মালবিকা খাটে বসল। ঘরটাকে এখন বড়ো মনে হচ্ছে, ফাঁকা লাগছে। কাপড়ের মোড়ক আর হাতব্যাগটা পাশে রাখল। ঘরে চোখ বুলিয়ে তার মনে হল সমীরণ পাকাপাকি এখানে থাকবে না। হঠাৎ প্রয়োজনে এক রাত বা এক দিন থেকে যেতে হলে, থাকার কাজ চালানোর মতো ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। বসার ঘরের কোনো জিনিস বোধহয় সরানো হয়নি।
সমীরণ ঘরে ঢুকল। ব্যগ্র চোখে মালবিকা প্রথমেই বলল, ‘আমি চলে এসেছি, একেবারে।’
বিব্রত ভাবটা চট করে লুকিয়ে ফেলল সমীরণ। চিন্তিত স্বরে বলল, ‘না এলেই ভালো করতে। হাঙ্গামা বাধার ভয় আছে। শুনছি কাল বাংলা বনধ, কংগ্রেস বামফ্রন্ট দু—দলই ডেকেছে। ওরা আজই কিনা পার্ক সার্কাস গেল। …মুসলমান পাড়া, পাশেই বস্তি।’
অবশ হয়ে আসছে মালবিকার হাত—পা। ঠোঁট দুটো টেনে যে একটু হাসির ভাব ফোটাবে সে ক্ষমতাও যেন নেই। ‘তা হলে…তা হলে কি—’
‘তুমি এসেছ যখন থাকো। আমার সকাল থেকেই কেমন জ্বর জ্বর ভাব।’ সমীরণ এগিয়ে এসে মালবিকার দুই কাঁধ ধরে ঝুঁকে পড়ল চুমু খাবার জন্য। মুখে মদের গন্ধ। মালবিকা আকুলভাবে দু—হাতে গলা জড়িয়ে সমীরণের ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ঘষতে ঘষতে বলল, ‘আমাকে তুমি ছেড়ে যেয়ো না।…সমীরণ আমার সমীরণ। মরে যাব সমীরণ—’, সে কামড়ে ধরল সমীরণের দুই ঠোঁট। মুখের মধ্যে নিয়ে চুষতে লাগল।
‘উহহ।’ মালবিকাকে ধাক্কা দিয়ে সমীরণ পিছিয়ে গিয়ে বিরক্ত চোখে তাকাল। কর্কশ স্বরে বলল, ‘থাক এখন। পাশের ঘরে লোক রয়েছে।’ ঘর থেকে সে বেরিয়ে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে একটি লোক দুড়দুড়িয়ে উঠে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘সমীরণদা, কাল বাংলা বনধ, বাজার—টাজার করে রাখুন। দিন আমায় টাকা দিন।’
‘বাজার তো আনবি, রাঁধবে কে?’
‘সে হয়ে যাবে, আমি এসে রেঁধে দোব।’
‘তোকে আর আসতে হবে না, লোক আছে আমার। চাল, ডাল, মাছ, আনাজ সবই ফ্রিজে আছে। একটা দিন হয়ে যাবে তুই বরং—’
শোবার ঘরে এল সমীরণ। পিছনে এক যুবক। মালবিকা খাটে হেলান দিয়ে একদৃষ্টে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। সমীরণ ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ফিস ফিস করে বলল, ‘মাল প্রায় শেষ, আজ রাতের মতো শুধু আছে। তুই চট করে বড়ো দুটো বোতল এনে দে। দেরি করিসনি, দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। কী খাই জানিস তো?’
সে পকেট থেকে পার্স বার করে তিনটে একশো টাকার নোট যুবকটির হাতে দিয়ে আবার বসার ঘরে ফিরে গেল।
‘গৌরী, তোমরা আর দেরি কোরো না। বাচ্চচা মেয়ে সঙ্গে রয়েছে, শুনলে তো কাল বাংলা বনধ…সুবোধের কাছেই শেখো। কীর্তনটা ও ভালো জানে, যত্ন করে শেখায়ও।’
মালবিকা বসার ঘর থেকে সমীরণের কথা শুনতে পাচ্ছে। একটু আগের কর্কশ গলাটা বদলে গেছে। স্নেহে ভরা ঘর। কাঁধে জোরেই ধাক্কাটা দিয়েছে সমীরণ। ধাক্কাটার মধ্য দিয়ে বিরক্তি অনিচ্ছুক ভাব বেরিয়ে এসেছে। অভিমানে ছেয়ে যাচ্ছে মালবিকা।
সমীরণ শোবার ঘরে এল।
‘সবাইকে বিদেয় করা গেছে।’ দেয়াল আলমারি থেকে একটা বড়োমাপের বোতল বার করে সে চোখের সামনে ধরে দেখল কতটা আর বাকি আছে। একটা গ্লাসও বার করল। মালবিকা দেখতে পায়নি এগুলো আলমারিতেই ছিল। গ্লাসই রাখার মতো শক্ত জায়গা ঘরে নেই।
‘ধরো এটা।’ গ্লাসটা বাড়িয়ে দিতেই মালবিকা ধরল। ঢাকনা খুলে বোতলটা উপুড় করে ধরল গ্লাসে। আধ গ্লাস ভরল। ঢাকনাটা লাগিয়ে সমীরণ গ্লাসটা হাতে নিল।
‘জল এনে দোব।’
‘ধেত জল।’ বড়ো বড়ো দুটো ঢোঁকে সমীরণ অর্ধেকটা পেটে চালান করে চোখ বন্ধ করল। মুখটা বিকৃত হয়ে রয়েছে। মুখে রক্ত ছুটে আসায় চামড়ার রং বদলে যাচ্ছে।
‘জ্বরটা বোধহয় আবার বাড়বে।’
‘তা হলে খেয়ো না।’ মালবিকা গ্লাসটা নেবার জন্য হাত বাড়াল। সমীরণ হাত সরিয়ে নিয়ে আবার দুটি ঢোঁকে গ্লাস খালি করে দিল। খালি বোতল আর গ্লাস আলমারিতে রেখে সে খাটে বসল। পাশ বালিশটা টেনে কোলে তুলে নিয়ে, ঝুঁকে মালবিকার মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। একটু একটু করে ঝিমিয়ে আসছে তার চাহনি।
মালবিকা যা আশা করেছিল তা ঘটল না। সে ভেবেছিল সমীরণ খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠবে। দু—হাতে বুকে জড়িয়ে ধরবে, তাকে নিয়ে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়বে। আদরে আদরে বিধ্বস্ত করে দেবে। কিন্তু কোথায় কী? তার বাবার মতোই একটা মাতাল। ছাপোষা গেরস্ত। এর মধ্যে তার প্রেমিক সমীরণ কোথায়?
ফোন বেজে উঠল। মালবিকা উঠে ফোন ধরতে যেতেই হাত তুলল সমীরণ। ‘আমি ধরছি। ফোন তুমি ধরবে না।’
খাট থেকে নেমেই টলে গেল। সামলে নিয়ে সমীরণ রিসিভার তুলল।
‘হ্যালো, কে শিঞ্জিনী? কোথা থেকে ফোন করছ…অ। ওখানে অবস্থা কেমন? য়্যা গোলমাল হবার ভয় রয়েছে? শান্ত কোথায়? শিগগিরি ওকে ডেকে আনো। না না একতলার ফ্ল্যাটেও যাবে না, কোথাও যাবে না, ঘরে বসে থাকবে, বারান্দায় বেরোবে না।… হ্যাঁ হ্যাঁ, কিন্তু একতলার লোকেরা চলে যাবে কী করে, কাল তো বাংলা বনধ, গাড়ি চলবে না।…তুমিই বা এখানে আসবে কী করে?…ফ্ল্যাট কেনার সময় আমি কি জানতুম বাবরি মসজিদটাকে ভেঙে দেওয়া হবে? এখন আমাকে ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছ কেন, ইডিয়ট। তুমিই তো জেদ ধরেছিলে…গালাগাল আবার কী, এখনও তো মুখ খুলিনি। কিছু যদি ঘটে যায়, শান্তর যদি কিছু হয় তা হলে তোমাকে লাথি মেরে তাড়াব। সবই তো হাতিয়ে নিয়েছ। ছেলেকে আমি ছাড়ব না…আচ্ছা আচ্ছা দেখা যাবে। আমি মাগিবাজি করি কী ঠাকুরপুজো করি তাতে তোমার বাপের কী? যা বললুম, এখনই ওকে ঘরে নিয়ে এসো। ছটফটে ছেলে কখন রাস্তায় বেরিয়ে যাবে বলা যায় না। চোখে চোখে রাখবে। পরশু দিন ভোরেই ওকে নিয়ে চলে আসবে।’
