হীরাভাইয়ের বকবকানি থামাবার জন্য অর্জুন বেয়ারাকে ইসারা করল খাবার পরিবেশনের জন্য।
‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে ফিল্মটা দেখতে বসা যাক, কি বলেন ডা. সরকার। আর কতটা কাজ এগিয়েছে সেটাও শোনা যাবে।’ অর্জুন বলল। ডা. সরকার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তিনি কথা বলেন কমই। মাঝে মাঝে শুধু তার পাশে বসা অর্জুনের সঙ্গে চাপা স্বরে কথা বিনিময় করলেন। রাহুলের মনে হল, এমন লোকের পক্ষে চালাকি করে টাকা রোজগার করা সম্ভব নয়। সে পাশে বসা রাধিকার দিকে ঝুঁকে বলল, ‘ফিল্মটা কী নিয়ে? বিষয়টা কী?’
রাধিকা ঝুঁকে রাহুলের কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে বলল, ‘বলা বারণ। প্রোজেক্ট নিয়ে ডিনার টেবলে কথা বলতে মি. হালদার বারণ করেছেন। উনি চান আগে আপনি ফিল্মটা দেখুন।’
টেবলে নানা ধরনের কথাবার্তা হল শুধু খেলার বিষয় ছাড়া। নিরামিষ খাওয়ার উপকারিতা থেকে ভারতের অর্থনীতি, ধর্ম, পাকিস্তানের পরমাণু বোমা, কলকাতার ভাঙাচোরা রাস্তা, বিদ্যুৎ ঘাটতি ইত্যাদি অনেক বিষয়েই প্রত্যেক কিছু না কিছু মন্তব্য করল। খাওয়া শেষ হলে সবাই উঠে গেল বসার ঘরে। সেখানেই ভিডিও ফিল্মটি দেখানো হবে।
ডা. সরকারের ফিল্ম দেখানোর জন্য দুটো সোফা পাশাপাশি জোড়া দেওয়া হয়েছে। তাতে অন্তত আটজন স্বচ্ছন্দে বসতে পারে। ঘরে ঢোকার সময় রাহুল একটু পিছিয়ে রইল। হীরাভাই বসার পর সে সোফার অন্য প্রান্তে বসল অর্জুন এবং রাধিকাকে মাঝখানে রেখে।
কফি এল। বেয়ারা ট্রে নিয়ে সবার সামনে ধরল। রাহুল মাথা নেড়ে সিগারেট ধরাল। অর্জুন ডা. সরকারকে জিজ্ঞাসা করল, ফিল্মের ভূমিকা হিসাবে কিছু বলবেন কি না।
‘না, ফিল্মই যা বলার বলবে।’
‘তা হলে শুরু করি।’ অর্জুন ক্যাসেট নিয়ে এগিয়ে গেল প্রোজেক্টারের কাছে।
ঘোলাটে ছাই রঙা স্ক্রিনটা কয়েক সেকেন্ড আলোর বুদবুদ কেটে, ফুলঝুরি ছড়িয়ে ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে উঠল। হলুদেরই ফিকে থেকে গাঢ় নানান ধরনকে সোনা বলা হয় কিন্তু খাঁটি সোনার আলাদা একটা গুণ আছে যেজন্য এটাকে রং হিসাবে আলাদা করা হয়।
অন্তত দশ সেকেন্ড সোনার রঙে ক্রিনটা জ্বল জ্বল করার পর ক্রমশ গিরিমাটির রং ধরল। রাহুল এবার টের পেল, গরম মসৃণ গাত্র ত্বকের উপর বিশুদ্ধ রোদের আলো ক্লোজ আপে দেখানোর ফল যে কেমন হতে পারে সেটাই দেখান হচ্ছে। গুঁড়ি গুঁড়ি সোনালি লোমের জন্য সোনা রঙার ধরন রেশমের মতো।
একটি মেয়ের ঊরু। ধীরে ধীরে সেটা মিলিয়ে ভেসে উঠল কোমর। ক্যামেরা চক্রাকারে কোমরটাকে ঘুরে এল নাভির উপর। স্ক্রিনের উপর ফুটে উঠল শুধু একটি শব্দ: স্বর্ণকুমারী। নিথর সাদা অক্ষরগুলোর জন্য ত্বকের নড়াচড়াটা প্রকট হয়ে উঠল। কোন কলাকুশলীর নাম ফুটে উঠল না।
ক্যামেরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে এল আর স্ক্রিন জুড়ে দেখা দিল একটি মেয়ের পূর্ণ শরীর। দীর্ঘকায়া, অনস্বীকার্যভাবে সুন্দর নীল পটভূমিতে গতিহীন, বাতাসে দীর্ঘ কালো চুল উড়ছে। ছবিটা তোলা হয়েছে কোনো উঁচু জায়গায় কেননা মেয়েটির হাঁটুর পিছনে দূরের একটা টিলা দেখা যাচ্ছে। ক্যামেরা কোণ বদলাচ্ছে। মেয়েটির ডানদিকে ক্যামেরা এল অর্থাৎ সূর্যের মুখোমুখি হল। মুখের কালোছায়ার কিনারে সোনালি রেখা নাটকীয় অনুভূতি জানাল।
রাহুল অস্বস্তি বোধ করছে। মেয়েটিকে সে চিনে উঠতে পারছে না। টিভি কমার্শিয়ালে যেসব মেয়েরা মডেলের কাজ করে তাদের প্রায় সকলেরই মুখ তার চেনা। সকলের নাম অবশ্য তার মনে নেই। কিন্তু নামটা তত জরুরি নয়। একই মেয়ে দশ রকমের বিজ্ঞাপনে নামছে প্রেশার কুকার থেকে টুথপেস্ট, ফাস্ট ফুড। বিজ্ঞাপন ব্যবসায় যারা জড়িত তারা চিহ্নিত করে রাখে এদের। যে মেয়ে জাতীয় কার্যক্রমে ছেলেকে প্রতি রাত্রে জেলিমাখন পাউরুটি খাওয়াচ্ছে, কোনো কোম্পানির বড়কর্তা ম্যাগাজিন খুলেই পুরো পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনে সেই মেয়েকে দেখে নিশ্চয় খুশি হবে না। বিপণনে সুদক্ষরা এমন কাজ কখনোই করে না এবং রাহুলের কাজ হল, এমন ব্যাপার যাতে না ঘটে সেটাই দেখা।
স্বর্ণকুমারী যে—কোনো এজেন্সি ক্যাটালগে নেই, সে বিষয়ে রাহুল নিশ্চিত। মুখটি এমনই যে একবার দেখলে ভুলে যাওয়া অসম্ভব। গোলাকার ঈষৎ চ্যাপটা মুখের গড়ন, কিছুটা মোঙ্গোলীয় আদল ধরা পড়ে। পাতলা গোলাপি ঠোঁট। চোখে সামান্য বিষাদের ছোঁয়া। ব্যক্তিত্বে গর্বে টলমল করছে, কপালের ঢাল বেয়ে নেমে আসা সরু টিকোল নাক, জোড়া ভুরু, গালের উঁচু হাড়। সম্রাজ্ঞীর মহিমা ছড়ানো মুখমণ্ডলে। তাকে ঘিরে ক্যামেরার আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাহুল অবাক হচ্ছিল এই ভেবে যে এমন দারুণ একটি মেয়েকে বিজ্ঞাপন দুনিয়া খুঁজে পায়নি এখনও। দেহে কোনো খুঁত—টিকার দাগ, পোড়া বা ক্ষত বা জরুল আছে কি না দেখার জন্য রাহুল তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে শটগুলিতে চোখ রাখল। নিখুঁত দেহ।
ক্যামেরা দেহ আবর্তন করে আবার শুরুর অবস্থানে এসে পেটের উপর ক্লোজ আপে রইল। স্ক্রিনের উপর দিয়ে নাভিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। যেখানে আগে টাইটেল পড়েছিল, নাভি সেইখানে পৌঁছেই থেমে গেল। সোনা রঙের পটভূমিতে সাদা অক্ষরে ভেসে উঠল সাজানো একটা পরিসংখ্যান।
স্বর্ণকুমারীর ২০ বছর বয়স পূর্ণ হবে
২৫ অগাস্ট, ১৯৯২
