‘করেছিল। অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিল।’
‘কী জানতে চেয়েছিল, সেই একসঙ্গে গাড়িতে আসা?’
‘হ্যাঁ। আমি যা দেখেছি শুনেছি তাই বলেছি ওকে, রং চড়াইনি। আমার মনে হয়েছে তুমি সমীরণদার খপ্পরে চলে যেতে পারো।’
‘আমাকে বাঁচাবার জন্য তাই মিহিরদাকে সব বলে দিলেন?’
‘আমি পাশে বসে আর তোমরা যা শুরু করে দিলে, মালবিকা, আমার অস্তিত্বটাকেই অস্বীকার করে তোমরা যা করেছিলে তাতে একটু মর্যাদাবোধ যার আছে সে অপমানিত বোধ করবে। মদ খেলে সমীরণের বোধবুদ্ধি লোপ পায়, যা খুশি বলে, যা খুশি করে। কিন্তু তুমি তো মদ খাওনি। তা হলে তুমি কেন অসভ্যতা করবে, তাও আমার পাশে বসে। মনে করে দ্যাখো, সেদিন তুমি ওর কোলে বসে—’, প্রতিভা থেমে গেল। উত্তেজনায় চোখ জ্বলজ্বল করছে। স্বরে যতটা না ঘৃণা তার থেকেও বেশি আহত মর্যাদার যন্ত্রণা। শুকনো ঠোঁট চেটে নিল। হাঁফাচ্ছে। বালিশ থেকে মাথাটা তুলে ফেলেছে।
‘আপনি এসব বলেছেন?’ প্রতিভার কাঁধে চাপ দিয়ে মালবিকা মাথাটা বালিশে ফিরিয়ে দিল।
‘না। নোংরা বিষয় নিয়ে কথা বলতে গা ঘিন ঘিন করে। সমীরণ মিত্তিরের নাম তুমি আমার কাছে কোরো না। আমার যে সর্বনাশ করেছে, তা তোমায় বলতে পারব না। তবে মিহির বোকা নয়, সে সমীরণদার স্বভাবচরিত্রটা জানে, অনুমান করে নেবার মতো বুদ্ধি আছে। ও ছ্যাবলা নয়। প্রখর ওর মান—অপমান বোধ। তিন বছর ওকে দেখেছি তো।’
মিহিরের সঙ্গে তার যে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে মালবিকা বলতে গিয়েও তা বলতে পারল না। চায়ের কাপ হাতে প্রতিভার মা ঘরে ঢুকলেন।
‘চা—টা খেয়ে মা তুমি আর থেকো না। রাস্তায় নাকি লোকজন কমে যাচ্ছে। নীচের রুকিয়ার মা বলল গোলমাল হতে পারে।’
মালবিকার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটা চুমুক দিয়ে সে কাপ রেখে দিল মেঝেয়। ‘প্রতিভাদি, মাসিমা, আমি এখন চলি, পরে একদিন আসব।’
মালবিকা যখন হনহনিয়ে কেশব সেন স্ট্রিট থেকে আমহার্স্ট স্ট্রিটের দিকে চলেছে তখন তার উকিল বড়োজ্যাঠার একতলার সেরেস্তায় চলেছে এক বৈঠক। ওদের তিন ভাই আর সুধাংশু টেবল ঘিরে বসে। মেজোভাই জামসেদপুরে টেলকোয় অ্যাকাউন্টেন্ট। বউ নিয়ে সেখানেই কোয়ার্টারে থাকে। তাদের এখানকার ঘর তালা দেওয়া। এই বাড়ির সাতেপাঁচে তারা থাকে না। দু—তিন বছর অন্তর তারা আসে, তারা নিঃসন্তান।
জ্যাঠার ছেলে ভটু দরজায় দাঁড়িয়ে। এই বৈঠকে মেয়েদের থাকতে দেওয়া হয়নি। দোতলায় অর্চনার ঘরে দেওয়ালে ঠেস ও কপালে হাত দিয়ে বসে থাকা বকুলকে ঘিরে তার দুই জা তখন মালবিকার সমালোচনায় ব্যস্ত।
‘আগেই পুলিশ কেন? পুলিশ লাগানো মানেই লোক জানাজানি করা। আগে চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করে দ্যাখো ফিরে আসে কি না।’ কথাটা বলল বড়োজ্যাঠা।
‘পুলিশের এখন এইসব মেয়ে—পালানোর মতো সিলি ব্যাপারে মাথা ঘামানোর সময় হবে না।’ ভটু গম্ভীর বিজ্ঞ স্বরে জানিয়ে দিল। বিকেলে সে স্কুটার নিয়ে বেরিয়েছিল। ‘ইউ এন আই—এ আমার এক বন্ধু আছে, সে বলল পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে বাবরি মসজিদ একেবারে গুঁড়িয়ে ধুলো করে দিয়েছে।’
‘পাঁচ ঘণ্টায় কী করে ধুলো করে? কামান নিয়ে গেছল?’ ব্যবসায়ী সেজোভাই সন্দেহ প্রকাশ করল। ‘তিন—তিনটে গম্বুজ আছে মসজিদটার, অমনি পাঁচ ঘণ্টায় ভেঙে দিল?’
‘আমি যা শুনেছি তাই বললুম। পাঁচশো বছরের কাদামাটির স্ট্রাকচার, হাজার হাজার লোক যদি শাবল, গাঁইতি, হাতুড়ি, লোহার পাইপ দিয়ে ভাঙতে শুরু করে তা হলে পাঁচ ঘণ্টায় ধুলো হবে না?’ ভটু তার কাকার অবিশ্বাসকে ভাঙার চেষ্টা করল।’
‘আচ্ছা, এসব আলোচনা পরে হবে।’ বড়োজ্যাঠা তার ছেলের দিকে হাত তুললেন। ‘পুলিশ—টুলিশ পরের কথা। তা ছাড়া ভটু যা বলল, তাতে এখানে কেন সারা দেশের পুলিশই তো এখন ল অ্যান্ড অর্ডার নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাবে না।’
‘আমি এটাই বলতে চেয়েছি।’ ভটু বলল।
‘দিলু, তুই কিছু আন্দাজ করতে পারিস ও কোথায় যেতে পারে বা মালির সঙ্গে কারোর—’, বড়োভাই শোভন হওয়ার জন্য থেমে গেল।
এতক্ষণ পাথরের মতো বসে থাকা দিলীপরঞ্জন মাথা নাড়ল।
‘বউমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি?’
‘হ্যাঁ, ও কোনো হদিশ দিতে পারল না।’
‘ইদানীং ওর চালচলনে কোনোরকম সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েছে?’
‘সন্দেহজনক মানে?’ দিলীপরঞ্জন তেরিয়া ভাবটা কোনোক্রমে চেপে রাখল। মেয়ের চরিত্রের প্রতি কটাক্ষ তার ভালো লাগল না।
‘এতে আর মানেটানের কী আছে?’ ব্যবসায়ী দাদা সোজাসুজি কারবার ভালোবাসে। ‘কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেমটেম করছিল কী?’
‘সে কি বলেকয়ে প্রেম করবে?’ দিলীপরঞ্জন রাগ চেপে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘না, আমার চোখে কিছু পড়েনি।’
‘ওর চিঠিটা দেখি।’ উকিল দাদা হাত বাড়াল। ‘কোথায় চিঠিটা?’
দিলীপরঞ্জন বুকপকেট থেকে বার করে দিল। বড়োভাই চশমা পরে নিল। খুঁটিয়ে চিঠিটা দু—বার পড়ে নিয়ে চশমা খুলল। মুখে হতাশা।
‘সেরকম কিছু তো পাচ্ছি না।’
‘চেপে গেছে, বুদ্ধিমতী মেয়ে তো।’ সেজোভাই মন্তব্য করল। দিলীপরঞ্জনের ভ্রূকুটি তার নজর এড়াল না।
চুপচাপ বসে আছে সুধাংশু। তিনি বাইরের লোক। এই ধরনের কথাবার্তায় তাঁর নাক গলানো উচিত হবে কি না বুঝতে পারছেন না। ঘটনাটা যদি না তাঁর বাড়ি থেকে শুরু হত তা হলে তিনি এখানে বসে থাকতেন না। এখন তাঁর নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে। কিন্তু এরা যেভাবে কথাবার্তা চালাচ্ছে সেটা তাঁর পছন্দ হচ্ছে না। তাঁর মনে হচ্ছে এই মুহূর্তের জরুরি বিষয়টাই কেউ তুলছে না কেন?
