‘জল তো টগবগ করে ফুটছে এখন। ৩৯ ডিগ্রি! ভাবা যায়?’
‘পুলের উপর শেড আছে, জল ঠান্ডা রাখারও ব্যবস্থা আছে।’
‘সত্যি! আহহ, শুনেই পাঁচ ডিগ্রি গরম কমে গেল।’
রাহুল এই বলেই জিপার টেনে জ্যাকেটটার বুক খুলে ফেলল। ভিতরে সবুজ রঙের পোলোনেক স্পোর্টস শার্ট। বুকে সাদা ছাপে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা: আই অ্যাম মেকানিক্যালি ইনক্লাইনড, আই স্ক্রু এনিথিং।’
রাধিকা চোখ সরিয়ে নিয়ে মনে মনে হাসল। লোকটা প্লে বয় টাইপের। তার উপর নির্দেশ রয়েছে, একে খুশি রাখতে হবে। এই ঢিলেঢালা সুদর্শন, চল্লিশের কাছাকাছি বয়সি কোটিপতি লোকটি, রাহুল অরোরা অ্যাসোসিয়েটস নামে বিরাট বিপণন কোম্পানির মালিক। অফিস আছে ভারতের তিনটি শহরে। একটা স্পনসরশিপের ব্যাপার রাহুলকে দিয়ে হাশিল করাতে হবে। অর্জুন এর বেশি তাকে কিছু বলেনি। রাহুলের আর এ এ, সংক্ষেপে র্যা, এখন ভারতের একনম্বর মার্চেন্ডাইসিং সংস্থা। ৩৭ জন নামি লোককে ম্যানেজ করা, প্রোমোট করা, ইন্সিওর করার দায়িত্বে রয়েছে র্যা। এদের মধ্যে আছে টিভি, সিনেমা, ফ্যাশন, সঙ্গীত এমন কী খেলার সুপারস্টাররাও। এশিয়ার কয়েকটা দেশেও সম্প্রতি ব্যবসা পেয়েছে। অত্যন্ত ব্যস্ত লোক। অর্জুনের মতোই অবিবাহিত।
রাহুলের বোম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে অর্জুন টেলিফোনে সাত দিন আগে বলেছিল, ‘একটা বিজনেসের খবর আছে। শুক্রবার কি শনিবার আসতে পারবে কলকাতা? তা হলে রবিবারটা কাটিয়ে সোমবার চলে যেতে পার। জানি জানি খুব ব্যস্ত তুমি, তবে এলে কিন্তু ঠকবে না। একটা অদ্ভুত ধরনের ডীল হতে পারে। এখন সেটা তোমায় বলব না, জানই তো আমি ফোনে এই ধরনের ব্যাপারে কথাবার্তা বলি না। শুক্রবারই তা হলে এসো, বিকেলের ফ্লাইটে, দু—তিন দিনের একটা লং উইকয়েন্ড কাটান যাবে।’
রাহুল রাজি হয়ে গেছিল। তার ধারণা হয়, অর্জুন বোধহয় পেশাদারি সার্কিটে নাম এবং টাকা করার ইচ্ছা হয়েছে এমন কোনো গজল গাইয়ে বা ভরতনাট্যম নাচিয়ের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিতে চায়। হয়তো শনিবার কোনো অনুষ্ঠানে গান গাইবে বা নাচবে, সেটা শুনতে বা দেখতে যেতে হবে। ঘাড় নাড়তে হবে, মুখে ‘আহা আহা’ বলতে হবে তারপর তার এজেন্ট হবার জন্য রাজি হতে হবে। খদ্দের ধরার জন্য অন্তত সাত আটটা এজেন্সির লোক এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি ফার্ম, কনস্ট্রাকসান ফার্ম ছাড়াও ডুয়ার্সে অর্জুনের চা—বাগান আছে, ঘাটশিলায় মাইকার খনি আছে, বোম্বাইয়ে দুটি হোটেলের এক—তৃতীয়াংশ শেয়ার তারই। কিন্তু ললিত কলা, ক্ল্যাসিকাল গান ও নাচ সম্পর্কেও সে সমঝদার। হয়তো নতুন কোনো প্রতিভার দেখা পেয়ে তাকে ডেকে পাঠিয়েছে।
মোটরে রাহুল জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আপনমনে সিগারেট টেনে যাচ্ছে। একসময় বলল, ‘দশ বছর আগেও যা দেখেছিলাম আজও তাই। শুধু কিছু বাড়ি তৈরি হয়েছে আর প্রাইভেট বাসের সংখ্যা বেড়েছে।’
রাধিকা একবার বাইরে তাকিয়ে হেসে শুধু মাথা নাড়ল। শুধু চাকরির কারণেই তার মাথা নাড়া নয়, রাহুলের কথায় সত্যতাও আছে।
‘কলকাতার বয়স এখন তিনশো দুই, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার বাপ—ঠাকুরদা এখানেই ব্যবসা করেছে, আমি কলেজ জীবন পর্যন্ত এখানে ছিলাম। নকশাল পিরিয়াডে কানাডা চলে যাই। তখন থেকে আজ পর্যন্ত একটুও উন্নতি হয়নি এই শহরটার শুধু মেট্রো রেল হওয়া ছাড়া।’
‘আপনি আর মি. হালদার তো একসঙ্গে কলেজে পড়েছেন?’
‘হ্যাঁ। অর্জুন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। পৈতৃক চা—বাগান, বাবার ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি ফার্ম, ল্যান্ড স্পেকুলেশন বিজনেস, বড়োলোকই ছিল। এখন তো আরও রিচ। আমাকে খুব সাহায্য করেছে। শুধু পড়াশুনোতেই নয়, এখন যে ব্যাবসা করছি তাতেও। ও আমার সব থেকে পুরোনো বন্ধু, ও আমার স্বভাব ভালোই জানে।’
কথা বলতে বলতে রাহুল আড়চোখে রাধিকার দিকে তাকাচ্ছিল। এবং কেন তাকাচ্ছে সেটা বুঝতে পেরে রাধিকা শরীরটা সামান্য এলিয়ে দু—হাত দিয়ে চুল ঠিক করায় ব্যস্ত হল। আবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নিজের ভাবনায় ডুবে যাবার আগে রাহুলের ঠোঁট চাপা হাসিতে মুচড়ে গেল।
আলিপুরে অর্জুনের বাড়িতে তারা পৌঁছল প্রায় সাড়ে আটটায়। উঁচু পাঁচিল ঘেরা বাড়ির গেট দিয়ে সোজা গিয়েই পোর্টিকো, বাঁ দিকে সবুজ মখমলের মতো ঘাসের জমি। সেখানে বেতের চেয়ার ও টেবল পাতা। কিন্তু কোনো লোক নেই।
দোতলায় অর্জুন অপেক্ষা করছিল। রাহুল তার ক্যারি ব্যাগটা হাত বাড়ানো চাকরের হাতে না দিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে দোতলায় উঠে এল।
‘প্লেন ডিলেড?’ সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল অর্জুন। সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরা, পাট করে আঁচড়ানো চুল। স্নান এইমাত্র বোধহয় সারা হয়েছে।
‘ডিলেড তো বটেই! আগে স্নান তারপর কথা।’
‘ঘরে গিয়ে আগে পালটে নাও, লুঙ্গি রেখে দিয়েছি।’
‘আহহ এই হল অর্জুন!’ রাহুল মুখ ঘুরিয়ে পাশে দাঁড়ান রাধিকাকে খবরটা দিল। ‘আমার ফেভারিট জিনিসগুলোর কথা ঠিক জানে।’
‘ছাদের পুলের ধারে ককটেল লাউঞ্জ। চিলড বিয়ার নিয়ে জলে গলা ডুবিয়ে থাকো। আধঘণ্টা পর দেখা হবে।’
অর্জুন হাত তুলে বারান্দার শেষপ্রান্তের ঘরটা রাহুলকে দেখাল। রাধিকার দিকে একবার তাকিয়ে শিস দিতে হিতে রাহুল ঘরের উদ্দেশ্যে এগোল।
