‘বিয়ের আর আট দিন বাকি। কম করে অন্তত ষাট—সত্তরটা কার্ড বিলি হয়ে গেছে। তারা তো বিয়ের দিন হাজির হবে।’ সুধাংশু নিজেও শিউরে উঠলেন দৃশ্যটা কল্পনা করে।
‘আপনি কী বলতে চান মালি আর ফিরে আসবে না?’ উকিলের প্রশ্ন।
‘না না সে—কথা বলছি না।’ সুধাংশু প্রায় আঁতকে উঠলেন। ‘নিশ্চয়ই চাই ফিরে আসুক। কিন্তু অন্য সম্ভাবনাটাও মাথায় রাখা দরকার।’
‘উনি ঠিকই বলেছেন।’ দরজা থেকে ভটুর সমর্থন এল। ‘এটা খুবই ইম্পর্ট্যাণ্ট ইস্যু। আগে এটার ফয়সালা হওয়া উচিত। সবাইকে এখনই বারণ করে না দিলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।’
‘কী বলে বারণ করবি? আর সেটা করা হবেই বা কী করে?’ সেজোভাই জানতে চাইল এবং তার প্রশ্ন দুটির সারবত্তা ঘরটাকে চুপ করিয়ে রাখল।
সত্যিই তো এত লোককে কী কারণ দেখিয়ে বারণ করা যায়? মেয়ে পালিয়ে গেছে বললে শুধু দিলীপরঞ্জনেরই তো নয়, সারা পরিবারের মাথা কাটা যাবে। তাদের বংশে এমন কেলেঙ্কারি এই প্রথম। আত্মীয়স্বজন, কুটুম, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীদের কাছে মুখ দেখানো যাবে না। কী আতান্তরে যে মেয়েটা সবাইকে ফেলে দিল!
এরপরও সমস্যা, এত লোককে এই অল্পদিনের মধ্যে বারণ করা। সেটা কি সহজ কথা!
‘অলরেডি যাদের কার্ড দেওয়া হয়ে গেছে তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে বলে আসা। যার টেলিফোন আছে তাকে টেলিফোন করা নয়তো পোস্টকার্ড ছাড়া।’ ভটু সাবলীলভাবে সমাধানের পথ দেখিয়ে দিল।
‘পোস্টকার্ড নয়। পোস্টাল সার্ভিসের যা বহর, এখান থেকে বাগবাজারের চিঠি ড্রপ করলে দেখবি দশ দিনেও পৌঁছবে না। আর টেলিফোন? কালই সল্টলেকে মামাশ্বশুরকে টেলিফোন করে পেলুম না। ডেড হয়ে গেছে। তার থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলার কথাটাই ভাবো।’ ভটুকে তার সেজোকাকা পুরোপুরি নস্যাৎ করল না। একটা পথ খোলা রাখল।
‘বাড়ি বাড়ি যাওয়া কি চাট্টিখানি কথা! বেলঘরিয়া থেকে পুটিয়ারি। ওদিকে উত্তরপাড়া। অফিসের লোকদের নয় বলে দেওয়া যাবে। পাড়ায় সবাই বিয়ের কথা জানে। তবে এখনও কাউকে বলা হয়নি। কিন্তু আত্মীয়—কুটুমদের তো বলা হয়ে গেছে।’ দিলীপরঞ্জনের দেহকাঠামো যতটা নয় তার থেকেও বেশি ভেঙে পড়েছে তার কণ্ঠস্বর। অস্ফুটে একবার বলল, ‘আমি যে এখন কী করি!’
‘কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে দিলেই হয়, বিয়ে স্থগিত রইল অনিবার্য কারণে।’ সেজোভাই শেষ করামাত্র বড়োভাই খিঁচিয়ে উঠল, ‘কী বুদ্ধি তোর! যারা কিছু জানত না তারাও এবার জেনে যাবে।’
‘সেজোকাকা, এখানেও একটা ব্যাপার আছে। কী কারণ দেখিয়ে তুমি স্থগিত রইলে বলবে? অনিবার্য কথাটার কোনো মানে হয় না। এতে লোকে নানা রকমের সন্দেহ করবে। একটা কংক্রিট কোনো কারণ দেখানো দরকার।’ ভটু চ্যালেঞ্জের সুরে সেজোকাকার মগজের পরীক্ষায় নামল।
‘এ তো খুব ইজি ব্যাপার, বলে দে মেয়ে মরে গেছে।’
দিলীপরঞ্জন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মাথা তুলল। সুধাংশু বিস্ফারিত চোখে সেজোভাইয়ের দিকে তাকাল। বড়োভাই ভ্রূকুটি করল। ভটু চাপা গলায় ‘হুঁ’ বলল।
‘মরে গেছে মানে, একটা কঠিন কোনো রোগ হয়েছে মরার সম্ভাবনা আছে আমি তাই মিন করেছি। ধরো টিবি হয়েছে যদি বলি?’
‘টিবি?’ বড়োভাই চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে কী ভেবে বসে পড়ল। ‘এ রোগ তো গরিবদের হয়। আমাদের বাড়িতে টিবি ঢুকবে কী করে?’
‘তা হলে ক্যানসার। এটা বড়ো বড়ো লোকদেরও হয়। এইডসও হয়।’
‘সেজোকাকা! ভটু ধমকে উঠল। ‘এইডস কেন হয় তা জানো। মেডিক্যাল কলেজের গায়ে একটা বড়ো বোর্ডে তা লেখা আছে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে যেতে গেলে চোখে পড়ে। মালির এইডস হয়েছে বললে কেলেঙ্কারির উপর ডবল কেলেঙ্কারি হবে।’
‘তা হলে ছেলের এইডস হয়েছে বলো।’
‘তুই চুপ কর।’ সেজোভাইকে মৃদু দাবড়ানি দিয়ে উকিল দাদা বলল। ‘ভটু তুই বললি বাবরি মসজিদ গুঁড়ো হয়ে গেছে। এতে তা হলে মুসলমানরা খেপে যাবে, কেমন? খেপে গেলে রায়ট হতে পারে, কেমন? মিহিররা এন্টালির যে দিকটায় থাকে সেদিকে মুসলমানই বেশি তাই তো? ধর ও যদি রায়টে মারা যায়, তা হলে তো বিয়ে অটোমেটিক্যালি বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘কিন্তু রায়ট হলে তো মরবে।’
‘যদি হয়। সেজন্যই তো গোড়াতেই বলেছি চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করো। তার মধ্যে মালি ফিরে আসতে পারে, তার মধ্যে রায়টও লেগে যেতে পারে। এর যেকোনো একটা হলে আমাদের মুখ রক্ষা হতে পারে।’
সুধাংশু আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। স্বার্থপর এবং মূর্খের মতো কথাবার্তায় তিনি বিরক্ত হচ্ছিলেন। এইবার বললেন, ‘আপনারা যেমন নিজেদের অসুবিধার কথা ভাবছেন ঠিক তেমনি ছেলের বাড়িও তো এই অসুবিধার সামনে পড়বে। ওঁরাও নিশ্চয় অনেককে নেমন্তন্ন করে ফেলেছেন। ওঁদের কথাটাও ভাবুন। ওঁদেরও মানসম্মান বোধ আছে। ঘটনাটা ওঁদের জানিয়ে দিন।’
সারা ঘর চুপ। শুধু দিলীপরঞ্জন বলল, ‘হ্যাঁ, এটা আমাদের কর্তব্য। আমি যেমন অনেক টাকা খরচ করে বসে আছি, তেমনই ওরাও যাতে খরচ আর না করে সেটা দেখা দরকার।’
‘তা হলে তুই জানিয়ে দে, এক্ষুনি।’ বড়োভাই টেলিফোনটার দিকে তাকাল। এ—বাড়িতে এটা দ্বিতীয় টেলিফোন কিন্তু ডায়ালে তালা দেওয়া। সকাল ও সন্ধ্যায় যখন ও সেরেস্তায় কাজে বসে তখনই শুধু টেলিফোনকে মুক্তি দেয়। অন্য সময় হাতকড়া লাগিয়ে রাখে।
