‘কোনো অসুবিধে হয়নি?’ অর্জুন বলল।
‘না।’ রাধিকা নম্র জবাব দিল।
‘মানুষ ভালো, নিজের চেষ্টায় পরিশ্রমে বড়ো হয়েছে।’
‘একটু ছেলেমানুষি আছে।’
‘অত্যন্ত শ্রুড বিজনেস ব্রেইন। গত বছর ওর প্রি—ট্যাক্স টার্নওভার হয়েছে সতেরো কোটি টাকা। ওকে দেখে তা বুঝতে পারবে না।’
‘আমি কি আরও কিছুক্ষণ থাকব?’
‘অসুবিধে না থাকলে…।’
‘না না অসুবিধে নেই, বাড়িতে বলেই রেখেছি আজ ফিরতে দেরী হতে পারে।’
‘প্রত্যেক ঘরেই অ্যাটাচড বাথ আছে। যেকোনো একটায় গিয়ে তুমি স্নান করে নিতে পার। সত্যিই আজ গরমটা বিশ্রী রকমের।’
‘থ্যাঙ্ক ইয়ু স্যার।’
আধঘণ্টা পর দোতলার বারান্দা—ছাদে রাহুল ও অর্জুন বসল বিয়ার নিয়ে। রাধিকার হাতে টোম্যাটো জুস।
‘রাহুল তোমাকে কেন ডেকে এনেছি সেটা এইবার বলব—দেখো তুমি আমার অনেক সাহায্য করেছ। মালেশিয়ায় ওয়াটার রিজার্ভার তৈরির কনট্রাক্ট পাওয়ার ব্যাপারটায় তুমি যা…।’
‘অর্জুন আই টুক মাই কমিশন। শুধু শুধু কারুর উপকার আমি করি না।’
‘কাল কাগজে দেখলাম চেতন বড়ুয়া স্টকহলম ওপেনে আগাসির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরেছে। চেতন তো র্যা—রই ছেলে?’
‘হ্যাঁ, হি ইজ অন দ্য বুকস। চার বছর আগে ওকে আমি নিয়েছিলাম। দেখো অর্জুন একটা সময় ছিল, প্লেয়াররা নাম করলে, গ্রাঁপ্রী জিতলে, সিডেড হলে তবেই ডানলপ বা স্ল্যাজেঞ্জার বা স্পলডিং কিংবা নাইকে বা অ্যাডিডাসরা এনডোর্সমেন্ট কনট্রাক্ট নিয়ে এগিয়ে আসত। ওসব এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। এখন এত টুর্নামেন্ট যে কেউ আর হাত গুটিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করে থাকতে পারে না। থাকলে সে একটাও বড়ো প্লেয়ার শেষপর্যন্ত আর পাবে না। এখন হল, কোনো ইয়াং প্লেয়ারের মধ্যে সম্ভাবনা আছে বুঝলেই কনট্রাক্ট করে বেঁধে ফ্যালো। এখন কোটি কোটি টাকা টেনিসে। যেকোনো প্রমিসিং ইয়াং প্লেয়ারের পকেট ভরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট টাকা। চেতনকে আমি তুলে নিয়ে টাকা ঢেলেছি, প্রোমোটার, স্পনসরার জোগাড় করেছি। এখন মনে হচ্ছে খুব ভুল করিনি। ইউ এস ওপেন টাইটেল হোল্ডারের কাছে সিক্স—টু, সিক্স—সেভেন, টু—স্কিস, থ্রি—সিক্স হেরে যাওয়াটা খুব হতাশজনক নয়!”
‘চেতন বড়ুয়ার মতো আর কাউকে পেলে?’
‘ব্যাডমিন্টনে হরিয়ানা থেকে একটি মেয়ের আর গলফে পুনে থেকে একটি ছেলের খবর পেয়েছি। দেখেছি ওদের। কনট্রাক্ট করে নেব। দাবায় তোমার কলকাতার গ্র্যান্ড মাস্টার রজত চ্যাটার্জি আমার ক্লায়েন্ট। গত এক বছর তার পারফরম্যান্স ভালো নয়। চারটে জি এম টুর্নামেন্টে ফিফথের উপর প্লেস পায়নি।’
‘অন্য খেলার দিকে নজর দিচ্ছ না কেন?’
‘অন্য খেলা? সেখানে প্লেয়ার কোথায়? ফুটবলে, হকিতে, সাঁতারে—’ রাহুল তালিকা দিতে শুরু করল।
‘অ্যাথলেটিকসে যাচ্ছ না কেন?’
‘অ্যাথলেটিকস?’ অর্জুন যদি চোর—পুলিশ খেলার কথা বলত তাহলেও নয় রাহুল গুরুত্ব দিত। ‘কি বললে অ্যাথলেটিকস?’
‘হ্যাঁ, যাকে বলে দৌড়।’
‘ধুর। এতে এমনি কোনো টাকা নেই। এখনো অ্যামেচার স্পোর্টস। হ্যাঁ কার্ল লিউইস, এডুইন মোজেস, ড্যালি টমসন, গ্রেগ লুগানিস, বা ফ্লোরেন্স জয়নারের মতো অবিশ্বাস্য কিছু করতে পারলে, তাও যদি ওলিম্পিক গেমসের মতো স্টেজে, দুশো কোটি টিভি ভিউয়ারের সামনে করতে পারে তবেই টাকা। হ্যাঁ, কোটি টাকা আয় সম্ভব তো বটেই। কুড়ি বছর আগে মার্ক স্পিৎস সাতটা গোল্ড না জিতলে, কোনো সাঁতারুর পক্ষে কোটিপতি হওয়া সম্ভব, এটা এখনো কাউকে বোঝাত পারতে না। সোল ওলিম্পিকস থেকে এখন পর্যন্ত এই চার বছরে ফ্লোরেন্স জয়নার চার কোটির ওপর রোজগার করেছে শুধুই কি তার ফ্যান্টাস্টিক পারফরমেন্সের জন্য? তার গ্ল্যামার, তার সেক্স অ্যাপিল, তার ড্রেস ফ্যাশন, প্রেসের সঙ্গে তার কথাবার্তা, এইসবই তাকে বিরাট মার্চেন্ডাইসিং প্রোপোজিশন হিসাবে বানিয়ে তোলে। নয়তো অ্যাথলেটিকস আর সার্কাসে কোনো তফাত নেই।”
অর্জুন অবশ্য সহজে পিছু হঠার লোক নয়। রাহুলের খালি গ্লাসে বিয়ার ঢালতে ঢালতে বলল, ‘মেরি লু রেটন জিমন্যাস্ট ছিল। ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলিস গেমসে মেয়েদের ওভারঅল ইন্ডিভিজুয়াল গোল্ড পেয়েছিল—।’
‘জানি। হ্যাঁ কোটি টাকা রোজগার করেছে। কিন্তু কেন? প্রথম মেয়েটা দেখতে ভালো, সতেরো বছর বয়স, আমেরিকার মেয়ে আর মিডিয়া পাবলিসিটি যা পেয়েছিল কোনো সিনে অ্যাকট্রেস অস্কার জিতেও তা পায়নি। সব থেকে বড়ো কথা, জিমন্যাস্টিকসে কমিউনিস্টদের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে ফ্রি ওয়ার্লডের একটা মেয়ে গোল্ড ছিনিয়ে আনল, ভাবতে পারো অর্জুন কী বিরাট ব্যাপার এটা আমেরিকানদের কাছে? এইরকম একটা কাজ যদি কোনো ভারতীয় মেয়ে করতে পারত তাহলে সেও কোটিপতি, নাকি কোটিপত্নী হতে পারত। তবে মেয়েটা চালাক কিংবা বলা যাক তার এজেন্ট আই এম জি চালাক। চটপট গরম গরম নিউজের মধ্যে থাকতে থাকতেই সে টাকা রোজগার করে সোল গেমসের আগেই রিটায়ার করে ফেলে। মেরি জানত সোলে কমিউনিস্ট দেশের মেয়েরা আসছে তার যশ খ্যাতি গুঁড়িয়ে দেবার জন্য। ১৯৭২—এ স্পিৎস, ১৯৮৪—তে মেরি গ্রেট নিউজ। কিন্তু এখন কে ওদের খবর জানতে চায়?’
.
অর্জুন মাথা নেড়ে স্বীকার করল। ‘কিন্তু তুমি এটা তো মানবে, অলিম্পিকের একটা অকল্পনীয় যোগ্যতা আছে জিনিস বিক্রি করিয়ে দেওয়ার। শুধুমাত্র টিভি কভারেজেই তা হয়।’
