ডা. সরকার কথা বলার সাময়িক বিরতি দিলেন। মাথা নীচু করে বক্তব্য গুছিয়ে নিয়ে দুবার গলাখাঁকরি দিয়ে বসে চললেন ‘আমার সম্পর্কে এই পরিকল্পনার বা প্রোজেক্টের সঙ্গে আমার জড়িত থাকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনাদের জানানো উচিত বলে আমি মনে করি। আমার পুরো নাম সারদাচরণ সরকার। আমার জন্ম কলকাতায়, ১৯৩৫ সালে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম বি বি এস আর হামবুর্গ থেকে পিএইচ. ডি করেছি। স্পেশালাইজ করি ফিজিওলজিতে। ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ফিজিক্যাল এডুকেশনের ফেলো, চণ্ডীগড় ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান সায়েন্সে অধ্যাপক ছিলাম ১৯৮৫ পর্যন্ত। আমার কাজের ক্ষেত্রে সর্বশেষ যা কিছু ঘটেছে তার সঙ্গে পরিচিত থাকার চেষ্টা করি। আপাতত বর্ধমানে থাকি। আমার মনে হয় আপনারাও নিজেদের যৎসামান্য পরিচয় যদি অন্যদের জানিয়ে দেন তা হলে সুবিধা হয় কথাবার্তা বলায়। মি. প্যাটেল আপনার সাবান তো লোকের ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হয়, বহু লোক আপনার তৈরি স্কুটারে চড়ছে কিন্তু আপনার সম্পর্কে জানার কৌতূহল—।’
হীরাভাই পান মশলার কৌটো হাতে নাড়াচাড়া করছিল। থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি আর বেশি কী বলব? পনেরো বছর আগে বাবা ছোটো একটা ঘরে গুঁড়ো সাবান তৈরির কারবার শুরু করেছিলেন, আমি সেটা একটু বড়ো করেছি কারখানা বানিয়ে। স্কুটার আমি একা তৈরি করি না, বাইশ পারসেন্ট শেয়ারের মালিক আমি। খেলায় ইন্টারেস্ট আছে। রোজ ভোরে ময়দানে ভলিবল খেলি। এখন বয়স ছেচল্লিশ। বউ আর দুটি মাত্র ছেলে আছে। এবার মি. অরোরা বলুন।’
হীরাভাই যতটা জানাল, তার থেকেও কম বলবে ঠিক করে রাহুল বলল, ‘এখন আমি দিল্লির তার আগে কলকাতারই ছিলাম। ব্যবসায়ে গোড়া থেকেই আমি শুধু মারচেনডাইজিং—য়ের দিকটাতেই আছি। নিজের এজেন্সি তৈরি করেছি। এন্টারটেইনমেন্ট আর স্পোর্টস জগতের নামি স্টারদের জন্য কনট্র্যাক্ট পাইয়ে দেওয়ার দিকেই আমার ঝোঁকটা বেশি। আমার অফিস আছে বোম্বাইয়ে, ব্যাঙ্গালোরে, দিল্লিতে তো বটেই। এশিয়ার পূবে সোল আর টোকিওয় পশ্চিমে তেহরান আর রিয়াধে, আফ্রিকায় কায়রোতেও আমার রিপ্রেজেন্টেটিভ আছে। আমার ক্লায়েন্টদের মধ্যে নাইট ক্লাব সিঙ্গার থেকে গলফার অনেক রকম পেশার লোকই আছে কিন্তু কোনো ট্র্যাক স্টার নেই।’
‘বলছেন কি মি. অরোরা? আপনি আমাদের এজেন্ট হবেন আর আপনি দৌড়ের বিষয় কিছু জানেন না?’ হীরাভাই তাজ্জব হবার ভান করল।
‘মি. পটেল এসব কথা বাদ দিন। রাহুল গজল জানে না, ভারতনাট্যম জানে না কিন্তু ওর ক্লায়েন্ট লিস্টে ভারতের সেরা সিঙ্গার আর ডান্সাররা আছে।’ অর্জুন একটু তীব্র স্বরে বলল, ‘রাহুল এখন ভারতের সেরা এজেন্ট আর সেজন্যই ওকে ডেকে এনেছি।’
হীরাভাই উত্তর দেবার আগে ডা. সরকার বললেন, ‘নিজের পেশায় মি. অরোরা খুবই নামি লোক। তিনি আজ এখানে এসেছেন কারণ আমার মনে হয়েছে এই আলোচনায় ওর উপস্থিতি থাকার এইটেই ঠিক সময়।’ কথা বলার ভঙ্গি থেকেই বোঝা যাচ্ছে সরকারই এই আলোচনার নেতৃত্ব দেবেন। ‘ফিল্মটা আগে আপনারা তো কখনো দেখেননি। কেমন লাগল বলুন?’
‘মেয়েটিকে ভালোই মনে হল।’ অর্জুন প্রথম মন্তব্য করল।
‘দৌড়য়ও খুব ভালো।’ হীরাভাই বলল, ‘মি. অরোরা আপনার কী রকম মনে হল? ওকে গজল গাওয়ালে ভালো হবে না কথক নাচালে?’
‘মি. পটেল ঠাট্টা মস্করা নয়।’ অর্জুন হুঁশিয়ারি দিল।
‘আমাদের এই কনসরটিয়ামকে যদি সফলভাবে চালাতে হয়, তাহলে পরস্পরের উপর শ্রদ্ধা থাকা দরকার।’ গম্ভীর স্বরে সারদাচরণ বললেন, ‘এই ধরনের কথাবার্তা হলে, চেয়ারম্যান হিসেবে আমি তাহলে এই আলোচনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব।’
হীরাভাই পানমশালার কৌটো পকেটে রেখে সোফায় দেহ এলিয়ে বলল, ‘ডাক্তারবাবু কিছু মনে করবেন না, আমি এইভাবেই কথা বলে থাকি। বহুদিনের অভ্যাস। আমার কথায় কিছু মনে করবেন না। আপনি জিজ্ঞাসা করলেন ফিল্মটা কেমন লাগল। খুব ভালো লেগেছে। ২৪ ক্যারেটের মেয়ে, কোনো সন্দেহ নেই। অরোরা কী বলেন?’
‘হ্যাঁ, আমি ইমপ্রেসড হয়েছি। দৌড় বিষয়ে আমি পণ্ডিত নই তবে বড়ো বড়ো অ্যাথলিটের দৌড় টিভি—তে দেখেছি। আমার মনে হয় বড়ো রানার চিনে নেবার মতো বোধবুদ্ধি আমার কাছে। তবে অন্যান্য রানারের বিরুদ্ধে আপনার স্বর্ণকুমারী কী করবে সেটাই দেখতে চাই।’
রাহুলের শেষ বাক্যটিকে সমালোচনা হিসাবে ধরার বদলে, সারদাচরণ খুশিই হলেন। ‘আমিও তাই চাই মি. অরোরা। আর সেটাই দেখব। আপনাদের আমি একটা গল্প বলব যেটা আমি ছাড়া এখনো পর্যন্ত আর কেউ জানে না। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই অনুরোধ করব, আর কারুর কাছে সেটা বলবেন না।
‘আজ থেকে প্রায় ৪৯ বছর আজে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। বর্মা ফ্রন্টে জাপানীরা হু হু করে এগিয়ে আসছে ভারতের দিকে। আজাদ হিন্দ ফৌজের যোদ্ধারা আরাকান পর্যন্ত এসে গেছে, সেই সময় পিছু হটছে মিত্রপক্ষের বাহিনী। তাড়া খেয়ে পালাতে পালাতে এক ব্রিটিশ রেজিমেন্টের সারজেন্ট দলছুট হয়ে যায়। গভীর জঙ্গল আর পাহাড়েনর মধ্যে সে পঁচিশ দিন ধরে হেঁটে ছিল শুধু বুনো ফল, নদীর জল খেয়ে। ম্যালেরিয়ায় অর্ধমৃত অবস্থায় সে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, মি. আও নামে এক জঙ্গল অঞ্চলে। তাকে কুড়িয়ে নিয়ে যায় আপাতনি উপজাতিদের একটি ভ্রাম্যমাণ দল। তারা এই ব্রিটিশ সারজেন্টকে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দেয়, বুনো ভেষজ ওষুধের সাহায্যে সুস্থ করে তোলে। সেই গভীর গহন অরণ্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা পৌঁছতে পারেনি। দরকারও হয়নি। সেই সারজেন্ট দু—বছর লুকিয়ে ছিল জঙ্গলে আপাতানিদের সঙ্গে। এরই মধ্যে এক আপাতানি মেয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয় এবং মেয়েটি তার ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। ব্যাপারটাকে মেয়েটির আত্মীয়রা এবং সমাজের লোকেরা ভালো চোখে দেখেনি। সাহেবকে তারা মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। সেটা জানতে পেরে সেই সার্জেন্ট পালায়, মেয়েটিও তার সঙ্গ নেয়। তখন সে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গভীর জঙ্গলের মধ্যে বুনো কুকুর, সাপখোপ, জোঁক, হাতি, ভালুক আর বাঘের হাত এড়িয়ে ওরা নামদাফা ফরেস্ট, যা এখন জাতীয় অরণ্য হিসেবে টাইগার প্রোজেক্টে স্থান পেয়েছে, অতিক্রম করে এসে পড়ে লেখাপনিতে। সেখান থেকে তিনসুকিয়ায় যখন পৌঁছোল তার কয়েক সপ্তাহ আগে হিরোশিমায় আণবিক বোমা ফেলা হয়ে গেছে।
