‘কত কমত?’ রাহুল অস্ফুটে কথাটা বললেও ডা. সরকারের কানে তা পৌঁছল। তিনি মুখ ফিরিয়ে একবার তার দিকে শুধু তাকালেন।
ফিল্মে ডা. সরকারের সঙ্গে মেয়েটিকে দেখা গেল। হাঁটুতে দু—হাত রেখে কুঁজো হয়ে শ্বাস নিচ্ছে। অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ করতে।
‘শেষ করার আগে একটা ছোট্ট অঙ্কের কথা বলি। পৃথিবীর সেরা পনেরোটি দূরপাল্লার মেয়ের উচ্চচতা যদি হিসেব করা যায়, তা হলে আমরা দেখব তাদের গড় উচ্চচতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। এখন যে মেয়েটির দৌড় দেখলেন তার থেকে পাঁচ ইঞ্চি কম। এটা প্রমাণিত পেশি থেকে সর্বাধিক যতটা শক্তি প্রয়োগ করা যায় সেটার সঙ্গে শরীরী উচ্চচতার সরাসরি আনুপাতিক হিসেব করে এই সিদ্ধান্তে এসেছি বিশ্বের সেরাদের থেকে গড়পড়তায় ও শতকরা ৯ ভাগ লম্বা আর পেশির শক্তিতে ওর ক্ষমতা শতক ১৯ ভাগ বেশি।’
ফিল্ম শেষ হল ওই পাহাড়ি রাস্তা ধরেই ফিরে যাওয়ার দৃশ্য দিয়ে। তবে এবার সাইকেল চালাচ্ছে স্বর্ণকুমারী আর পিছনে বসে রয়েছেন ডা. সরকার। স্লো মোশানে দেখা গেল, প্যাডেলরত গোড়ালি থেকে ক্যামেরা আলতো ভাবে উঠে চলেছে উপরে। ঘাসে ভেজা ত্বকের নীচে হাঁটু ঊরুর পেশির তির তির কম্পন, হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরা হাতের পেশির কাঠিন্য, ধুলো মাখা মুখ ঝাঁকিয়ে ওঠা চুল এবং নিরাসক্ত দৃষ্টিতে সামনে তাকানো চোখ। ফিল্ম এরপর ফ্রিজ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কেউই কোনো কথা বলল না। রাহুল প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করতে করতে ভাবল অর্জুন যা বলেছে সেটাই তা হলে ঠিক। একটা অজানা মেয়ে তা হলে রয়েছে যাকে মনে হল যেন দৌড়তে পারে। তবে অলিম্পিক মান অনুযায়ী কি না সেটা বলা সম্ভব নয়। ডা. সরকার বললেন দশ হাজার মিটার দৌড়ল ওই সময়ে। হবেও বা! কিন্তু উনি বললেই যে সময়টা ওইরকম হবে তার ঠিক কী? ক্যামেরার কারসাজিতে কেঁচোকেও তো অজগর বানানো যায়।
রাহুল এরপর কথা শুনে বুঝল অর্জুন বিশ্বাস করেছে ডা. সরকার যা বলছেন তাতে অবিশ্বাস করার কিছু নেই। হীরাভাইও বিশ্বাস করেছে। স্বর্ণকুমারীর জন্য ওরা টাকা বিনিয়োগ করেছে সুতরাং যতটা টাকা আদায় করে নেওয়া সম্ভব। সেটা ওরা করতে চাইবেই। মেয়েটির যোগ্যতা সম্পর্কে কোনোরকম সন্দেহ প্রকাশের সময় এখন নয়। ফিল্মে যেমনটি দেখা গেল স্বর্ণকুমারী আসলে সত্যি সত্যিই ওই রকম চমকপ্রদ কিনা তাই নিয়ে কথা না বলে সে নিজেকে এর সঙ্গে জড়াবে না। না জড়াতে চাইলে সরে আসার জন্য দাখিল করার মতো যুক্তি তার জানা আছে।
রাহুলের খাতায় সুপারস্টার পর্যায়ে আছে চারজন খেলোয়াড়। পাকিস্তানের শাজাহান খাঁ যে এখন স্কোয়াশে বিশ্বের এক নম্বর, অল ইংল্যান্ড এবং এশিয়ান ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন মোহিত কাত্রে, রেসিং জকি জিমি দারুওয়ালা আর সিঙ্গাপুরের একজন গল্ফার। এখন ওরা এক একজন চলন্ত ব্যবসায়ী সংস্থা। টাকা খাটাবার জন্য নিজেদের ম্যানেজার, ট্যাক্স কনসালট্যান্ট রেখেছে। এদের সাফল্য দেখে লোকে ভাবে যেকোনো তাগড়াই বাচ্চচাকে খেলায় নামিয়ে দিলেই বুঝি ওইরকম হতে পারবে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা যে অন্য রকম সেটা তারা জানে না। বিপণনের সুযোগ খেলার লোকেদের সহজে মেলে না। ঘটনাগতিকে যতক্ষণ না এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়ে যায় যেটা সারা পৃথিবীকে ঘাড় ধরে টিভি—র সামনে বসাচ্ছে ততক্ষণ কেউ বিপণনযোগ্য হয়ে ওঠে না। সুতরাং ঘটনা চাই অবস্থাটা তৈরি করার জন্য। একজন অ্যাথলিট যদি লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করতে চায় এবং এই ১৯৯২ সালেই, তা হলে তাকে বার্সিলোনায় যেতে হবে। কিন্তু অলিম্পিক সোনার মেডেল পেলেই যে সাবানের বিজ্ঞাপনে মুখ দেখান যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। রূপকথার রাজকুমারের মতো দৈত্যদানোকে বধ করতে হবে। মুখ থুবড়ে পড়ে আবার উঠতে হবে এবং তার পরও জিততে হবে। স্বর্ণকুমারী প্রতিযোগিতায় নামার যার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই তাকে এই সব করতে হবে।
রাহুলকে এই কথাগুলোই এবার এই লোকগুলোর মগজে ঢোকাতে হবে। বহু টাকা ইতিমধ্যেই মেয়েটির জন্য এরা ঢেলেছে। এখন যদি বলা যায় তাদের জিনিসটা বিক্রি করার মতো নয় তা হলে ওরা হতাশ হবে। ব্যাপারটা তার পক্ষে খুব স্বস্তিকর হবে বলে মনে হচ্ছে না। ডা. সরকার উঠে দাঁড়িয়ে স্মিত হেসে রাহুলের দিকে তাকিয়ে যখন বললেন, ‘কিছু কথা বলব, আপনি কি একটু এই দিকের সোফাটায় এসে বসবেন?’ তখড় সে মনের মধ্যে চাপা দুঃখের ছোঁয়া পেল।
তিন
‘মাপ চেয়ে নিয়েই শুরু করি। অর্জুনবাবু যখন ফিল্ম শুরু হওয়ার আগে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলেন তখন আমি ভূমিকার মতো কিছু বলতে অস্বীকার করি। এই অসৌজন্যতার জন্য আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি।’ ফিল্মের গমগমে স্বরের পর এখন ডা. সরকারের স্বর পাতলা শোনাচ্ছে। ‘আজকের এই জমায়েতের কথা ভেবে আমি ঠিকই করেছিলাম, আমার আগাম কথা দিয়ে নয়, স্বর্ণকুমারী নিজেই নিজের সম্পর্কে ধারণা আপনাদের মনে তৈরি করে দিক। তাই এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা দিইনি। আজকের এই জমায়েতের কারণ সম্পর্কেও আগাম কিছু বলিনি। আপনারা ব্যস্ত লোক, অনেক জরুরি কাজ ফেলে আজ এখানে এসেছেন, সেজন্য আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। কেন আপনাদের আগাম কিছু জানাইনি সেটাই একবার বলব।’
