‘গান্ধারী হতে বলছেন মাসিমা?’
উমা থতমত হয়ে হেসে ফেলেন। ‘হ্যাঁ তাই হতে বলেছি।’
‘আপনাদের দুজনেরই কিন্তু একটি করে। বাকি নিরানব্বইটি এখনও ডিউ রয়েছে।’
উমার হাসির শব্দে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সুধাংশু।
‘মেয়ের কথা শোনো। বলে কিনা বাকি নিরানব্বইটা কই?’ উমা হাসি থামিয়ে হাসির কারণটা বলতেই সুধাংশুও হেসে উঠলেন।
‘তোমার তো আর বয়স নেই, নইলে চেষ্টা করে দেখতে পারতে, তবে বকুল কিন্তু ইচ্ছে করলেই নিরানব্বইকে নব্বুই করতে পারে।’
‘ধ্যাত, কী যে বলেন, আপনার জিভের কোনো আড় নেই।’
বকুলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য মালবিকার মনে হল তার মা শুধু সুন্দরীই নয়, তারই সমবয়সি। তারপরই বিষাদ তাকে স্পর্শ করল। তার হাতব্যাগে কয়েক লাইনের একটা চিঠি রয়েছে। মাকে লেখা। সেই চিঠি পড়ে মায়ের এই সুখের উচ্ছলতা আর কয়েক ঘণ্টা পর কীসে যে রূপান্তরিত হবে মালবিকা আন্দাজ করতে ভয় পেল।
এখন তাকে সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে। সবার চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে তো যেতেই হবে, তাই নয়, তার বাসে ওঠার আগে পর্যন্ত কেউ যেন না বুঝতে পারে সে বেরিয়ে গেছে। এজন্য কম করে দশটা মিনিট তার চাই। খোঁজ করতে নিশ্চয় বাস—স্টপ পর্যন্ত ওরা ছুটে আসবে, তার আগেই তাকে বাসে উঠে পড়তে হবে। প্রচুর বাস শ্যামবাজারের দিকে যায়। যেকোনো একটায় উঠে পড়া। শ্যামবাজার থেকে মানিকতলা মোড়। সেখান থেকে হেঁটে আমহার্স্ট স্ট্রিট।
সমীরণ বলেছে স্কুল বন্ধের পর সাতটায় যেতে। কিন্তু তাকে তো অনেক আগেই এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। বেরিয়ে সে সাতটা পর্যন্ত সময় কাটাবে কী করে? রাস্তায় ঘোরাঘুরি তো কোনোমতেই নয়, চেনা লোকেরা তাকে দেখে ফেলতে পারে।
বসার ঘরে মালবিকা আর সুধাংশু টিভি—তে একটা তামিল ফিল্ম দেখছিল। ইংরেজি সাব—টাইটেলের সব কথা বুঝতে না পারলেও ছবিটা মালবিকার মজারই লাগছিল। তখন উমা আর বকুল ঘরে ঢুকল।
‘মালি এই নে, তোর আইবুড়ো ভাতের কাপড়।’
উমা সেলোফোনের মোড়ক থেকে ছাপা শাড়িটা বার করে মালবিকার হাতে দিলেন। সে জানত একটা কাপড় পাবেই তাই অবাক হল না বা হবার ভান করল না। শাড়ির প্রিন্ট দেখেই তার ভালো লাগল। বড়ো বড়ো লাল ফুল তার খুব পছন্দের।
‘পছন্দ হয়েছে?’
মালবিকা হাসল। তিনজনকে প্রণাম করল, আর তখনই একবার মিহিরকে তার মনে পড়ল। বেচারা। শুধু বাড়ি, গাড়ি, টাকাপয়সা আর শিক্ষাই একটা মেয়ের কাছে সব নয়। আরও কিছু তার দরকার। দরকার শরীর আর মনকে মাতিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। তুমিও হাত ধরেছ, সমীরণও হাত ধরেছে কিন্তু শরীর ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল একজনের ধরাতেই। এটা একটা মেয়ের কাছে কম কথা নয়।
‘হবে না কেন, আমারই তো পরতে ইচ্ছে করছে।’ বকুল বলল। শুনে উমার মুখে খুশি ফুটল। বকুল এটাই চেয়েছিল।
‘দুটো প্রায় বাজতে চলল। আর দশ মিনিটের মধ্যেই খেতে দিচ্ছি। এসো বকুল আমাকে একটু সাহায্য করো’, বকুলকে নিয়ে উমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সুধাংশু ও মালবিকা কিছুক্ষণ টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকার পর একটা গানের দৃশ্যে ঘাসে চিতপাত নায়কের বুকের উপর নায়িকার শরীরঘর্ষণ সুধাংশুকে অস্বস্তিতে ফেলল। তিনি উশখুশ করে আড়চোখে দেখলেন মালবিকা মন দিয়ে দৃশ্যটা দেখছে, চোখদুটি উজ্জ্বল।
‘সমীরণের কাছে গান শিখছ?’ সুধাংশু চাইলেন দৃশ্যটাকে কথা দিয়ে আড়ালে পাঠিয়ে দিতে।’
‘না।’ মালবিকা চোখ ফিরিয়ে আনল স্ক্রিন থেকে।
‘সমীরণ শেখাচ্ছে না?’
‘আমিই আর শিখতে যাই না।’ সুধাংশু পরের প্রশ্নের আগেই মালবিকা বলল, ‘শিখে আর কী হবে, বিয়ে তো হয়েই যাচ্ছে।’
‘হোক না বিয়ে, তাই বলে শেখা বন্ধ হবে কেন!’
‘মিহির পছন্দ করে না সমীরণ মিত্রকে। ওনার সম্পর্কে মিহিরের ধারণা খুব খারাপ, স্বভাবচরিত্র নাকি ভালো নয়।’
সুধাংশু অপ্রতিভ বোধ করলেন। সমীরণকে তিনি ওর বালক বয়স থেকে চেনেন। পাড়ার ছেলে। বাড়িতেও আসা যাওয়া ছিল। তাকে শ্রদ্ধা করে। তার সম্পর্কে মন্দ কথা শুনতে ভালো লাগল না। ‘মিহির তো ওর ছাত্র, সে এমন কথা বলল! তোমার কী মনে হয় সমীরণ সম্পর্কে?’
‘মিহির ওর কাছে শেখা ছেড়ে দিয়েছে। আমার নিজের মনে হয় সমীরণদার চরিত্র খুব ভালো। কেন জানি মিহির ওকে হঠাৎ—ই অপছন্দ করতে শুরু করেছে। বিয়ের পর মিহির নিশ্চয়ই ওর কাছে আমায় গান শিখতে দেবে না।’ মালবিকা সহজ সুরে বলে গেল। মুখে যে বিমর্ষতা থাকার কথা তা নেই।
‘এবার এসো তোমরা, ভাত দিয়েছি।’ ভিতর থেকে উমার গলা ভেসে গেল। ওরা দুজন টেবলে গিয়ে বসল।
‘বেশি কিছু করিনি। সুক্তো, ডাল, বেগুনভাজা, দু—রকম মাছ আর দই মিষ্টি। বকুল বসে পড়ো।’
‘দিদি আপনি?’
‘আমি পরে বসছি।’
খাওয়ার সময় হাসিঠাট্টা হল। সবার সঙ্গে মালবিকাও হাসল। সর্ষে—চিংড়ি চেয়ে নিয়ে খেল। মিহিররা শুধু শাঁখা সিঁদুর ছাড়া আর কিছু নেবে না শুনে উমা জানিয়ে দিলেন, প্রভাংশুকে টিভি সেট, ফ্রিজ দিতে চেয়েছিল শ্বশুর, কিন্তু তাঁরা নেননি। এরপর সুধাংশু কথাটা তুললেন, ‘মিহির নাকি সমীরণকে পছন্দ করে না, মালিই বলল। ওর নাকি স্বভাব— চরিত্র ভালো নয়।’
‘কেন, ও তো ভালো ছেলে!’ উমা অবাক হলেন। ‘মিহির এটা ঠিক বলেনি। কবে থেকে ওকে চিনি।’
