‘বার্সিলোনা থেকে টেলিকাস্টে একটু জায়গা পাবার জন্য এডভার্টাইজারসদের কাছ থেকে নেটওয়ার্ক কী ধরনের টাকা চেয়েছে তা কাগজে বেরিয়েছে, বোধহয় তুমি পড়েছ। অবিশ্বাস্য, তাই না? এক মিনিটের জন্য ৪০ লাখ টাকা। আমি জানি স্পোর্টসের ঘাড়ে চেপে প্রোডাক্ট বিকোয় কিন্তু এত টাকা যেখানে জড়িত সেখানে হাত দিয়ে হাত পোড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।’
‘তার মানে তুমি অলিম্পিকসের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে রাজি নও?’
রাহুল জবাব দিতে ইতস্তত করল। অর্জুন যেভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অ্যাথলেটিকসের ব্যাপরটা নিয়ে কথা চালাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ও যেন এটার মধ্যে নাক গলিয়েছে। এখন যদি সে তর্ক চালিয়ে বলে যায় অ্যাথলেটিকসের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নেই আর একটু পরেই খাবার টেবলে যদি কোনো প্রতিশ্রুতিমান স্প্রিন্টার কি হাইজাম্পার এসে বসে তা হলে সে নিজে অপ্রতিভ হবে। বন্ধুকেও লজ্জায় ফেলে দেবে। সুতরাং যুক্তিটাও এবার একটু ঘোরানো দরকার।
‘অর্জুন ব্যাপারটাকে তুমি এইভাবে দেখো। চার বছরে একবার আমার পেশার লোকেদের তুমি পৃথিবীর নানান ট্র্যাক সিটের আশেপাশে ভনভন করতে দেখবে। অলিম্পিকস টিমে স্থান পেতে পারে এমন অ্যাথলিটদের তারা হাতে চাঁদ পাইয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দেবে। কিন্তু যতক্ষণ না সোনা জিতছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিছুই পাকা নয়, আর যে স্পীডে কনট্রাক্ট তৈরি হয়ে সই হয় তাতে ডোপ করা বেন জনসনও হেরে যাবে। সইয়ের পরের দিনই তোমার স্বর্ণবিজয়ীটি সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দেবে তার সাফল্যের জন্য সে ঋণী ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, সফটড্রিঙ্কস, সান গ্লাস আর বাটন—ডাউন শার্টের কাছে। দু—সপ্তাহ পরেই লোকটাকে সবাই ভুলে যাবে। যাইহোক, হয়তো বাড়িয়েই বললাম, কিন্তু আমার বক্তব্যটা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ। আামার মতো ব্যবসায়ীরা এইসব থেকে একটু তফাতেই থাকতে চাই। কোয়ার্টার কি হাফ মাইলারদের সঙ্গে হাসফাঁস করে দৌড়োদৌড়ি করাটা ঠিক আমাদের পক্ষে মানায় না। তবে নজর আমরা ঠিকই রাখি।’
রাহুল এই পর্যন্ত বলে ব্যাপারটা ছেড়ে দিল। এখন অর্জুন যদি আলোচনা টানতে চায় তো টানুক।
‘আমারও তাই মনে হয়েছে।’ অর্জুন মুখ ফিরিয়ে রাধিকার দিকে তাকাল। মেয়েটি চুপ করে শুধু কথা শুনে যাচ্ছে আর রাহুলের মুখের ভাব লক্ষ করছে।
‘রাধিকা প্লেটগুলো যে খালি রয়ে গেছে। আর একটু চিকেন স্প্রিং রোল কি মাছের—’
‘না না না।’ রাহুল সোজা হয়ে বসে হাত তুলে থামিয়ে দিল চেয়ার থেকে উঠতে যাওয়া রাধিকাকে। ‘মিস পাইনের এক সেকেন্ডের অনুপস্থিতির ক্ষতি এক প্লেট চিকেন রোল দিয়ে পূরণ করা যাবে না।’
‘আমার মনে হয় সেটাই স্প্রিং রোল না খাওয়ার কারণ নয়।’ রাধিকার ঝকঝকে দাঁত ঝিলিক দিল। ‘মি. অরোরা আসলে আর ক্যালোরি নিতে চান না।’
‘কারেক্ট, জানলেন কী করে?’
‘আপনার ফিগারই জানিয়ে দিচ্ছে। কঠিনভাবে যত্ন না করলে, মিয়ম নেমে না চললে এমন বড়ি তৈরি করা যায় না।’
রাহুলের মুখ সুখে এবং চাপা গর্বে উদ্ভাসিত হল। অর্জুন তারিফ জানানো দৃষ্টি উপহার দিল রাধিকাকে। রাহুলের দুর্বল জায়গাটিতেই তির ছুড়েছে মেয়েটি। ওর কঠিন ব্যাবসায়িক বর্ম ভেদও করেছে। রাহুল এবার কিছুটা দুর্বল হবে। কমপ্রোমাইজ করবে। অর্জুন মাথা নেড়ে হেসে রাধিকাকে উৎসাহ দিল কথাবার্তা এই লাইনে চালিয়ে যাবার জন্য।
অবশ্য রাহুলের ভালোই লাগছে শরীরের ফিটনেস নিয়ে কথা বলতে। ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাস, শ্রম বিমুখতা, খেলা সম্পর্কে অপেশাদারি আবেগপ্রবণ মনোভাব, এইসব নিয়ে তার নিজস্ব কিছু ভাবনাচিন্তা আছে। সেগুলো শোনবার মতো শ্রোতা পেয়ে সে অনর্গল কথা বলে গেলেও একটা ব্যাপার সে ঠিকই মাথায় রেখেছে। খাবার টেবলে অর্জুন যদি কোনো অসুবিধার কথা তুলে ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেওয়া যেতে পারে।
নিজেকে ফিট রাখার জন্য, ওজন বাড়তে না দেবার জন্য কী খায়, কী ব্যায়াম করে তার বর্ণনা, খুঁটিয়ে দিতে দিতে রাহুল কথার মাঝে ইচ্ছে করেই নীরবতা ঢুকিয়ে দিচ্ছিল।
অর্জুন অবশ্য রাহুলের মতো ততটা সূক্ষ্মভাবে জিনিসটা নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছুক হল না। ‘ফিটনেস নিয়ে তারাই বেশি মাথা ঘামায় যাদের হাতে টাকা আর সময় আছে। ইউরোপ, আমেরিকায় ওটা যাচ্ছে বলেই ওইসব দেশ থেকে টপক্লাস চ্যাম্পিয়ান অ্যাথলিটরা বেরিয়ে আসে, তবু দেখো, আমাদের এই গরীব দেশ থেকেও কিছু কিছু লোক তো বেরিয়েছে। মডার্ন ইকুইপমেন্টস নেই, ট্রেনিং মেথড জানা নেই, লেবরেটরি, মেডিসিন নেই তবু তিরিশ বছর আগে পর্যন্ত তো ধ্যানচাঁদ, রূপ সিং, মিলখা সিং, রামনাথ কৃষ্ণনদের মতো লোকেদের পাওয়া গেছিল। রাহুল ভাব তো এদের এজেন্ট হয়ে তুমি তখন কী টাকাটাই না লুটতে পারতে! তুমি পি টি উষার কথাই ভাব? ছ—বছর আগে সোল এশিয়াডে উষা যা করল তুমি তা থেকে কোনো ফায়দা তুললে না।’
‘ইচ্ছে করেই তুলিনি কেননা খুব বেশি তোলার সম্ভাবনা ছিলও না। উষা তো ফ্লোরেন্স জয়নার নয়। কোনো গ্ল্যামার নেই, ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলতে পারে না, ব্যক্তিত্ব নেই, ভেরি কনজারভেটিভ ইন অ্যপিয়ারেন্স, পোশাক—আসাকেও। কোনো কমমেটিকস, ফ্যাব্রিকস, গারমেন্টস, অটোমোবিল, এয়ারলাইনার, ইলেকট্রনিকস, কোনো কোম্পানিই ওকে দিয়ে তাদের প্রোডাক্ট এনডোর্স করাতে রাজি হত না শুধু বোধহয় ফার্টিলাইজার ছাড়া। আর তার পারফরম্যান্স? শুধুই এশিয়ান সার্কিটে তিন—চারটে মাত্র মিটে। সে সাকসেসফুল তাও বহু মাস পর পর। ইউরোপ, আমেরিকার সার্কিটে যদি ঘন ঘন দৌড়ত, নাম করত ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করে তা হলেও না বলা যেত মার্চেন্ডাইসিংয়ে ওর সম্ভাবনা আছে। আর সোল অলিম্পিকসে গিয়ে তো নিজের যাবতীয় ইমেজ নিজেই নষ্ট করল। এমন ট্র্যাজিক পরিণতি হবে আমি ভাবিনি! অথচ যদি ১৯৮৪—র পর সাহস করে উষা বাইরের দুনিয়ায় বেরোত, মস্তিষ্কবান আধুনিক চিন্তার কোচিং নিত তা হলে হয়তো সোল ওলিম্পিকস থেকে গোল্ড, সিলভার, ব্রোঞ্জের মধ্যে যে—কোনো একটা মেডাল আনতে পারত। একবার তুমি ভেবে দেখ, যে অস্ট্রেলিয়ান মেয়েটা ১৯৮৪—তে ৪০০ হার্ডলসে ফিফথ হল সে তাতেই গোল্ড জিতল চার বছর পর।’
