‘ওদের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে। তার সাক্ষীও আছে। সব কিছুর মূলে কিন্তু আপনি আর মাসিমা। মহাজাতি সদনে আপনারাই ওদের গ্রিনরুমে নিয়ে গিয়ে সমীরণ মিত্তিরের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। মনে পড়ে কি? যদি তা না করাতেন তা হলে আজকের এই ঘটনা ঘটত না।’
‘মিহির তোমার সঙ্গেও তা হলে মালির পরিচয় হত না। ঠিক বলেছ, এ ঘটনা ঘটত না। এই বিয়ের প্রশ্নই উঠত না। কিন্তু এখন তর্কাতর্কির সময় তো নয়। কিছু একটা তো করা দরকার।’
‘করতে হয় আপনি করুন, মালির বাবা করুন। আমি কী করতে পারি বলুন? রাস্তায় ওকে খুঁজে বেড়াব? পারলে একবার সমীরণ মিত্তিরের খবর নিন। ওর বাড়িতে যান। এখন বাবা—মার সামনে কী বলে যে দাঁড়াব—,’ রিসিভার রাখার শব্দ হল।
‘কী বলল? সমীরণ মিত্রের নাম করল বলে মনে হল?’ সেজোভাই টেবল থেকে নিজেকে টেনে তুলে বলল।
‘বলল, মালির সঙ্গে ওর একটা রিলেশন গ্রো করেছে। সমীরণ মিত্তিরের বাড়িতে যেতে বলল।’ ভটু দরজার দিকে যেতে যেতে বলল।
‘কিন্তু সব থেকে ভাইটাল পয়েন্ট হল, সুধাংশুবাবুই সব কিছুর মূলে।’ উকিল বড়োভাই ত্যারচা চোখে তাকাল সুধাংশুর দিকে। ‘তাই তো মিহির বলল।’
বুক শুকিয়ে গেল সুধাংশুর। কথাটা তো সত্যিই। সমীরণের সঙ্গে আলাপ তো তারাই করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারপর ওদের মধ্যে যদি কিছু হয়ে থাকে তা হলে কি তিনি বা উমা দায়ী হবেন?
‘এটা আপনার করানো উচিত হয়নি। একটা বদমাশ লোকের সঙ্গে, ভাইঝি বলে বলছি না, সুন্দরী একটা মেয়ের আলাপ করিয়ে দেওয়ার আগে আপনার দু—বার ভেবে দেখা উচিত ছিল।’ বড়োভাইয়ের গলা ভরাট এবং খুবই সূক্ষ্ম একটা হুমকিও যেন রয়েছে।
‘তা হলে আমার এখন কী করার আছে?’ কাতর স্বরে সুধাংশু বললেন। এখন তিনি সত্যিই ভীত।
‘আপনি বরং সমীরণ মিত্তিরকে একটা ফোন করুন।’ ভটু সুপারিশ করল। ‘আগে জেনে নিন লোকটা বাড়িতে আছে কি না।’
‘কিন্তু ওর ফোন নম্বর তো আমার কাছে নেই, বাড়িতে রয়েছে।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান, অবুর গানের স্কুলের বিলে ফোন নম্বর আছে। ওটা নিশ্চয় ওর বাড়িরই ফোন।’ সেজোভাই প্রায় ছুটেই দোতলার উদ্দেশে রওনা দিল।
.
কেশব সেন স্ট্রিট দিয়ে লাল পতাকা হাতে একটা মিছিল স্লোগান দিতে দিতে রাজাবাজারের দিকে আসছে। হিন্দু—মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষার জন্য আবেদন জানানো হচ্ছে। মালবিকা মিছিলটার পাশ দিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল। এবার আমহার্স্ট স্ট্রিটে একটা পথসভা। ফুটপাথে মাইকের সামনে একটি লোক। তিনরঙা দুটো পতাকা ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা। ভিড় করে লোকজন শুনছে। ‘সারা দেশের পরিস্থিতি এখন উদবেগজনক। যে ধর্মীয় উন্মাদনা দেশকে আজ অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আঘাত হেনেছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে…’ সভার পাশ কাটিয়ে মালবিকা দ্রুত এগিয়ে গেল। স্লোগান বক্তৃতা কিছুতেই তার দরকার নেই, কানে ঢোকাতেও চাইল না। তাই নিজের পরিস্থিতিই উদবেগজনক হয়ে রয়েছে। বাবরি মসজিদ রইল কি ভেঙে পড়ল তাই নিয়ে এই মুহূর্তে তার মাথাব্যথা নেই। সমীরণের বাড়িতে ঢুকে পড়া ছাড়া আর কিছু সে ভাবতে চায় না।
দূর থেকেই সে দেখতে পেল বাড়ির সামনে গাড়িটা নেই। তার মানে শিঞ্জিনীও নেই। সায়ন্তনও নেই, অবনীও তা হলে নেই। রাস্তার দিকে সরে এসে মুখ তুলে দেখল বসার ঘরে আলো জ্বলছে। মালবিকার বুকের মধ্য থেকে চাপটা সরে গেল। সে কলিংবেলের বোতাম টিপল।
জানলার পর্দা সরিয়ে অপরিচিত একটা মুখ উঁকি দিয়ে বলল, ‘কে?’
‘সমীরণদা আছেন?’
মুখটা ঘুরিয়ে লোকটি কার সঙ্গে কথা বলে নীচে তাকিয়ে বলল, ‘দাঁড়ান।’
মালবিকা রাস্তার দু—দিকে তাকাল। একটা পুলিশের জিপ যাওয়াকে যদি ‘উদবেগজনক’ ভাবা না যায় তা হলে রাস্তাটা অন্য যেকোনো দিনের মতোই। সে গভীর স্বস্তি বোধ করল।
‘আসুন, উনি আছেন।’
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় লোকটি বলল ‘সমীরণদার শরীরটা ভালো নেই, টেম্পারেচার উঠেছে একশোয়।’
মালবিকার স্বস্তি বোধটা নষ্ট হয়ে গেল সমীরণের জ্বর হয়েছে শুনে। হঠাৎ—ই তার মনে হল, এটা যেন অশুভ লক্ষণ। কেন যে মনে হল তা সে জানে না।
‘কাল আবার কাঁচরাপাড়ায় ওনার একটা আসর আছে, কী যে হবে।’
লোকটির কথা বলার ধরন দেখে মালবিকার মনে হল কাঁচরাপাড়ার আসরের একজন উদ্যোক্তা এবং সমীরণের বশংবদদের একজন। একে সে কখনো দেখেনি। দোতলায় বসার ঘরের পর্দা সরানো। সমীরণ সোফায় পা তুলে বসে, গায়ে জড়ানো সাদা শাল। আরও লোক রয়েছে। স্বামী, স্ত্রী ও একটা বাচ্চচা মেয়ে।
মালবিকাকে দেখে সমীরণের কোনো ভাবান্তর ঘটল না। বরং চোখটা দু—সেকেন্ডের জন্য কুঁচকে উঠল। মালবিকার চোখে সেটা এড়াল না। মলিন হয়ে গেল তার অভ্যন্তর।
‘তুমি পাশের ঘরে বোসো, আমি এদের সঙ্গে কথা বলে নি।’
সমীরণের গলা শুকানো। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে জ্বর হয়েছে, শরীর দুর্বল। মালবিকা পাশের শোবার ঘরে এল। ঘরে আসবাব প্রায় কিছুই নেই। ড্রেসিং টেবল, আলমারি, কাঠের ওয়ার্ডরোব, দুটো ছোটো টুল, টেবল, কাচের পাল্লার দেয়াল আলমারিতে রাখা সামগ্রী, টিভি সেট, টেপ রেকর্ডার, অজস্র ক্যাসেট, ভি সি আর সবই অদৃশ্য হয়েছে। কাঠের খাটটার জায়গায় রয়েছে লোহার খাট। হাসপাতালে যেমন দেখা যায়, মাথার ও পায়ের দিকে সারি দেওয়া সরু লোহার রেলিং। পুরোনো রবার ফোমের তোশকটা খাটে পাতা, তার উপর নতুন রঙিন চাদর। খাটটায় নতুন রং। সিলিং পাখা, আর পর্দাগুলো শিঞ্জিনী নিয়ে যায়নি। আর নিয়ে যায়নি টেলিফোনটা।
