‘যদি উষা একটা মেডাল আনত তাহলে কী হত?’ এতক্ষণে রাধিকা মূল আলোচনায় প্রথম তার কণ্ঠস্বর পেশ করল।
‘ফ্যান্সাস্টিক কাণ্ড হত। মেয়েদের ট্র্যাক ইভেন্টে ১৯৮৪ পর্যন্ত মাত্র দুটি মেডেল জিতেছে এশিয়ান মেয়েরা। ১৯২৮—এ এক জাপানি মেয়ে রুপো জিতেছিল ৮০০ মিটারে। লোকে ভুলেই গেছে তার নাম, আমিও। আর ১৯৬৮—তে ১০০ হার্ডলসে তাইওয়ানের চি চেং একটা ব্রোঞ্জ! উষা যদি কিছু একটাও আনত তাহলে ভারত কেন এশিয়ার দশ বারোটা দেশ থেকে এনডোর্সমেন্টের কনট্রাক্ট নিয়ে লাইন পরে যেত।’
কথাটা লুফে নিয়ে অর্জুন বলল, ‘ধরো উষার থেকেও জিনিয়াস কোনো মেয়ে এ বছর যদি ভারতে উঠে আসে আর অলিম্পিকসে সোনা জেতে? তুমি কি তার কমার্শিয়াল রাইটস সম্পর্কে আগ্রহী হবে না?’
‘কোনো এজেন্টই এমন বিরাট কমিশন হাতছাড়া করতে চাইবে না।’ কথাটা বলে রাহুল চোখ টিপল। ‘ব্যাপারটা কী, একটু খোলসা করেই বল না। মিস পাইন কি ইন্ডিয়ান অলিম্পিকস টিমের জন্য ক্যান্ডিডেট নাকি?’
‘হ্যাঁ।’ অর্জুন কিছু বলার আগেই রাধিকা ছদ্ম গাম্ভীর্যের মুখোশ মুখে টেনে বলল, ‘কোন অ্যাথলেটিকস ইভেন্টের বলুন তো? দেখি আপনার চোখ কেমন?’
‘চোখ আমার ভালোই। আপনার ফিগার বলছে জাম্পিং ইভেন্টের।’ রাহুল বলেছিল রসিকতা করে, রাধিকাও জবাব দিয়েছে সেই ভাবে। সুতরাং কথাবার্তা ওই স্তরেই চালাবার জন্য রাহুল যোগ করল, ‘লং লেগস, ফার্ম রাউন্ড বাটকস, সেন্ডার ফ্ল্যাট স্টম্যাক… আরও বলব?’
‘আপত্তি নেই, ফ্ল্যাটরড তো বহুক্ষণই বোধ করছি, নয় আরও করব;’ রাধিকা গম্ভীর হয়ে থেকেই পায়ের উপর পা তুলে দিল। তবে চোখে কৌতুক।
‘না। এরপর কিছু বলতে হলে কালিদাস থেকে ধার করতে হবে। কিন্তু দেনাদার হয়ে থাকতে আমার বিশ্রী লাগে।’
‘তাহলে নিজের কথাতেই বলুন।’
‘আমি কবি নই সুতরাং খারাপ ভাষা দিয়ে বর্ণনা করে আপনার দেহটিকে নষ্ট করতে পারব না।’
অর্জুন মিটমিট করে হেসে ওদের কথা শুনছিল। এইবার সে বলল, ‘ধরো আমি যে অ্যাথলিটের কথা বললাম তাকে এখন পর্যন্ত লোকে চেনেই না।’
‘তাতে তাকে সেল করা মোটেই সম্ভব হবে না।’ সিরিয়াস গলায় তার যুক্তিটা দেখাতে চাইল। ‘অজানা অখ্যাত ভারতীয় বার্সিলোনায় মেডেল জিতল, এইভাবে যদি ব্যাপারটা বিরাট করে তোলা যায়।’
‘হ্যাঁ, মন্দ নয়।’ রাহুল উদার গলায় বলল। ‘আমার মনে হচ্ছে অর্জুন, তুমি জার্নালিজমে একবার চেষ্টা করে দেখতে পার। তবে যা বললে তাতে একটা খিঁচ রয়ে গেছে। তোমার এই সম্পূর্ণ অজানা অ্যাথলিটটি ভারতীয় অলিম্পিক দলে ঢুকবে কী করে?’
‘হ্যাঁ, এটা একটা ভালো হয়েন্ট বটে। অলিম্পিক দলে জায়গা পেতে হলে একটা নির্দিষ্ট যোগ্যতামানে পৌঁছতে হবে। আর সেজন্য ট্রায়াল হয়। যদি আমাদের অজানা অ্যাথলিটটি সেই মানে পৌঁছয় তা হলেই জায়গা পাবে।’
রাহুল যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বেশ খুশি মনেই সে গ্লাসে বিয়ার ঢালল সতর্ক হাতে, একমনে। ফেনা থিতিয়ে যাবার জন্য সময় নিয়ে সে চেয়ারে হেলান দিয়ে ধীরে সুস্থে বলল, ‘তা হলে ট্রায়াল! ভালো কথা। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না অর্জুন, তোমার এই অনভিজ্ঞ অ্যাথলিট যে কখনো প্রকাশ্যে দৌড়য়নি সে কী করে ভালো কোচিং পাওয়া অ্যাথলিটদের হারিয়ে টিমে জায়গা করবে?’
‘ওহো।’ অর্জুন হাত তুলে স্বীকার করল যুক্তিটা। ‘আমি বলেছি আমাদের অথ্যালিটটি অজানা, কিন্তু অনভিজ্ঞ বলিনি। তুমি তফাতটা লক্ষ করোনি। এক্সপার্ট কোচিং পেয়েছে মেয়েটি।’
‘মেয়েটি? আমরা কোনো মেয়েকে নিয়ে কথা বলছি নাকি?’ রাহুলের বিস্ময় হালকা কথাবার্তার উপর ঝপ করে যেন ভিজে কাঁথা ফেলে দিল।
অর্জুন বলল, ‘হ্যাঁ মেয়েই। চমৎকার দেখতে। বিজ্ঞাপনের পক্ষে খুবই ভালো। তার থেকেও বড়ো কথা ফ্যান্টাস্টিক রানার। দ্যাখো রাহুল, ভারতের অ্যাথলেটিকসের অবস্থা তো তুমি জানো।’
‘আমি কেন, একটা রিকশাওলাও জানে—হাস্যকর, জঘন্য।’
‘বরাবর পুরুষরাই প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিল। সেটা ভেঙে উষাই প্রথম এগিয়ে আসে। পুরুষদের নিয়েই ভারতীয় দল তৈরি হত, দু—একটা মেয়েকে কৃপা করে রাখা হত। কিন্তু ছেলেরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ল, উষাই হল মধ্যমণি। তাকে ঘিরে উঠে এল আরও কিছু মেয়ে। ছ—বছর আগে সোল এশিয়ান গেমসে আমাদের যা কিছু অ্যাথলেটিকস মেডেল তা মেয়েরাই এনে দিল। কিন্তু অলিম্পিকসে চূড়ান্ত ফ্লপ। এসব পুরোনো কথা। এখন এমনই অবস্থা অলিম্পিকে পাঠাবার মতো একটা ছেলে বা মেয়ে ৯০ কোটি মানুষের দেশে নেই। দেশের লোক হতাশ, হাল ছেড়ে দিয়েছে। তারা বিশ্বাসই করে না, আগামী পঁচিশ বছরে ভারতের কেউ অলিম্পিকস থেকে মেডেল আনতে পারবে।’
‘তাদের মধ্যে আমিও একজন।’
‘কিন্তু এই মেয়েটি পারবে।’ অর্জুনকে উত্তেজিত দেখাল। রাহুল ভ্রূ তুলে রাধিকার মুখভাব লক্ষ করে বুঝল মেয়েটি সম্পর্কে বোধহয় খবর রাখে।
‘ব্যাপার কী?’ রাহুল দাবি জানাল বিস্তারিত তথ্যের জন্য।
‘দু—বছর আগে জগ করার সময় আমার হ্যামস্ট্রিং টেনে ধরে, বোধহয় জান সে কথা।’ অর্জুন নড়েচড়ে চেয়ারের হাতলে দুটো কনুই রাখল। ‘মাঝে মাঝেই এমন টান ধরত যে হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যেত। ডাক্তারের পর ডাক্তার দেখালাম, কিছুই হল না। শেষে বর্ধমানের এক ফিজিওলজিস্টকে দেখাতে বলল আমার এক আত্মীয়। সেখানকার মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপনা করেন। তার চিকিৎসায় একদম সেরে উঠলাম। ডা. সরকার, দারুণ লোক।’
