‘তুমি যখন চিনতে তখন ভালো ছিল, এখন হয়তো বদলে গেছে। মানুষ কী চিরকাল একরকম থাকে?’ কথার সুরে বুঝিয়ে দিলেন সুধাংশু আলোচনাটা বন্ধ থাক।
খেয়ে উঠে বেসিনের কলে হাত ধোবার সময় বকুল চাপাস্বরে মেয়ের কাছে জানতে চাইল, ‘মিহির তোকে সমীরণ মিত্র সম্পর্কে কী বলেছে?’
‘মিহির তো বলেনি। সমীরণদাই আমাকে বলেছেন।’
‘কবে তোকে বলেছেন?’
‘তা দিয়ে তোমার কী দরকার?’ বিরক্তি জানাল মালবিকা। ভালো মেয়ে হয়ে সে ক—টা দিন কাটিয়েছে, সব কথায় সায় দিয়ে গেছে। এখন আর কীসের পরোয়া?
‘এসব কথা এখানে বলার কী দরকার।’
‘বেশ করেছি বলেছি, চুপ করো তো।’
শোবার ঘরের খাটটা বেশ বড়ো। উমা আর বকুল পাশাপাশি শুয়ে কথা বলছে। সুধাংশু ছেলের ঘরে খাটে শুয়ে খবরের কাগজ চোখের সামনে ধরে রবিবারের গল্পটা পড়ছেন। মালবিকা বসার ঘরে সোফায় কাত হয়ে, টিভি—তে চোখ রেখে শুয়ে আছে। ইংরেজি খবর হয়ে গিয়ে ফিল্মের শেষ অংশটা এবার শুরু হয়েছে।
চোখ টিভি—র স্ক্রিনে থাকলেও মালবিকা ফিল্ম দেখছিল না। এই সময় তার মাথায় ঘুরছে একটা ফিল্ম প্রোজেক্টার যন্ত্র। তার মনের পর্দায়, সারি দিয়ে চলছে টুকরো টুকরো ঘটনা, কথা। সে কখনো ঝাপসা, কখনো স্পষ্টভাবে দেখতে পেল তার শৈশব, বাল্য, কৈশোর থেকে আজ পর্যন্ত। এইগুলোর মধ্য থেকে সে সহানুভূতি দরদ আর ভালোবাসা শুধু সমীরণ ছাড়া আর কারুর মধ্যেই দেখতে পেল না। সে বারবার বকুলকে খোঁজার চেষ্টা করল তার বিশ্বাস, আস্থা সমর্পণ করার মতো একটা মানুষ হিসেবে। সে পারল না।
একসময় সে ঘড়িতে সময় দেখল। উঠে বসল। সাতটা বাজতে এখনও তিন ঘণ্টা বাকি। টিভি বন্ধ করে নিঃসাড়ে সে শোবার ঘরে এল। বকুল পাশ ফিরে আর উমা চিত হয়ে ঘুমোচ্ছে। শ্বাস প্রশ্বাস দেখে সে বুঝল ওরা ঘুমের গাঢ় অবস্থায়। পাশের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল সুধাংশু গভীর ঘুমে, খবরের কাগজটা মেঝেয় পড়ে রয়েছে। কল্যাণকে সে দেখতে পেল না।
এইটেই সময়। আর দেরি করলে ওরা উঠে পড়বে। মালবিকা সেলোফেন মোড়কে ভরা আইবুড়ো ভাতের শাড়িটা সাবধানে তুলে নিল। বকুলের কাশ্মীরি শালের নীচে তার হাত—ব্যাগটা চাপা রয়েছে। ব্যাগটা বার করে চেইন টেনে খুলল। ছোটো একটা চিঠি বার করে চারধারে তাকাল। কোথায় রেখে যাবে?
ডাইনিং টেবলের উপর? এই শালটার নীচে। আয়নার সামনে চিরুনি চাপা দিয়ে? ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে যেন না চিঠিটা পায় এই ভেবে সে ঘরের বাইরে এল। পাম্প শ্যু পরল। বসার ঘরে টিভি সেটটা চোখে পড়তেই তার মনে হল ওর উপর রাখলে টিভি চালাতে গিয়ে একসময় চোখে পড়বে। চিঠিটা সেটের উপর রেখে মালবিকা অ্যাশট্রে চাপাল তার উপর।
আর কী তার করার আছে? আছে, ঊর্ধ্বশ্বাসে এবার বাস স্টপের দিকে যাওয়া। সন্তর্পণে সদর দরজার ছিটকিনি খুলে মালবিকা বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। রাস্তায় লোক চলছে, তবে কম। এখন তাকে কেউ দেখল কি না দেখল তাতে তার কিছু আসে যায় না। সে দ্রুত পা চালাল বাস রাস্তার দিকে।
বাসনমাজার ঝি সদরের বেল বাজাতে ওদের ঘুম ভাঙে। দরজাটা যে খোলাই রয়েছে সে বুঝতে পারেনি। উমা প্রথম খাট থেকে নেমে রান্নাঘরে যান। এই সময় তাঁকে চা করতে হয়। বকুল ঘুমোচ্ছে কিন্তু মালি কোথায়? মিনিট তিন—চার পর বকুল যখন ডাইনিং টেবলে বসে মাথায় হাত দিল, মালবিকা তখন শ্যামবাজারে নেমে আর একটা বাসে উঠছে। যখন সে মানিকতলায় নামবার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে তখন সুধাংশু চিঠিটা দিচ্ছেন বকুলের হাতে।
‘দিদি, মালি চলে গেছে।…এবার কী হবে।’ বকুল চিঠিটি উমার দিকে বাড়িয়ে ধরে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল।
চিঠিটা হাতে নিয়ে উমা পড়তে এবং শোনাতে লাগলেন সুধাংশুকে। ‘মা, আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো দাম তোমাদের কাছে নেই। এই বিয়েটা নিজেদের তৃপ্তির জন্য দিচ্ছ। তোমাদের ইচ্ছার কাছে আমি বলির পাঁঠা হব না। আমি চলে যাচ্ছি কলকাতার বাইরে। খোঁজ করার চেষ্টা কোরো না। তুমি কষ্ট পাবে জানি কিন্তু আমি নিরুপায়। প্রণাম নিয়ো, ইতি হতভাগিনী মালি।’
চিঠিতে অনেকগুলো বানান ভুল। উমা হাত রাখলেন টেবলে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদা বকুলের মাথায়। তার চোখে অসহায় বেদনা। সুধাংশু বসার ঘরে গিয়ে সোফায় আশ্রয় নিলেন।
‘দিদি ওদের সবাইকে আমি এবার কী বলব? মালির বাবার সামনে আমি দাঁড়াব কী করে? আমায় বলেছিল মেয়ে যেন বাড়ির বাইরে না যায়, এখন আমি কী জবাব দোব, বলে দিন আমায়।’ বকুল মুখ তুলে তাকাল উমার দিকে। উমার মুখ পাংশু হয়ে গেল। তাদের বাড়িতেই ঘটনাটা ঘটল! এর দায় তাদের ঘাড়েও এসে পড়ছে।
‘বলুন, বলুন দিদি, এবার গঙ্গায় ডুবে মরা ছাড়া আমার আর কী করার আছে?’
‘শান্ত হও বকুল। এখন ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। শক্ত করো নিজেকে। বাড়ি গিয়ে সবাই মিলে বসে একটা উপায় বার করতে হবে।’
‘না না দিদি, বাড়ি গিয়ে এ মুখ আমি দেখাতে পারব না।’ বকুল ছুটে শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। বালিশে মুখ চেপে ধরে দু—হাতে ঘুসি মারতে লাগল বিছানায়। একটা গোঙানি শুধু তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে।
‘ওকে এইভাবে থাকতে দাও।’ দরজায় দাঁড়িয়ে সুধাংশু বললেন উমাকে। ‘শান্ত হোক, তারপর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব।’
