রিসিভার রেখে সমীরণ ঘাড় নামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। অল্প টলছে। দু—পা এগিয়ে মালবিকার থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করে দিল।
‘কাল তো কল্যাণী যাওয়া হবে না।’
‘জানি।’
‘এখনও রাত হয়নি। তুমি বাড়ি চলে যাও।’ স্বর বিকৃত জড়িয়ে যাওয়ার জন্য।
‘কী বলছ তুমি!’ মালবিকা উঠে দাঁড়াল।
‘ঠিকই বলছি। কাল বনধ। পরশু ভোরেই বউ ছেলে এসে যাবে। তখন কী হবে? য়্যা কী হবে? বড়ো খচ্চচর মাগি, আমাকে ছাড়বেও না আবার ছাড়ারও ভয় দেখায়।’
‘আমরা খুব ভোরে কল্যাণী চলে যাব।’ মরিয়া হয়ে মালবিকা বলল, ‘ওরা আসার আগেই চলে যাব।’
সমীরণ মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘হয় না। ভোরে আমার ঘুম ভাঙে না।’
‘আমি ভাঙিয়ে দোব।’
‘ধ্যাততেরি। জ্বরটা আবার বাড়ছে। …তুমিও তো দেখছি আর একটা শিঞ্জিনী।’
ফোন বেজে উঠল। সমীরণ চমকে উঠে মাথা ঝাঁকাল। ‘আবার কেন?’ বলে রিসিভার তুলল।
‘হ্যালো,…হ্যাঁ সমীরণ মিত্তির বলছি, আপনি কে …কী বললেন? জোরে বলুন…সুধাংশু গাঙ্গুলি? আরে মেসোমশাই! ….য়্যাঁ মালবিকাকে পাওয়া যাচ্ছে না? হারিয়ে গেছে?…অ, আপনার বাড়ি থেকে। তা আমাকে ফোন করছেন কেন, আমি কী ওকে হরণ করে নিয়ে এসেছি?’ সমীরণ আর দাঁড়াতে পারছে না, খাটে বসল। ‘মিহির বলল? শুয়োরের বাচ্চচার তো গাধার মতো গলা। ও বলল আর অমনি আপনি আমাকে ফোন করলেন! মেসোমশাই, আপনিও একটা শুয়োরের বাচ্চচা। মালবিকা কচিখুকি নয় যে বলামাত্র সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসবে। আপনি বিনা প্রমাণেই আমাকে ক্রিমিনাল বানিয়ে দিলেন? এটা কী কোনো ভদ্দরলোকের, শিক্ষিত লোকের পক্ষে সম্ভব না শুয়োরের বাচ্চচার পক্ষে সম্ভব? বলুন, আপনিই? বিচার করুন। …আরে বাবা না না, মালবিকা অবলা বালিকা নয়, খুব বুদ্ধি ধরে। …আমি ওকে পটাব কী ওই আমায় পটিয়ে দেবে। আপনি যে সন্দেহটা করছেন তার কোনো কি যুক্তি আছে? ওকে ভাগিয়ে এনে আমি করবটা কী? শুধু যৌবন দিয়ে তো চিরকাল চলে না! দেখুন পাড়ার কোনো ছোকরার সঙ্গে সটকান দিয়েছে…আরে দূর, গানফান ওর দ্বারা হবে না। ফুটপাথে যেসব জলসা হয়, হিন্দি ফিল্মি গানার সঙ্গে শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে মাইক হাতে নিয়ে, ওইসব গানেই ও নাম করতে পারবে। আপনি বরং পুলিশেই খবর দিন। …কী বললেন পুলিশ এখন এসব কেস নেবে না? …বাবরি মসজিদ? আরে মেসোমশাই ওই বাবরিই তো আপসেট করে দিল। কালকের বাংলা বনধটাও তা হলে হত না। কাল কাঁচরাপাড়ায় গান ছিল, কল্যাণী যাবার কথা ছিল। …না না বিশ্বাস করুন, লেখাপড়া করেনি। গানের ‘গ’ জানে না, আমি ওকে নিয়ে কী করব…খারাপ কথা আপনাকে বলেছি, আমাকে ক্ষমা করবেন, আপনার পায়ে ধরে মাপ চেয়ে নোব। মাসিমা ভালো—’
হাত বাড়িয়ে রিসিভার রেখে দিয়ে আপন মনে বলল, ‘শালা কেটে দিল।’ ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে টলে পড়ছিল। মালবিকার কাঁধ ধরে সামলে ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে গেল। যদি সে মালবিকার দিকে তাকাত তা হলে দেখতে পেত, অপমানে লজ্জায় আর নিজের নির্বুদ্ধিতা বুঝতে পারা কালো একটা নিথর মুখ। চোখের পলক পড়ছে না শুধু দু—চোখ বেয়ে জল ঝরছে।
যুবকটি দু—বোতল মদ নিয়ে আসতেই সমীরণ বলল, ‘খোল। দুটো গ্লাস আন।’
‘না না সমীরণদা আমি খাব না।’
‘যা বলছি কর। গ্লাস আন, রান্নাঘরে দেখ গিয়ে।’
আধঘণ্টা পর সমীরণ শোবার ঘরে এল। পাথর হয়ে গেছে তার শরীর। খাড়া অবস্থায় দাঁড়াল মালবিকার সামনে। তার চাহনিতে মৃত অভিব্যক্তি।
‘রান্না হয়েছে?’
মালবিকা শুধু তাকিয়ে রইল।
‘এটা কী? হাটাও, আমি শোব।’ সমীরণ শাড়িটা মেঝেয় ফেলে দিল।
‘নীচের দরজায় খিল দিয়ে এসো। করসেবকরা ঢুকে পড়ে যদি?…কথা কানে গেল না। লাথি খাবি?’
হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল মালবিকা। দাঁড়িয়ে উঠে দু—হাতে জড়িয়ে ধরল সমীরণকে।
‘আমি সত্যিই তোমায় ভালোবাসি, আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার কোরো না, আমার কষ্ট লাগছে। আমি তোমায় সত্যিই ভালোবাসি, ভালোবাসি। সমীরণ তুমি আমার, আমার।’
‘কে তোর? সমীরণ মিত্তির? আমি শালা কারুর নই, শুধু আমার ছেলের, শান্তর। ওকে চিনিস? সায়ন্তন মিত্তির, আমার দেওয়া নাম। তুই শালি কে? কী বললুম যেন, হ্যাঁ, সদর দরজায় খিল দিয়ায়। কাল বাড়ি চলে যাবি, বনধ তো কী হয়েছে, হেঁটে চলে যাবি।’
‘সমীরণ তুমি আমায় এইভাবে বললে? তোমার জন্য আমি কী কাজ করেছি তা কি তুমি জানো?’ মালবিকা হিংস্র চাপা গলায় বলল। ‘নিজেকে আজ সর্বনাশের মধ্যে টেনে এনেছি তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্য।’
কথাগুলো বোধহয় সমীরণের কানে ঢুকল না। বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে উঠে কোনোক্রমে বালিশটা মাথায় লাগিয়ে চিত হয়ে শুল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।
মালবিকা একতলার দরজায় খিল দিয়ে এল। বসার ঘরের আলো নেভাল। বারান্দার আলো জ্বেলে রেখে শোবার ঘরের আলো নেভাল। জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে রাস্তার আলো ঘরে আসছে একটা লম্বা সাদা লাঠির মতো। সিঁড়ির আলো পড়ছে ঘরের দরজার কাছে। একটা আবছা অন্ধকার ঘরটায়। মালবিকা খাটের কোণে পা ঝুলিয়ে বসে। একদৃষ্টে সে তাকিয়ে আছে সমীরণের মুখের দিকে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। ভারী নিশ্বাসে বুকটা ওঠানামা করছে।
ভোর রাতে মালবিকা খাট থেকে নামল। আইবুড়ো ভাতের শাড়িটা নিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে বাঁটিতে দু—টুকরো করল। আবার ঘরে ফিরে এল। কিছুক্ষণ সমীরণের নিথর শরীরটার দিকে তাকিয়ে রইল। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক। ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেছে।
