অলু প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই অনন্ত তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। ছলছল করছে ওর চোখ।
‘অনেক কথা বলেছি, মাপ করে দিয়ো।’
‘আরে ও কিছু নয়, কিছু নয়।…ওরকম হয়ই…ভালো করে সংসার কর, সুখে থাক…’
অনন্তর গলা ধরে গেল। সে বোকার মতো হাসল সকলের দিকে তাকিয়ে। শান্তনু প্রণাম করল।
ঝোলা থেকে সন্দেশের বাক্স বার করে অরুণ এগিয়ে ধরল।
‘এবার মিষ্টি মুখ…এই নিয়ে এগারোটা বিয়ের সাক্ষী হলুম, এখানেই দু—বার হল। দেখছি প্রফেশনাল উইটনেস হয়ে যাচ্ছি…এবার থেকে ফী নিতে হবে।’
পরিবেশটা হালকা হয়ে গেল। কিন্তু অলু কখন যে তার হাত ব্যাগ থেকে টাকা বার করে রেজিস্ট্রারের টেবলে রেখেছে, অনন্ত বুঝতে পারেনি। তার পকেটে তিরিশ টাকার বেশি নেই। বেরোবার সময়ও সে ভাবেনি রেজিস্ট্রারকে টাকা দিতে হবে। অন্যরা নিশ্চয় লক্ষ করেছে মেয়ের দাদা টাকা বার করল না। অলু কি আশা করেছিল, এই খরচটা দাদা দেবে?
সে অপ্রতিভ বোধ করল অন্তত এই টাকাটা তারই দেওয়া উচিত ছিল। কিছুই তো সে অলুকে দেয়নি, শাড়ি পর্যন্ত নয়। বিয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে অলুই খরচ করেছে। জেদি মেয়ে।
অনন্ত বিমর্ষ বোধ করেছিল রাস্তায় বেরিয়ে। তার মনে হচ্ছে কী যেন একটা সে হারাচ্ছে। একসময় বাবা, মা, সে, তিন ভাইবোনে পরিবারটা ভরা ছিল। একে একে লোক কমে যাচ্ছে। এখন তো সে আর মা। যখন প্রচণ্ড অর্থাভাব তখন এতটা নিঃসঙ্গ বোধ হয়নি। কী করে পরের দিনটায় খাওয়া জুটবে সেই ভাবনাটা তাকে ব্যস্ত রাখত। ধীরে ধীরে ভাবনাটা মেঘগর্জনের মতো আকাশে গড়িয়ে গড়িয়ে দূরে মিলিয়ে গেছে। এখন অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য।
‘আমি যাই এখন।’
‘সে কী, আমরা যে এখন কোথাও বসে খাব ঠিক করেছি, আপনিও থাকবেন আমাদের সঙ্গে।’
‘না ভাই,’ শান্তনুর কাঁধে হাত রাখল অনন্ত। ‘অলু জানে আমি ভাত খেয়েই এসেছি। তা ছাড়া অম্বলটা আবার একটু বেড়েছে, বাইরের খাবার খাব না।’
‘কিন্তু আমরা যে…’
‘তাতে কী হয়েছে। অলু এদের নেমন্তন্ন কর, রোববার আসতে বল।’
অলু দু—জনের উদ্দেশে বলল, শুনলে তো অরুণ, রোববার নিশ্চয় আসবে!’
‘নিশ্চয় নিশ্চয়, খাওয়ার ব্যাপারে ফেল করি না।’
অলু জানিয়ে রাখল সে অফিসের দু—তিনজনকেও বলবে।
বাসে রড ধরে দাঁড়িয়ে আসার সময় অনন্তের মনে হল, বোধহয় এরা সুখীই হবে। ভালোবাসার কিছুই তো সে জানে না। অলু এখন বাপের বাড়িতেই থাকবে যতদিন না কোথাও ঘর পায়।
বাপের বাড়ি। অনন্ত অবাক হয়ে ভাবল, অলুর বা অলুদের বাড়ি আর নয়, আজ থেকে তাদের বাড়ি ওর বাপের বাড়ি। মেয়েটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এই সংসার থেকে। অবশ্য হতই।
অসম্ভব শ্রান্তি নিয়ে অনন্ত বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়ল। আজ সে কাজেই যাবে না। এই বছরের প্রথম কামাই, গত বছরে একদিনও নেই, তার আগের বছর ইনফ্লুয়েঞ্জায় দশ দিন।
শীলা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছে তক্তাপোশের পাশে দাঁড়িয়ে। অনন্ত কপালের উপর হাত রেখে চোখ বুজে।
‘শুধু একজন, বন্ধু!’
‘আবার ক—জন আসবে? একি টোপর পরে বিয়ে যে সঙ্গে পঞ্চাশ—একশো বরযাত্রী আসবে।’
‘দুটো মালা কিনে নিয়ে গেলি না কেন?’
অনন্ত উত্তর দিল না।
‘মন্তর পড়েছিল?’
‘না।’
‘তা হলে! এসব বিয়ে কি শুদ্ধ?’
অনন্ত চুপ।
‘ও কখন ফিরবে কিছু বলেছে?’
কোনো উত্তর নেই।
‘অলু কী করল, শুধু সই?’
‘হ্যাঁ।’
‘সিঁদুরটা শান্তনুই দিল তো?’
জবাব না পেয়ে শীলা আধ মিনিট চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কপাল থেকে হাত নামিয়ে অনন্ত তীব্র চাহনিতে তাকাল।
‘এবার শুধু আমরা দু—জন এই সংসারে।’
শীলা অপ্রত্যাশিত এই কথাটার কোনো তাৎপর্য খুঁজে পেল না। শুধু বলল, ‘ফাঁকা ফাঁকা লাগবে এরপর।’ কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে যোগ করল, ‘এবার তুই বিয়ে কর।’
‘কেন?’
‘ছেলেপুলে না থাকলে কি ঘর মানায়! বংশরক্ষা করতে হবে তো।’
‘অমর আছে।’
‘থাকলেই বা, পুরুষমানুষের বিয়ে না করলে কি চলে? এবার আমি মেয়ে দেখব।’
‘না।’
‘তুই নিজে পছন্দ করে বিয়ে করবি।’
‘না।’
‘তা হলে?’
অনন্ত চোখ বন্ধ করে হাতটা আবার কপালে রাখল।
‘আর টানতে পারব না, আর ভালো লাগে না, আমি এবার জিরোব।’
‘তা জিরো, এত বছর ধরে কম পরিশ্রম করেছিস, তাই তো সবাই বলে…’
ছিলেছেঁড়া ধনুকের মতো অনন্তের দুটো হাত ছিটকে গেল দু—ধারে। চিত হয়ে শোয়া শরীরটা এক ঝাঁকুনিতে উঠে বসল। মুঠো করা দুই হাত তুলে চিৎকার করে উঠল, ‘সবাই বলে আমি ভালো ছেলে, ভালো ছেলে, ভালো ছেলে…সবাই খুশি তো? কথা দিচ্ছি আমি ভালো ছেলেই থাকব।’
ধীরে ধীরে সে আবার শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকা তার দুই চোখের কোল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল ঝরে পড়ল।
নয়
পাঁচ বছর পর অনন্ত বিয়ে করল।
শীলার ক্যানসার ধরা পড়া, দিল্লি থেকে অমরের আসা এবং শীলাকে নিয়ে যাওয়ার ছ—মাস পরেই সে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। বয়ানটা কেমন হবে তাই নিয়ে সে দিন চারেক চিন্তার মধ্যে কাটায়। পাত্রী চাই কলমের থেকে শব্দ বাছাই করে প্রথমে সে বিজ্ঞাপনের খসড়া করেছিল: দঃ রাঢ়ী কায়স্থ (৩৫), স্বাস্থ্যবান, একা, মাঃ আয় ১০০০। গৃহকর্মনিপুণা রুচিশীল নম্র পাত্রী চাই। অন্য জাত বা বিধবাতেও আপত্তি নাই।
দুটো মিথ্যা কথা সে লেখে। বয়সটা প্রায় চারবছর কমিয়েছে, মাসিক আয় বাড়িয়েছে প্রায় দেড়শো টাকা। তারপর আয়নার সামনে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ নিজেকে খুঁটিয়ে দেখেছিল। পঁয়ত্রিশ বছরের মতো তাকে মনে হয় কি?
