বাস থেকে নেমে মালবিকা ঘড়ি দেখল। এখনও ঘণ্টা দুয়েক সময় কাটাতে হবে। গানের স্কুল বন্ধ হবে সাতটায়। তিনটে ঘরে তালা দিয়ে অবনী চাবির তোড়াটা দোতলার দালানে পেরেকটায় ঝুলিয়ে দেবে, নয়তো শিঞ্জিনীর হাতে দেবে। তারপর ওরা চলে যাবে পার্ক সার্কাসের ফ্ল্যাটে। সদর দরজা খোলা রেখেই কি যাবে নাকি তালা দেবে। সমীরণ বাড়িতে রয়েছে কি না বোঝা যাবে তালা দেখে।
মালবিকা এখন বাড়িটার সামনে যাবে না, সামনে দিয়ে হেঁটেও নয়। দূর থেকে সে দেখতে পেল সমীরণের মারুতি গাড়িটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। ওটা যতক্ষণ থাকবে বুঝতে হবে শিঞ্জিনী বাড়িতেই রয়েছে। সে আবার মানিকতলার মোড়ে এল। এখন সময় কাটানোই তার কাছে একটা জরুরি সমস্যা। এভাবে বড়ো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। বাড়ির না হোক পাড়ার কত লোক তো বাসে ট্রামে এখান দিয়ে যায়। তাদেরই কেউ বলে দেবে, ‘বিকেলে তো ওকে মানিকতলার মোড়ে দেখলুম।’
সময় কাটাবার একটা জায়গা আছে, খুবই ভালো জায়গা, প্রতিভাদির কাছে যাওয়া। ওর সঙ্গে স্বচ্ছন্দে সময় কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু ওর যে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সেটা কি হয়ে গেছে? হয়ে গিয়ে থাকলে ফিরে আসতে হবে। তাই বা কেন, ওর মা—র সঙ্গে এটা—ওটা বলে তো সাতটা বাজিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
মালবিকা দ্রুত পা চালাল দক্ষিণে রাজাবাজারের উদ্দেশে। সায়ান্স কলেজ ছাড়িয়েই তার মনে হল কিছু একটা যেন সে অনুভব করছে। ফুটপাথে তিন—চারজনের জটলা দেখল অনেকগুলো। লোকগুলোর মুখ গম্ভীর, কথা বলছে গলা নামিয়ে। কিন্তু রাজাবাজারের মোড়ে পৌঁছে তার মনে হল আর পাঁচটা দিনের মতোই রয়েছে জায়গাটা। ওপারে রাস্তার ধার ঘেঁষে থাকা ফলের, প্লাস্টিক আর রবারের জুতোর সারি দেওয়া দোকানগুলো যথারীতি খোলা। ট্রাম, বাস, অন্যান্য গাড়ি বিকট শব্দে চলাচল করছে। এমনকী রবারের বলে ক্রিকেটও খেলা হচ্ছে। অস্বাভাবিক লাগল, রাস্তার ওপারে একটা বেঞ্চে সাদা উর্দি পরা সাত—আটজন পুলিশ দেখে। সবার হাতে রাইফেল। একটা ভ্যানও দাঁড়িয়ে।
মালবিকার বুক কেঁপে উঠল অজানা ভয়ে। এত পুলিশ কেন? অমঙ্গল কি ওর দিকে এগিয়ে আসছে? বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সে কি ভুল করল? ভাবতে ভাবতে সে মসজিদ ছাড়িয়ে গলির মধ্যে ঢুকল। তখন একবার তার মনে হল, ফিরে যাই। তারপর মনে হল এত দূর এগিয়ে আর ফেরা যায় না। সমীরণ তাকে ভালোবাসে কিন্তু সমীরণ যদি বাড়িতে না থাকে? যদি দরজায় সে তালা ঝুলতে দেখে? তা হলে কী করবে? রাস্তায় শুয়ে থাকবে? সমীরণ তাকে ডোবাবে না। ও খুব ভালো, ও নিশ্চয় ভেবেচিন্তেই তাকে সাতটায় আসতে বলেছে। কাল কল্যাণীতে নিয়ে যাবে। কোথায় রেখে আসবে, কার কাছে? কলকাতায় কি তাকে রেখে দিতে পারে না?
দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। মালবিকা ধাক্কা দিল। অন্যান্য বাড়ির দরজার সামনে বাসিন্দারা, বেরিয়ে এসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে উর্দুতে যার কিছুই সে বুঝছে না। ডিসেম্বরের সন্ধে নেমে আসছে। হাতের ব্যাগ আর শাড়িটা আঁকড়ে ধরে দরজায় আবার ধাক্কা দিল। প্রতিভাদিদের বারান্দায় কেউ নেই। সে ভাবল চেঁচিয়ে ডাকবে কি না।
দরজাটা সামান্য ফাঁক করে একটি মাঝবয়সি লোক তাকে দেখছে। গায়ে হাওয়াই শার্ট আর লুঙ্গি।
‘আমি উপরে যাব।’
লোকটি কথা না বলে পাল্লা খুলে সরে দাঁড়াল। একটি স্ত্রীলোক আর কয়েকটি শিশু ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভীত চোখে তাকে দেখছে। মালবিকা অন্ধকার সরু সিঁড়িটা ধরে দোতলায় উঠে এসে দেখল বারান্দায় কেউ নেই।
‘প্রতিভাদি।’ মৃদু স্বরে সে ডাকল।
‘কে?’ প্রতিভার ঘর থেকে তার মা বেরিয়ে এলেন। বারান্দায় আলো জ্বেলে মালবিকাকে দেখে বললেন, ‘তুমি! এই সময়ে। ঘরে এসো, প্রতিভার তো খুব জ্বর। আজ সকালেও ছিল একশো তিন এখন একশোয় নেমেছে।’
মালবিকা নিশ্চিন্ত বোধ করল। বিয়ে তা হলে হয়নি। প্রতিভার বুক পর্যন্ত একটা ধূসর আলোয়ান, চোখ মুখ টসটসে, তক্তপোশের নীচে একটা বাটিতে জল আর তাতে ডোবানো এক ফালি কাপড়। বালিশের পাশে দুটো ক্যাপসুল। ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘এসো মালবিকা।’
মালবিকা বসল, প্রতিভার পাশে। ‘এদিকেই এসেছিলুম, ভাবলুম যাই তোমাকে দেখে আসি।’
‘ভালো, তবে আজ না এলেই পারতে।’
‘কেন?’ মালবিকার বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল।
‘শুনছি তো অযোধ্যায় বাবরি মসজিদটা ভেঙে দিয়েছে করসেবকরা। বাবা বললেন, বিবিসি নিউজে নাকি বলেছে। মুসলমানরা ভয় পেয়ে গেছে।’
‘ভয় কেন?’
প্রতিভার মা উত্তর দিলেন, ‘চারদিকেই তো হিন্দু। অবাঙালি হিন্দুরা তো মসজিদের ফুটপাথে গাছতলায় একটা মন্দির তৈরির চেষ্টা বহুদিন ধরেই করে যাচ্ছে। বন্দুক নিয়ে পুলিশ সব সময়ই বসে থাকে। এবার ওরা চেষ্টা করবে মন্দির তৈরির জন্য হাঙ্গামা বাধাতে। ওর বাবা তো তাই বললেন, রায়ট যদি বাধে তো রামের নামে ওরাই বাধাবে। চা খাবে?’
‘হ্যাঁ।’
প্রতিভার মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই মালবিকা ঝুঁকে প্রতিভার মুখের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞাসা করল, ‘মিহিরদা তোমার কাছে এসেছিল?’
প্রতিভা বিস্মিত হল। ভুরু কুঁচকে উঠল। ‘এ—প্রশ্ন কেন?’
‘এমনিই, বলুন না, এসেছিল কি না?’
‘এসেছিল।’
‘কিছু জিজ্ঞাসা করেছিল আমার আর সমীরণদা সম্পর্কে?’
