দিলীপরঞ্জন মাথা নাড়ল। ‘না, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মেয়ের এই অপকর্ম নিজের মুখে আমি বলতে পারব না।’
‘তা হলে—’। সেজোভাইয়ের দিকে তাকাল।
‘আমার দ্বারা হবে না।’
‘তা হলে—’ সুধাংশুর উপর চোখ রাখল মালবিকার বড়োজ্যাঠা। ‘আপনি বাইরের লোক, আপনার তো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া মিহিরের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে।’
‘ওর নম্বরটা আমি জানি না।’
‘মালির মায়ের কাছে আছে, এনে দিচ্ছি।’
দিলীপরঞ্জন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেজোভাই তখন সুধাংশুকে বলল, ‘আপনি কি কিছু আন্দাজ করতে পারেন, মালি কোথায় যেতে পারে?’
‘একদমই নয়।’
‘অচেনা কোনো লোককে বাড়ির সামনে দেখেছেন?’
ভটু বলল, যেভাবে গল্পের গোয়েন্দারা বলে।
‘না। তবে আমার মনে হয়, পুলিশের সাহায্য ছাড়া আর কোনোভাবে ওকে খুঁজে বার করা যাবে না। বোঝাই যাচ্ছে একটা প্ল্যান করে রেখেছিল। দুঃখের বিষয় শুরুটা করল কিনা আমারই বাড়ি থেকে। বকুল তো আত্মহত্যা করবে বলেছিল।’
‘দেখা যাক।’ বড়োভাই বলল, ‘মেয়েটা হুট করে এমন একটা কাজ যে করে বসবে কে জানত! দুষ্টু লোকের হাতে পড়ল কি না কে জানে! দেখতে শুনতে তো ভালো, চটকও আছে।’
আলোচনাটা কেউ বাড়াল না। গম্ভীর মুখে সবাই নিজের ভাবনার মধ্যে ডুবে গেল। একটু পরেই একটুকরো কাগজ নিয়ে ফিরল দিলীপরঞ্জন। সেটা সে সুধাংশুর হাতে দিল।
‘বউমা কী করছে? ওকে চোখে চোখে যেন রাখা হয়।’ বড়োভাই চাবি ঘুরিয়ে তালা খুলে দিল।
‘এই সময় সিডেটিভ খাইয়ে কাকিমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা দরকার।’
ডায়াল করে নম্বরটা পেল সুধাংশু। বয়স্ক ঘড়ঘড়ে গলায় একজন ‘হ্যালো’ বলল। তাকে সে অনুরোধ করল মিহিরকে ডেকে দেবার জন্য। ‘বলুন পাতিপুকুরের সুধাংশু গাঙ্গুলি কথা বলতে চায়।’
এরপর অপেক্ষা। সবাই টানটান হয়ে উঠেছে। সুধাংশুর গলা শুকিয়ে আসছে। ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় ঘাম ফুটল তাঁর কপালে। এ কী বিদঘুটে পরিস্থিতির মধ্যে তিনি পড়লেন! ফটকের সামনে বকুলকে ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে দিয়ে তিনি তো তখনই ফিরে যেতে পারতেন। তাই করলেই ভালো হত। কেন যে তাঁর মনে করুণার সঞ্চার ঘটল। উমা যদি এইরকম অবস্থার মধ্যে পড়ত তা হলে কী হত? ভাগ্যিস তাঁদের মেয়ে নেই। এখন কী বলবেন, কীভাবে বলবেন মিহিরকে? মেয়ের বাবা জ্যাঠারা কেউ অপ্রিয় কাজটা করতে চাইল না অথচ ওদেরই তো করার কথা।
‘হ্যালো কে মিহির।’ সুধাংশুর হাত কাঁপল, গলা কাঁপল। কীভাবে শুরু করবেন ঠিক করতে না পেরে বললেন, ‘শুনেছ কী ঘটেছে?’
‘সত্যিই খুব দুঃখের। এটা পরিষ্কার বিশ্বাসঘাতকতা হল। এমন কাজ যে হতে পারে ভাবাও সম্ভব নয়।’
.
মিহিরের গলায় যে ক্ষোভ, রাগ, তিক্ততা এবং স্বরগ্রাম সুধাংশু আশা করেছিলেন, সেটা না পেয়ে কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত হলেন।
‘হ্যালো মেসোমশাই, আপনাদের ওদিকে অবস্থা কেমন? আমাদের এখানে সব নর্ম্যাল।’
‘মিহির তুমি কী নিয়ে বলছ?’
‘কেন বাবরি মসজিদের আজ যা সর্বনাশ হল! আপনি তা হলে কী ভেবেছেন?’
‘বাবরির থেকেও বেশি সর্বনাশ হয়েছে মালিদের বাড়িতে, মালি নেই।’
‘য়্যা, মারা গেছে?’
‘না, না, মারা যাওয়া নয়। আমি ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছি না বাবা, মালি আর তার মা আজ দুপুরে আমার বাড়িতে আইবুড়ো ভাত খেতে গেছল, ওর মায়ের নয়, মালির আইবুড়ো ভাত। দুপুরে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। সেই ফাঁকে দরজা খুলে ও বেরিয়ে গেছে এক কাপড়েই। না না, আইবুড়ো ভাতের শাড়িটা সঙ্গে নিয়ে গেছে। একটা চিঠি মাকে লিখে রেখে গেছে। পড়ব?’ সুধাংশু হাত বাড়ালেন দিলীপরঞ্জনের দিকে। চিঠিটা নিয়ে তিনি পড়ে শোনালেন মিহিরকে। পড়ার মধ্যে শুনতে পেলেন মিহির অস্ফুটে বলছে, ‘আবার আমায় অপমান করল।’
‘হ্যাঁ বাবা, এবার কী করা যায়?’
‘কী আর করা যাবে, মালির বাবা—মাকে বলুন নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোতে।’
‘তুমি রেগে যাচ্ছ। কিন্তু এটা কি রাগের সময়?’
‘এতে রাগব না তো কীসে রাগব? কত লোক জানে বিয়ে ওর সঙ্গে হচ্ছে। বাবার খুব একটা মত ছিল না কিন্তু আমার মুখ চেয়ে না বলতে পারেননি। এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে কী করে বলব, তোমার ভাবী পুত্রবধূটি সটকান দিয়েছে। ছি ছি ছি কী নোংরামি করল। বিয়ে যদি নাই করতে চায় তা হলে ভদ্র পরিচ্ছন্নভাবে আমাকেও তো বলতে পারত। সবার মুখে কালি মাখিয়ে দেওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। বুঝলেন মেসোমশাই অশিক্ষিত বাবা—মায়ের ছেলেমেয়েরা এইরকমই হয়। বাবাটা মোদো মাতাল, তাও আবার দিশি খায়। মেয়েও লেখাপড়ায় অষ্টরম্ভা, হিন্দি ফিল্মের সেক্স আর ভায়োলেন্স দেখে দেখে মাথার মধ্যে শুধু ওইসবই ঘুরছে, তার উপর জুটেছে আপনার আদরের শ্রদ্ধার কেষ্টঠাকুরটি। শুনুন মেসোমশাই, এ কাজ মালি করেছে সমীরণ মিত্তিরের কথায়। আই অ্যাম ডেড শিওর।’
‘তুমি বলছ কী মিহির?’ সুধাংশু রিসিভারটা জোরে আঁকড়ে ধরলেন যাতে হাত থেকে পড়ে না যায়। বড়োভাই, শরীরটা হেলিয়ে দিয়ে ওধারের কথা শোনার চেষ্টা করছেন। কিছু কিছু শুনতেও পাচ্ছেন কেননা মিহির বেশ চেঁচিয়েই কথা বলছে। দাদার মতো একই উদ্দেশ্যে সেজোভাই টেবলের উপর উপুড় হয়ে এগিয়ে এসেছে। ভটু দাঁড়িয়ে সুধাংশুর পিঠের কাছে। শুধু দিলীপরঞ্জন কপালে হাত দিয়ে চোখ ঢেকে সোজা হয়ে বসে। তার আর কোনো কিছুতে উৎসাহ নেই।
