আবার দু—চোখ বেয়ে জল নামল মালবিকার। গাল থেকে চিবুক পর্যন্ত জলের ধারা। শুধু একবার ফুঁপিয়ে উঠেই মুখটা কঠিন হয়ে গেল। সন্তর্পণে সে সমীরণের দুটি হাত মাথার দিকে তুলে নিয়ে শাড়ির একটা টুকরো দিয়ে খাটের রেলিংয়ে বাঁধল। পা দুটি জড়ো করে শাড়ির অন্য টুকরোটা দিয়ে বেঁধে সেটা রেলিংয়ে বাঁধল।
সমীরণ একটা ন্যাকড়ার পুতুলের মতো চিত হয়ে গভীর ঘুমে অচেতন। সে জানতেও পারল না কী ভয়ংকর অবস্থার দিকে সে চলেছে। মালবিকা পাশ—বালিশটা ওর মুখের ওপর রেখে বুকের উপর বসল সমীরণের দুই পাঁজরের পাশে দুই ঊরু রেখে এবং বালিশটা মুখে চেপে ধরল।
ছটফটিয়ে উঠল সমীরণ। হাত—পা বাঁধা। টানাটানি করার সঙ্গে তলপেটটা তোলানামা করতে লাগল। বালিশটার তলায় গোঁ গোঁ একটা শব্দ হচ্ছে। মুখটা ডাইনে বাঁয়ে নাড়াবার চেষ্টা চলছে।
একটা লোক মারা যাচ্ছে। মালবিকা অবাক হয়ে দেখছে। একটা লোককে সে নিজের হাতে মেরে ফেলছে। কিন্তু কেন?
মালবিকার হাতের চাপ আলগা হয়ে গেল।
কিন্তু কেন সে মারছে!
মালবিকা বালিশটা তুলে নিল। সে তো ঠিক করেছিল এই শাড়িটা গলায় বেঁধে পাখা থেকে ঝুলে পড়বে। তা হলে সে সিদ্ধান্তটা বদলাল কেন?
সে তো নিজেকেই শাস্তি দেবে বলে মরতে চেয়েছিল।
‘আমায় খুন করছ মালবিকা?’ ধীর শান্ত স্বরে সমীরণ বলল, যেটা প্রশ্ন নয়, অনেকটা বিবৃতি দেবার ধরন তার স্বরে।
বুকের উপর থেকে মালবিকা নামল। জানলায় গিয়ে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল। আবছা প্রভাতী আলোয়, ঠান্ডা মনোরম বাতাসে খুব সুন্দর একটা ভোর ফুটে উঠছে।
.
দু—মিনিট পর সদর দরজার খিল খুলে মালবিকা বেরিয়ে এল। দু—পাশে একবার তাকিয়ে দ্রুত পায়ে সে নিজেকে শাস্তি দেবার জন্য বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
.
নির্দিষ্ট দিনেই মিহির ও মালবিকার বিয়ে হয়েছে।
স্বর্ণকুমারী
এক
উনিশশো বিরানব্বই এর ২৫ মে, শুক্রবার বোম্বাই—আহমেদাবাদ—লখনৌ—পাটনা— কলকাতা, উড়াল নম্বর ২৯৬—এর বোয়িং ৭৩৭ দমদম টারম্যাকে চাকা ছোঁয়াল ছটা পঞ্চান্নয়। ছোঁয়াবার কথা পাঁচটা পঁচিশে।
বিমান থেকে বেরিয়েই সিঁড়ির মাথায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের মুখের চামড়া সিরসির করে উঠছে গরমে। বিমান নামার আগেই এয়ার হোস্টেস জানিয়ে দিয়েছিল, বাইরের তাপমান ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বিমান থেকে যাত্রীরা হেঁটে অ্যারাইভাল লাউঞ্জে পৌঁছল। যাদের লাগেজ সংগ্রহ করা দরকার তারা কনভেয়রের কাছে অপেক্ষা করতে লাগল। যাদের সেই প্রয়োজন নেই তারা বেরিয়ে গেল। তাদের সঙ্গেই বেরিয়ে এল মাঝারি উচ্চচতার একটি লোক। তার কাঁধে সবুজ ক্যারি ব্যাগ, চোখে গাঢ়, সান গ্লাস, ধূসর রঙের জ্যাকেট, গোড়ালির ইঞ্চি চারেক উপরে ট্রাউজার্স, লাল মোজা এবং মেরুন স্পোর্টস শ্যু। রেশমের মতো হালকা পাতলা একমাথা অবিন্যস্ত কালো চুলের কিছুটা কপালের উপর ঝুঁকে পড়েছে। মুখের তামাটে চামড়ার নীচে পেশির শক্ত ভাঁজ। চলনে মাথা ও কাঁধ সামনে ঈষৎ ঝোঁকানো, পদক্ষেপে ব্যস্ততা এবং ব্যক্তিত্বের সমন্বয়।
লোকটি চারদিকে তাকিয়ে অবশেষে এনকোয়ারি কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে ডানহিল সিগারেটের প্যাকেট বের করল।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে লোকটিকে লক্ষ্য করছিল এক তরুণী। দীর্ঘাঙ্গী সুঠাম তন্বী গড়ন। স্লিভলেস খয়েরি ব্লাউজের নীচের প্রান্ত ও শাড়ির কোমরের প্রান্তের মধ্যে অন্তত একফুট অনাবৃত রয়েছে মেদহীন কিন্তু পেলব মধ্যদেশ। চোয়াল দুটি ছড়ান, ওষ্ঠদুটি ছোটো এবং পুষ্ট, বক্ষ দুটি উন্নত এবং দৃঢ়। চুল পুরুষদের মতোই প্রায় ছোটো করে কাটা, একপাশে সিঁথি। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম, গোলাকার চোখের মণিতে পিঙ্গলের আভাস। তার কাঁধ থেকে চামড়ার পটিতে ঝোলান ব্যাগটি প্রায় নিতম্বের কাছে নেমে এসেছে। খয়েরি রেশমের শাড়ি দেহের সঙ্গে লেপটে থাকায় তার নিতম্বের বতুলতা ও দৃঢ় বদ্ধতা মনোরমভাবে প্রকট। ডানহাতে একটি সোনালি ঘড়ি এবং দুই কানের লতিতে বিন্দুর মতো দুটি মুক্তো ছাড়া দেহে কোনো আভরণ নেই।
তরুণীটি তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে লক্ষ করছিল লোকটিকে। এইবার এগিয়ে এল।
‘আপনি মি. অরোরা?’
লোকটি চমকাল না। শুধু শরীরটা মুচড়ে পাশ ফিরল। ‘ইয়েস… রাহুল অরোরা। আপনি বোধহয় অর্জুন হালদারের…।’
তরুণীর চাহনিতে সমর্থন ফুটে উঠল। হালকা গোলাপি লিপস্টিক মাখা ঠোঁট ছড়িয়ে, গালে টোল ফেলে বলল, ‘প্রাইভেট সেক্রেটারি, রাধিকা পাইন।’
‘অর্জুন বলেছিল রিসিভ করার জন্য একজন থাকবে, কিন্তু সে যে এমন মনোরম একজন হবে ভাবতে পারিনি।’ রাহুল সিগারেট ধরাতে ধরাতে কালো কাচের মধ্য দিয়ে রাধিকার দেহ জরিপ করে নিল। রাধিকার অবশ্য অনুমান করে নিতে মুহূর্তেরও দেরি হল না, তার বস—এর এই বন্ধুটি সিগারেট ধরাতে এত সময় নিচ্ছে কেন!
‘চলুন’। রাহুল প্রথম ধোঁয়াটি ছেড়ে বলল। ‘ফ্লাইট দেড় ঘণ্টা লেট, তার ওপর অসহ্য এই ভ্যাপসা গরম। এই সময় কেউ কলকাতায় আসে। পৌঁছেই গলা পর্যন্ত ডুবে থাকব বাথটাবে।’
‘মি. হালদারের ছাদে একটা মিনি পুল আছে।’ এয়ারপোর্ট বাড়িটার বাইরে এসে ওরা গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে। অর্জুন হালদারের সাদা মার্সিডিজ ওদের দেখতে পেয়ে পার্কিং লট থেকে এগিয়ে আসছে।
