‘আপনাকে তো বলেছি, এসব চিন্তা করবেন না। যদি তুলেই দিত, তা হলে দশ—বারো বছর আগেই দিত। আমি যতদিন আছি আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’
‘পেটের ছেলেও এত করে না, তুমি যা করছ আমার জন্য।’
ঘরের মধ্যে লম্বা পর্দাটা আর নেই। অনন্ত যখনই আসে দরজার কাছে চেয়ারটায় বসে। ছবিটা একই জায়গায়, একই রকম উজ্জ্বল। শুধু ফ্রেমের রংটা ধূসর হয়েছে।
‘এখনও আপনি আগের মতোই ভালোবাসেন?’
চোখ পিট পিট করলেন মিনতি কর। আরও শীর্ণ, চোয়ালের চামড়া শিথিল, চোখের কোণে ভাঁজ, পিঠটা একটু বাঁকা কিন্তু হাসিটা বাচ্চচা মেয়ের মতো।
‘এই নিয়ে কতবার জিজ্ঞাসা করলে বলো তো?’
‘চারশো তিয়াত্তরবার।’
‘ঠাট্টা নয়, ঠাট্টা নয়…তোমার ভীষণ কৌতূহল ছবিটা সম্পর্কে,…নেবে ওটা?’
অনন্তর বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠেছিল। আচমকা তার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল কথাটা, ‘নেব।’
‘আমি মরে গেলে, তার আগে নয়।’
মিনতি কর চা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রসঙ্গটা বন্ধ হয়ে যায়।
ভোররাতে অনন্তের চোখে ঘুম নেমে আসে।
তিনদিন পর সন্ধ্যায় অলুর সঙ্গে একটি যুবক এল। উঠোনে দাঁড়িয়ে অনন্ত তখন খালি গায়ে ভিজে গামছা রগড়াচ্ছিল। যুবকটিকে দেখামাত্র তার মনে পড়ল রমেনকে। দাঁড়ানো, তাকানো ছাড়াও অসম্ভব মিল রয়েছে শরীরের গড়নে। আপনা থেকেই তার দৃষ্টি অলুর গলায় পড়ল। গৌরীর স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে এলেও সবুজ পাথরের মালাটা জ্বলজ্বলে রয়েছে। এত বছরে একবারও ওর সঙ্গে দেখা হল না।
‘শান্তনু…এই হচ্ছে আমার দাদা।’
হাত তুলে নমস্কার করল শান্তনু। অনন্ত কোনোরকমে হাতের মুঠি দুটো বুকের কাছে তুলল। কোনো কথা বলল না।
‘তোমার সঙ্গে কথা বলবে বলে এসেছে।’
‘কী কথা।’
নিজের গম্ভীর, নিস্পৃহ স্বরে অনন্ত অবাক। তার যে কোনো আগ্রহ নেই সেটা ওরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে।
‘বিয়ের কথা বলতে এসেছি।’
‘মা—র সঙ্গে।’
শান্তনুকে নিয়ে অলু মা—র ঘরে ঢুকল। একটু পরেই অনন্ত নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। পার্কে একটা রাজনৈতিক সভা চলছিল, সভার পিছনে বসে বক্তৃতা শুনতে শুনতে তার মনে হল পনেরো বছর আগে সে ঠিক এই কথাগুলিই শুনেছে এই পার্কে। লোকগুলোর বক্তৃতার স্বর এবং ভঙ্গি একটুও বদলায়নি। শ্রোতারাও পনেরো বছর আগের মতোই হাততালি দিল।
অলু বিয়েতে সাক্ষী হবার জন্য অনন্তকে বলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সে রাজি হয়ে যায়। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করছে কারোর মতামতকে গ্রাহ্য না করে। সুতরাং ভবিষ্যতে অলুর কিছু বলার মুখ থাকবে না।
শীলার কাছ থেকে অনন্ত শুনল, বিয়ের পর অলু শ্বশুরবাড়ি যাবে না। শান্তনুর মা, বউদি আর দাদার আপত্তি আছে এই বিয়েতে।
‘নগদ, গয়না, আলমারি, খাট এইসব আশা করেছিল।’
‘ছেলের তো কোনো রোজগারই নেই।’
‘তা হলেই বা বড়ো বংশ, নিজেদের বাড়ি, বড়ো বড়ো নামি আত্মীয়স্বজন…ওরা ঠিক করেছে ঘর ভাড়া নিয়ে আলাদা থাকবে।’
‘তার মানে অলুকেই সব খরচ টানতে হবে। এরকম বিয়ের কী যে দরকার…যাক গে ওরা যা ভালো বোঝে করুক।’
‘তুই সেদিন আর শার্ট পরিস না, পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে যাস।’
অনন্ত পাঞ্জাবি পরেই রেজিস্ট্রারের অফিসে হাজির হয়েছিল অলুর সঙ্গে। সে বাসে ওঠার কথা বলেছিল, অলু হাত তুলে ট্যাক্সি থামিয়ে বলেছিল ‘আজ আর বাসে নয়।’ ট্যাক্সি থেকে নামার পরই তার মনে পড়ে জীবনে এই দ্বিতীয়বার সে ট্যাক্সিতে উঠল! খুব আশ্চর্য হয়ে সে মুখ ফিরিয়ে গাড়িটাকে বারবার দেখে চিনে রাখার চেষ্টা করে। প্রভিডেন্ড ফান্ড তোলার জন্য প্রথম ট্যাক্সি করে গেছল।
শান্তনু আর তার দুই বন্ধু তখনও আসেনি। অলু অধৈর্য হয়ে কয়েকবার তার হাতঘড়ি দেখল।
‘ক—টায় আসবে বলেছে?’
‘একটায়।’
দেওয়াল ঘড়িতে তখন একটা—দশ। রেজিস্ট্রারের বন্ধ ঘরের মধ্যে দু—জন নারী—পুরুষ। তারা বিয়ের ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছে।
‘বোধহয় ট্র্যাফিক জ্যামে পড়েছে।’
আরও দশ মিনিট পর শান্তনু এল। ঝোলা কাঁধে চাপদাড়িওলা সঙ্গে একজন। অলুকে দেখে পরিচিতের হাসি হাসল।
‘আরে প্রশান্তর জন্য বারোটা থেকে অপেক্ষা করে করে…দাদা ভালো আছেন…শেষকালে আর দাঁড়ালাম না। অরুণ ইনি অলুর দাদা, আর এ হচ্ছে আমার বাল্যবন্ধু অরুণ সেন।’
আধ ঘণ্টার মধ্যেই বিয়ে শেষ করে, রেজিস্ট্রারের অফিস থেকে ওরা বেরিয়ে পড়েছিল। অলুর হাতে গোলাপের স্তবক, অরুণের দেওয়া। বুকের কাছে রেখে মাথা নামিয়ে মাঝেমাঝে গন্ধ শুঁকছিল। শীলা একটা সিঁদুরের কৌটো অনন্তকে দিয়ে বলেছিল, ‘বিয়ের পর অলুর সিঁথিতে শান্তনু যেন দেয়।’
অনন্ত ভুলে গেছল। রেজিস্ট্রারই বললেন, ‘সিঁদুর এনেছেন?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই যে।’
অনন্ত পকেট থেকে বার করে কৌটোটা। শান্তনু নস্যির টিপের মতো সিঁদুর তুলে অলুর সিঁথিতে মাখিয়ে দেয়। অলুর চোখদুটো মুদে এল, চামড়া ভেদ করে আলতো একটা আভা মুখের উপর ছড়িয়ে পড়ল। নতুন সিল্কের শাড়ি পরেছে, হালকা গোলাপি জমিতে, রজনীগন্ধার ঝাড় উঠেছে পায়ের কাছ থেকে হাঁটু পর্যন্ত। আজ পরবে বলেই কিনেছে।
অনন্ত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ভাবল, অলুর যে এত রূপ তা তো কখনো জানতুম না।
অরুণ হঠাৎ উলু দিয়ে উঠল। অনন্ত সভয়ে তাকাল রেজিস্ট্রারের দিকে, তিনি হাসছেন।
‘এ আর কী, টেপরেকর্ডার এনে সানাইও বাজায়।’
