‘মনে পড়ছে। তুমি খুব এর প্রশংসা করেছিলে।’
‘ওর সঙ্গে প্রায়ই নানান কথা হত ফিজিয়োথেরপি ট্রিটমেন্ট চলার সময়। একদিন কথায় কথায় অ্যাথলেটিকসের প্রসঙ্গ উঠল। আমাদের দেশে কত রকমের ঘাটতি, অসুবিধে, অজ্ঞতা, দলাদলি রয়েছে তাই বলতে বলতে তিনি এই মেয়েটির কথা বললেন। দৌড়ে অসম্ভব ট্যালেন্ট রয়েছে কিন্তু কিছু একটা ব্যবস্থা না করলে ধীরে ধীরে করেছেন ভালো কোচ দিয়ে ওকে ট্রেইনিংয়ের ব্যবস্থা করাবেন লোক চক্ষুর আড়ালে। তার ধারণা দু—বছরের মধ্যেই সে অলিম্পিকসে যাবার উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারবে। ওকে গড়ে তোলার জন্য টাকার দরকার। তিনি কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ধরে মেয়েটিকে স্পনসর করার ব্যবস্থা করলেন। ব্যাপরটা এ দেশের অ্যাথলেটিকসের ক্ষেত্রে নতুন। এইভাবে ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটা সংঘ বা কনসর্টিয়াম গড়া কখনো হয়নি। তারা ত্রিশ—চল্লিশ হাজার টাকা এক একজন দিয়েছে। যদি মেয়েটি জেতে তা হলে তারা টাকা ফেরত পাবে, সুদসহ।’
‘টাকাটা ফেরত দেবে নিশ্চয় কমার্শিয়াল বিজ্ঞাপন থেকে টাকা পেয়ে। আর মনে হচ্ছে, তুমিও বোধ হয় এই ব্যবসায়ীদের সংঘে যোগ দিয়েছ।’
‘আমি প্রথমে একটা প্রাইভেট ট্রায়ালে মেয়েটির দৌড় দেখতে গেছিলাম বর্ধমানে, জিটি রোডে। দেখে মনে হয়েছে খাঁটি সোনা।’
‘জিটি রোড? সেকি! ট্র্যাকে না দৌড়ে রাস্তায়?’
‘মেয়েটি ম্যারাথনার। তবে পাঁচ আর দশ হাজার মিটারেও তৈরি হয়েছে।’
‘মাই গড! কত দিয়েছ?’
‘বুঝলাম না!’ অর্জুন ভ্রূ কোঁচকাল।
‘বাজির টাকা। ডা. সরকারকে কত দিয়েছ?’
‘এক লাখ।’
রাহুল চোখ বুজল।
‘আমাকে সারিয়ে তোলার জন্য অত টাকাই ওর পাওয়া উচিত।’
‘ভালো। কিন্তু গোপনীয়তা কেন? ডা. সরকার কি এটার সম্পর্কে কিছু বলেছেন?’
‘প্রধানতই নাটকীয় একটা চমক জাগাবার জন্য। যদি দু—বছর ধরে মেয়েটি নানান কম্পিটিশনে নামত তা হলে ইতিমধ্যেই সে অলিম্পিক ফেভারিট হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যেত। রাহুল বিশ্বাস করো, মেয়েটি সেইরকমই, অত ভালোই। সোনা জিতলে কেউ আর তখন অবাক হবে না। কিন্তু অজানা থেকে সেটা করলে জেতাটা চাঞ্চল্যকর গণ্য হবে। তোমার কি মনে হয় না কি বিরাট প্রচার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?’
‘ডা. সরকারের মতলবটা কী?’ রাহুল জানতে চাইল।
‘ভারত ইনডিভিজুয়াল ইভেন্টে একটি মাত্র ব্রোঞ্জ এনেছে অলিম্পিকস থেকে সেই কবে—৪০ বছর আগে, কুস্তিতে। আর ১৯০০ পারীতে নর্মান প্রিচার্ডের রুপোর মেডেল দুটো যদি ধরো তা হলে মোট তিনটে। দশকের পর দশক এত বড়ো একটা দেশ থেকে কেউ একজন এখনও একটা সোনা জিততে পারেনি! এই লজ্জা এই ক্ষোভ আর অপমান বোধ থেকেই বোধহয় তিনি এই অভিনব পন্থায় অ্যাথলিট গড়ার চিন্তা করেন। তুমি নিজেই বরং ওকে বুঝে নেবার চেষ্টা করো। উনি এখুনি এসে পড়বেন, ডিনারে ওকে বলেছি।’
‘তাই বুঝি!’ রাহুল সিধে হয়ে বসল। ‘মেয়েটিও আসছে নাকি?’
‘না। তার বদলে উনি একটা ফিল্ম আনবেন। সেটা আমি নিজেও এখনও দেখিনি। আরও একজন আসবে, যারা টাকা দিয়েছে তাদেরই একজন, নাম হীরাভাই পটেল, ডিটারজেন্ট সাবান আর টু হুইলার ম্যানুফ্যাকচারার, কলকাতারই লোক, আমেদাবাদে কারখানা।
‘হীরাভাই নামটা জানি। ওর যা প্রফিট মার্জিন তাতে লাখ দু—লাখ লোকসানে কিছু আসে যায় না।’
অর্জুনকে একটু ক্ষুণ্ণ দেখাল। বলল, ‘মনে হচ্ছে আমার কথা তোমাকে ইমপ্রেস করেনি।’
‘ঘাবড়িও না অর্জুন। তোমার অতিথিদের সামনে এভাবে কথা বলব না। তবে কী জানো পুরো ব্যাপারটা আমার যেন কেমন কেমন লাগছে।’
দুই
একটা কালো ফিয়াট গেট দিয়ে ঢুকে ড্রাইভ ওয়ে ধরে পোর্টিকোয় এসে থামল।
‘এসে গেছে।’ অর্জুন বলল, চেয়ার থেকে উঠে সে আর রাধিকা এগিয়ে গেল। রাহুল ঘাড় ফিরিয়ে প্রথম বারের মতো ডা. সরকারকে দেখতে লাগল। অতি সাধারণ দর্শন, ছোটোখাটো চেহারা মাথাভরা কাঁচা পাকা চুল। কালো প্যান্ট আর হলুদ নীল ডোরাকাটা বুশশার্ট। শীর্ণ গড়ন।
অর্জুন ওদের নিয়ে বাড়ির মধ্যে গেল। রাধিকা ফিরে এসে রাহুলকে বলল, ‘চলুন ডাইনিংয়ে যাওয়া যাক। ডিনারের পর ফিল্মটা দেখান হবে।’
ডাইনিং টেবলে রাহুলের ডানদিকে হীরাভাই বাঁদিকে রাধিকা বসল। এবং বসামাত্রই হীরাভাই বুঝিয়ে দিল সে কথা বলতে ভালোবাসে।
‘তা হলে আপনিই রাহুল অরোড়া, সুপার সেলসম্যান, কি যেন বলেন… মারচেনডাইসিং এজেন্ট না কি যেন?’
‘হ্যাঁ, ট্যাক্স ফর্মে তাই লিখি।’ রাহুল সাদামাটা স্বরে বলল। ‘তবে আমাদের পেশায় কেউ কেউ এজেন্ট শব্দটা পছন্দ করে না। তারা ম্যানেজার বা কনসালটান্ট বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসে। অবশ্য আমার যে কোনোটাতেই চলে যায়।’
‘যত্তো সব গালভরা তকমা,’ হীরাভাই বলল, ‘আমার তো সাবানের ব্যাবসা। আপনি আমাকে সাফাইওলা বলুন আমি কিছু মনে করব না যদি অবশ্য আপনি আমার মাল কেনেন।’
বহু লোকই যে হীরাভাইয়ের মাল কেনে সেটা তার দু—হাতের আঙুলে বড়ো বড়ো মূল্যবান পাথর বসান গোটাছয়েক আংটি থেকেই বোঝা যায়।
‘আমি প্রোডাকশন সাইডটা আর পারচেজটাই দেখি। সেলিংয়ের জন্য আপনাদের মতো লোকদের উপরই নির্ভর করি। ডাক্তারবাবু যখন এই ব্যাপারে টাকা লাগাতে বললেন, ওনাকে আমি সরাসরি বলে দিলাম, মশাই আমি কিন্তু স্লিপিং পার্টনার থাকব। আমি একদম নাক গলাব না—কয়েক হাজার টাকা ইনভেস্ট করব, ব্যস। আমি আমার কথা রেখেছি কিন্তু। ঠিক কিনা বলুন ডাক্তারবাবু। তারপর যখন শুনলাম ওনারা সব একজন মার্কেটিং করার লোক কী যেন আপনি নিজের টাইটেলটা বললেন?—একজনকে ঠিক করছেন, তখন ভাবলাম লোকটাকে একবার তো দেখা দরকার?’
