অলু দিঘা ঘুরে এল। তাদের বাড়ির মেয়ে দুটো দিন বাইরে কাটাচ্ছে, এটা সে ভাবতেই পারে না। অলু যখন তখন বাড়ি থেকে বেরোয়, ফেরারও ঠিক নেই, এটাও সে মানতে পারে না। সেজন্য মা—র কাছে বিরক্তি প্রকাশ করে, রাগও। কিন্তু অলু তা গ্রাহ্য করে না।
প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে অলু শীলার হাতে দু—শো টাকা দেয়। অনন্ত তখন ঘরে। ওদের কথা তার কানে যাচ্ছিল।
‘আমাকে দিচ্ছিস কেন, দাদার হাতে দে।’
‘তুমিই দাও।’
‘আমি না, তুই দিলেই ভালো দেখায়। সংসারের সব খরচ—খরচা তো ওই করে।’
অলুর মুখটা খুশিতে, লজ্জায় আর উত্তেজনায় টসটস করছিল। দেখতে সুশ্রীই, আলগা চটক সারা অবয়বে। কথাবার্তায় চোখা, অনুর মতো কুনো ভোঁতা নয়। এই বোনটিকে নিয়ে অনন্তর যত দুর্ভাবনা ততই নিশ্চিন্তি।
‘দাদা।’
অলুর বাড়ানো হাতে কড়কড়ে দুটো একশো টাকার নোট। অনন্ত ভেবেছিল পুরো মাইনেটাই তার হাতে দেবে। তাই তো উচিত। এতকাল যেমন টাকা চেয়ে নিয়েছে, সেইভাবেই চাইবে। অবশ্য টিউশনি শুরু করার পর অলু আর টাকা চায়নি।
‘আমায় দিচ্ছিস কেন, জমা, ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোল।’
‘অ্যাকাউন্ট আছে, এটা সংসারের খরচের জন্য।’
অ্যাকাউন্ট আছে শুনে অনন্ত ধাক্কা খেল। তার পরামর্শ না নিয়েই অলু ব্যাঙ্কে টাকা জমাতে শুরু করে দিয়েছে। নিজেই হিসেব করে দু—শো টাকা দিচ্ছে সংসারের জন্য। অথচ এমন দিনও গেছে টিপেটিপে ষাট টাকায় মাস চলেছে। তার মনে হল, সংসার থেকে অমরের মতো অলুও বিচ্ছিন্ন হতে চলেছে। তাকে আর ধর্তব্যের মধ্যে রাখছে না।
অনন্ত টাকাটা হাতে নেয়নি। অলুকে বলেছিল টেবলে রাখতে। আর বলেছিল পরের বার থেকে মা—র হাতেই যেন দেয়।
একদিন অলু তার মাকে জানাল সে বিয়ে করবে। ছেলেটির নাম শান্তনু। কলেজে তার দু—বছরের সিনিয়র ছিল। আধুনিক গান লেখে, রেডিয়োয় আর অ্যামেচার থিয়েটার দলে অভিনয় করে, খবরের কাগজে এটা—ওটা লেখে, ভবানীপুরে নিজেদের বাড়ি, অবস্থা ভালো। তবে চাকরি করে না।
রাত্রে অনন্ত খেতে বসলে শীলা ফিসফিস করে জানাল,
‘অলু বিয়ে করবে, ছেলে চাকরিবাকরি করে না।’
‘কী করে তা হলে?’
‘তুই ওকেই জিজ্ঞেস করিস। বেকারকে বিয়ে করবে, ওর কি মাথা খারাপ হয়েছে?’
‘পরে চাকরি পাবে।’
‘যখন পাবে তখনই বিয়ে করবে। তুই বারণ কর।’
‘আমাকে তো অলু বলেনি কিছু, যেচে বলাটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া ছেলেকে তুমিও দ্যাখোনি আমি দেখিনি।’
পরদিন অফিস যাবার আগে অলু তাকে বলেছিল। অনন্ত চুপ করে শুনে যায়।
‘রেজিস্ট্রি করব। গাদাগুচ্ছের খরচ করার মতো টাকা আমার নেই।’
আমার নেই মানে? অলু কি নিজের বিয়ের খরচ নিজেই করবে? অনন্ত আর একটা ধাক্কা খেল। নিজের দায় নিজেই বইবে, ভালো। তাকে যদি অগ্রাহ্য করতে চায় করুক।
‘তুই ভেবেচিন্তে দেখেছিস?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমাদের বংশে কেউ রেজিস্ট্রি বিয়ে করেনি।’
‘করেনি, এবার হবে।’
অনন্ত একবার শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আলনা থেকে শার্টটা তুলে নিয়ে বলল, ‘আমরা কেউ কিন্তু দায়ী থাকব না যদি কিছু ঘটে।’
‘কী ঘটবে?’
‘ভালোবাসার বিয়ে তো…দেখলুম না তো কাউকে সুখী হতে।’
‘তুমি আবার দেখলে কবে?’
অলু তীক্ষ্ন স্বরে ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল। ‘তুমি তো লোকজনের সঙ্গে কোনোদিন মেলামেশাই করোনি। কোনোদিন তোমার একটা বন্ধু দেখলাম না, একটা বই পড়তে দেখলাম না…সিনেমা, গান, নাটক, বেড়ানো কিছুই না। শুধু কাজে যাওয়া আর ঘরে বসে থাকা…তুমি ভালোবাসার বিয়ের কী বোঝ আর কী জানো, শুধু তো ভালো ছেলে হয়েই জীবন কাটিয়েছ।’
অনন্ত হতভম্ব হয়ে, শার্টের মধ্যে দু—হাত গলানো অবস্থায়, তাকিয়ে থেকেছিল। দরজার কাছে শীলা দাঁড়িয়ে।
‘অলু কাকে কী বলছিস তুই! তোর দাদা সতেরো বছর বয়স থেকে সংসারের হাল ধরেছে, তোদের মানুষ করেছে, আর তুই কিনা চাকরি পেয়ে সব ভুলে গেলি?’
অলুকে বিচলিত দেখাল কিন্তু রাগ পড়েনি।
‘ভালোবাসার বিয়ে নিয়ে দাদা বাজে মন্তব্য করল কেন? আমি অসুখী হব এমন ইঙ্গিত দেওয়ার কী দরকার ছিল? আমি তো অনু নই যে সবাই মিলে যেমন—তেমন একটা বিয়ে দেবে আর মেনে নেব।’
‘যেমন—তেমন? ওকে জিজ্ঞেস করে মত নিয়ে তবেই বিয়ের কথা বলেছি।’
‘মতামত দেবার মতো বুদ্ধি তখন ওর হয়নি, হলে বিয়ে করত না। তোমরা ওর জীবনটা নষ্ট করেছ।’
অলু দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ওর জুতোর শব্দ সদরে না পৌঁছোনো পর্যন্ত কেউ কথা বলেনি।
‘অনুর জীবন কি নষ্ট হয়েছে, মা?’
‘পাঁচটা ছেলেমেয়ে পেটে ধরেছে, সতীনের ছেলেকে নিজের পেটের ছেলের থেকে আলাদা করে দেখে না, অনু আমার কত ভালো মেয়ে। ও সুখী হবে না তো কে হবে! জামাই বাড়ি করবে বলে জমি কিনেছে…’
অনন্ত আর শোনেনি। সে কাজে বেরিয়ে গেছল। সারাদিন তার মাথার মধ্যে ঘুরেছে অলুর কথাগুলো। সত্যিই সে মেলামেশা করেনি। সত্যিই তার কোনো বন্ধু নেই। ভালোবাসার কিছুই সে জানে না। অলুর প্রত্যেকটা কথাই সত্যি, ভালো ছেলে হয়েই তার দিনগুলো কেটে গেল।
রাত্রে অনন্তের ঘুম এল না। এন্টালির বাড়িতে ফাটা ছাদ দিয়ে জল পড়ছে, রাজমিস্ত্রি নিয়ে আজ গেছল কাজ বুঝিয়ে দিতে। ফেরার সময়, প্রতিবারের মতো, মিনতি করের ঘরে যায়।
‘রোজই অপেক্ষা করি এই বুঝি দারোয়ান এসে জিনিসপত্র ছুড়ে ছুড়ে ফেলে আমায় বার করে দেবে। রাতে ঘুম হয় না।’
