং আয়ার কাজ নেয়ে নোবান চা—বাগানের ম্যানেজারের কোয়ার্টারে। সাহেব ম্যানেজার ডেনিস ম্যাকব্রাইট তার বউ আর দুটি বাচ্চচা। চা—বাগানটা বিক্রির কথাবার্তা চলছে, ভালোরিয়ারা সেটা কিনতে চায়। ব্রিটিশ চা কোম্পানিগুলো তাদের বাগান ভারতীয়দের কাছে বিক্রি করে চলে গেলেও, দু—চারটে বাগান অনেক দিন পর্যন্ত তারা রেখে দিয়েছিল, এই নোবান তাদের মধ্যে একটি। ডেনিস ম্যাকব্রাইটের বাংলোয় মায়াকাং আট—ন বছর কাটায়। এর মধ্যে তার বিয়ে হয় কিন্তু কয়েক মাস পরই বিধবা হয়ে তার পুরোনো কাজে ফিরে আসে। অবশ্য ডেনিসের ছেলেদুটি ততদিনে বড়ো হয়ে উত্তর ইংল্যান্ডে লীডসে তাদের ঠাকুমার কাছে চলে গেছে স্কুলে পড়ার জন্য।
‘বাংলাদেশ যুদ্ধ যখন শুরু হল তখন চা—বাগান অঞ্চল দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ঢোকার জন্য বিদেশি সাংবাদিকদের আনাগোনা শুরু হল। ম্যাকব্রাইটের কলকাতার এক বন্ধুর চিঠি নিয়ে হাজির হল এক অস্ট্রিয়ান ফোটোগ্রাফার। ডেনিস তাকে খাতির করে বাংলোয় রাখল। লোকটির নাম হান্স গুন্টার ভিঙ্কলার, বছর বত্রিশ বয়স। ১৯৬৪ টোকিও অলিম্পিকসে জার্মান রোয়িং টিমে ছিল, একটা ব্রোঞ্জ মেডেলেও পায়। ডেনিসের বাংলোকে ঘাঁটি করে সে ছবি তুলতে যেত। দু—চার দিন পর ফিরে এসে ফিল্ম ডেভেলপ, প্রিন্ট করে ডেনিসের সাহায্যে কলকাতায় পাঠাত। দিন পনেরো থেকে ভিঙ্কলার চলে যায় আর তার দু—মাস পর ডেনিসকে তার বউ জানায় মায়াকাং গর্ভবতী।’
সারদাচরণ কথা বলা থামলেন। শ্রোতাদের মুখে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখবেন আশা করে ভ্রূ তুলে রইলেন।
‘কাজটা ভিঙ্কলারের?’ হীরাভাই বলল।
‘তা না হলে আবার কার?’ অর্জুন মৃদু ধমক দিল।
‘কেন ডেনিসই কি কাজটা করতে পারে না?’ হীরাভাই তর্ক শুরুর পথ দেখতে পেরে পা বাড়াল।
‘কাজটা ভিঙ্কলারেরই।’ সারদাচরণ দুজনকেই থামিয়ে দিলেন। ‘মায়াকাংয়ের স্বীকারোক্তি থেকে এটা জানা যায়। এদিকে চা—বাগান বিক্রির কথা তখন পাকা হয়ে গেছে। ম্যাকব্রাইটরা ইংল্যান্ডে ফিরে যাবে। মায়াকাংকে নিয়ে তারা পড়লেন মুশকিলে। অবশেষে তাদের খুব পরিচিত এক রিটায়ার্ড ইংরেজ কর্নেল, বিপত্নীক, বৃদ্ধ গ্রেহাম পার্কসের কাছে তার থাকার ব্যবস্থা করলেন কার্শিয়াংয়ে। আর্মি থেকে রিটায়ার করে পার্কস সেখানে একটা বাংলো বানিয়ে রয়েছেন প্রায় বাইশ বছর। দেশে আর ফিরবেনই না ঠিক করেছেন। ওর স্ত্রী মারা গেছেন ১০৭০—এ। দেখাশোনা করার লোক দরকার ছিল।
‘কার্শিয়াংয়ে মায়াকাংয়ের একটি মেয়ে হল। আর মেয়েটিকে প্রসব করতে গিয়ে সে মারা গেল। বৃদ্ধ কর্নেল পড়লেন মুশকিলে। কে সেই বাচ্চচার লালনপালন করবে? ওখানকার এক নেপালি পরিবারে বাচ্চচাটিকে রাখলেন, সেজন্য টাকাও দিতেন। কিন্তু বছর দুই পর তারা বাচ্চচাটাকে ফিরিয়ে দেয়, কেননা তাদের সংসারে নানান বিপর্যয়ে, ঝগড়াঝাঁটিতে ভাঙন ধরায় হাঁড়ি আলাদা হয়ে গেছে। কেউই বাচ্চচাটাকে রাখতে রাজি নয়। পার্কস তখন চিঠি লিখতে শুরু করলেন নানান অনাথ আশ্রমে। অধিকাংশ চিঠিরই উত্তর এল না। শুধু দুটি অর্ফ্যানেজ অক্ষমতা জানিয়ে বলে তিন বছরের বাচ্চচাকে নিতে তারা অক্ষম।
‘সেই সময় আমি আর আমার বোন সুরুচি দার্জিলিং বেড়াতে যাই। সুরুচি বিয়ে করেনি, লা মার্টিনিয়ারের টিচার। দার্জিলিংয়ে আমরা এক আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলাম। তিনিও রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ার। আমরা একদিন জিপে কার্শিয়াং বেড়াতে যাই। আমার আত্মীয় বললেন, চলো একবার কর্নেলের সঙ্গে দেখা করে যাই। কার্টসি কল! আমরা আর বাংলোয় ঢুকলাম না, জিপ থেকে নেমে পায়ের আড়ষ্ঠতা কাটাতে হাটাচলা করতে লাগলাম। সেই সময় সুরুচি হঠাৎ বলে উঠল, ‘দাদা কী বিউটিফুল দেখো!’ কর্নেলের বাংলোর বাগানে একটা বছর পাঁচেক বাচ্চচা মেয়ে, পরনে লাল গেঞ্জি আর জাঙ্গিয়া, দুটোই ময়লা, হাতে মুখে মাটি, অপরিচ্ছন্ন চুল, একটা গাঁদা গাছের আড়াল থেকে আমাদের লক্ষ করছে, দু—চোখে কৌতূহল। সুরুচি হাতছানি দিয়ে ডাকতেই একটু ইতস্তত করে পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। ওর নাম জিজ্ঞাসা করায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলাম ভাষা বুঝতে পারছে না।
‘বাংলোর ভিতর থেকে তখন কর্নেল আর ব্রিগেডিয়ার বেরিয়ে আসছেন। সেই বাচ্চচাটিকে দেখিয়ে ব্রিগেডিয়ার বললেন, ‘এর কোনো ব্যবস্থা করতে পারলেন।’ কর্নেল বিষণ্ণমুখে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না’। আমার এখন থেকে একে নিয়েই চিন্তা। কত জায়গায় লিখলাম, কত লোককে বললাম যদি অ্যাডপ্ট করে!’ ফিরে আসার সময় ব্রিগেডিয়ার, বাচ্চচাটি সম্পর্কে যতটুকু জানতেন আমাদের বললেন। শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম ওর বয়স কত? উনি বললেন তিন। চমকে উঠলাম, তিন! আমি তো ভেবেছিলাম পাঁচ। তখন আমি মানুষের শরীরের উপর হেরেডিটির অর্থাৎ বংশ পরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যের উপর একটা রিসার্চ প্রোজেক্টে নিযুক্ত ছিলাম। বাচ্চচাটির বয়সও শরীরের অনুপাতের মধ্যে, গড়পড়তা ভারতীয় বাচ্চচার যেরকম গঠন হয়, সেইরকম, গঠন ছিল না। বললাম ওকে আর একবার দেখব, ওর বাবা—মা সম্পর্কেও যতটা পারা যায় জানব।
