‘কিছু কিছু অ্যাথলেটিক কাজকর্ম আমরা বাদই দিচ্ছি কেননা আমাদের যা জানার দরকার তার সঙ্গে ওসবের কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন, জাম্পিং বা থ্রোয়িং ইভেন্টগুলোর মান উঠছে টেকনিকের উন্নতির জন্য, এত দ্বারা শরীরগত মাপজোক বা পরীক্ষার জন্য সাদামাটা সরল যে সুযোগটা ছিল সেটা নষ্ট হয়েছে। তবে এখনও অনেক ইভেন্ট রয়ে গেছে যেগুলো কোচিং টেকনিকের জটিলতার হাত এড়াতে পেরেছে যেমন দূর পাল্লার দৌড়।’
এইবার ফিল্ম ফিরে গেল ঘন শাল জঙ্গলের মধ্যে লাল মাটির রাস্তায়। ডা. সরকার একটা সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে লাল শর্টস সাদা স্পোর্টস শার্ট আর স্পোর্টস শু। সূর্যের আলো একদিক থেকে গাছের ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে। তাই থেকে বোঝা যায় সময়টা মধ্যাহ্নের কয়েক ঘণ্টা আগে।
‘তা হলে এবার দেখা যাক আমাদের এই তরুণী রানার হিসাবে কেমন হতে পারে। একটা কথা বলে রাখা ভালো, মেয়েটি জীবনে কখনো কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি। প্রথমে দেখা যাক সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে সে কেমন দৌড়য়, শুধুমাত্র দৌড়ের আনন্দে দৌড়কে উপভোগ করার জন্য।’
এবার স্বর্ণকুমারীকে দেখা গেল। সোনালি সিল্কের শর্টস আর হাতকাটা সাদা জামা পরা কিন্তু খালি পায়ে। সেই লাল মাটির রাস্তা দিয়ে সে সাবলীল গতিতে ছুটে চলেছে। মাথার চুল কাঁধের উপর ঝাঁকাচ্ছে। তার সঞ্চরণের মধ্যেই জমানো শক্তি লুকিয়ে থাকার ধারণা দিচ্ছে। দুটি বাহু অনায়াসে দুলছে একই ছন্দে। ডা. সরকার কথা বলে যাই বোঝাবার চেষ্টা করুন না কেন, রাহুলের মনে হচ্ছে গতিময় এই মেয়েটি অনবদ্য, এর দৌড়ের মধ্যে শারীরিক উচ্ছ্বাস ও খুশিরই যেন প্রকাশ ঘটেছে। ওস্তাদ বীণকার তার যন্ত্রে প্রথম সুর লাগানো মাত্র হৃদয়ে যে কম্পন জাগে, এই মেয়েটির দৌড় প্রায় সেই রকমই অনুভূতি জাগাচ্ছে। রাহুল এরপর টের পেল নিজের অজান্তেই সে কার্পেটে ডান পা চেপে ধরে আছে, যেভাবে সে মোট গাড়ির অ্যাক্সিলেটর চেপে ধরে।
মেয়েটি তার দৌড়ের গতি বাড়িয়েছে। পিছনে সাইকেলে চেপে যাচ্ছিলেন ডা. সরকার। ধীরে ধীরে তিনি পিছিয়ে পড়ে ফিল্মের ফ্রেম থেকে বেরিয়ে গেলেন। মসৃণভাবে মেয়েটি গতি বাড়াচ্ছে, কালো চুলের রাশ তার পিছনে ওঠানামা করছে ঢেউয়ের মতো। দুটি মুঠো করা বাহু পিস্টন রডের মতো এগোচ্ছে পিছোচ্ছে, দুটি খালি পা সমান তালে রাস্তার মাটি কামড়ে চিবিয়ে পিছনে ফেলে দিচ্ছে। প্রায় তিরিশ সেকেন্ড প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে ধীরে ধীরে সে মন্থর হয়ে এল। তখন আবার ডা. সরকারকে ফ্রেমের মধ্যে সাইকেল চালিয়ে ঢুকতে দেখা গেল।
যে জিনিসটা রাহুলকে কৌতূহলী করল, সেটি হল, নিছক আনন্দের জন্য দৌড়চ্ছে বলা হলেও মেয়েটির মুখে কিন্তু উদ্দীপনা বা তৃপ্তির কোনো ভাব দেখা গেল না। সারা ফিল্মে যেমন তেমনই নিরাবেগ নৈর্ব্যক্তিক রয়ে গেল তার মুখ।
ডা. সরকার আবার কথা বলতে শুরু করলেন: ‘এতক্ষণে ওর গা গরম হয়েছে এবার তা হলে ওকে আরও দৌড়তে বলা যাক। আমার সাইকেলে মাইলোমিটার লাগান রয়েছে। মিটারে সংখ্যার ঘর শূন্যতে আনলাম।’ ক্যামেরার চোখ মিটারের উপর পড়ল। দেখা গেল চারটি ঘরেই শূন্য অঙ্ক। ‘আমি আগে আগে যাব। আমার গলায় ঝুলছে স্টপওয়াচ। ও দৌড়বে দশ কিলোমিটার। পুরো দৌড় দেখানো যাবে না, তাতে যত সময় লাগবে আধ ঘণ্টা তো বটেই ততক্ষণে আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। আসলে মেয়েটি বন্ধুর অসমান পাহাড়ি পথে, চড়াই ভেঙে কীভাবে দৌড়চ্ছে সেটাই দেখাতে চাই।’
মেয়েটিকে এবার দেখা গেল এক পাহাড়ি নদীর কিনারে ক্ষয়ে যাওয়া ঢালু জমি ঘেঁষে দৌড়চ্ছে। নদীর অপর পারে পাহাড়। ডা. সরকারের গলা শোনা গেল: ‘সিংভূম জেলার সারাণ্ডা অরণ্যাঞ্চল এটা, নদীর নাম সঞ্জাই। ওপারে দূরের পাহাড়টার নাম চিরুবেরা। আমরা শুরু করেছি চক্রধরপুরের ঠিক বাইরে একটা জায়গা থেকে।’
মেয়েটি পাকা রাস্তা ছেড়ে মোরাম দেওয়া রাস্তায় মোড় নিল। একটা টিলায় উঠল। দু—ধারে ঢেউ খেলান জমি। আদিবাসী মেয়েরা বাচ্চচারা মহুয়া কুড়োতে কুড়োতে একবার মেয়েটির দিকে তাকাল। তাদের চোখে বিস্ময় বা ঔৎসুক্য নেই। যেন এই মেয়েটির দৌড় দেখায় তারা অভ্যস্ত। প্রচুর গাছ আর অজস্র লাল ফুলে স্ক্রিনে যেন আগুন ধরে গেছে।
রাস্তায় বড়ো বড়ো গর্ত, কোথাও ঢিবি। ডা. সরকারের সাইকেলের চাকা থেকে উড়ছে লাল ধুলো। দমকা হাওয়াতেও ধুলোর পর্দা উড়ে আবার সরে যাচ্ছে।
‘এবার যে পাহাড়টা দেখছেন ওটার নাম সাহেদবা। ওর ঠিক নীচেই টুইয়া গ্রাম। ওখানে আমরা শেষ করব।’
ডা. সরকার সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে। ক্যামেরা মাইলোমিটারে দেখাল ১০ সংখ্যাটা। স্টপওয়াচ হাতে তিনি অপেক্ষা করছেন। দৌড়ের শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে মেয়েটি প্রচণ্ড গতিতে। ডা. সরকারকে সে অতিক্রম করা মাত্র স্টপওয়াচের বোতামে একটা তর্জনীর চাপ পড়ল। ক্লোজ আপে স্টপওয়াচটিকে দেখানো হল।
‘সময় হল ৩১ মিনিট ৩৩.৭ সেকেন্ড। এটা যদি কোনো প্রতিযোগিতায় করত তা হলে এই বছরের সেরা আধডজন মেয়েদের মধ্যে ও এসে যাবে। চার বছর আগে সোল অলিম্পিকসে এই সময় করলে ষষ্ঠ স্থান পেত। সপ্তম হয়েছিল চীনের ওয়াং। তার সময় হয়েছিল ৩১ মিনিট ৪০.২৩ সেকেন্ড। একটা কথা মনে রাখবেন দশ হাজার মিটার দৌড় হয় স্টেডিয়ামের মধ্যে সিন্থেটিক ট্র্যাকে। তাতে ওর সময় আরও কমত।’
