‘অযোধ্যায় সেদিন গণ্ডগোল হলে কলকাতায়ও কি হবে?’ মালবিকার অস্বস্তি লাগছে। রবিবারে এই গণ্ডগোল সম্ভাবনার কথাটা শুনে। রবিবারেই সমীরণ তাকে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বলেছে।
‘কলকাতায় কখন যে কী হয় কেউ কি বলতে পারে? এই তো আড়াইমাস আগে ফুলবাগান থানায় কী হল? তার আগে বানতলা? কিছু বলা যায় না। ইন্দিরা গান্ধী যখন মারা গেলেন তুই তখন অবুর বয়সি। তোর মনে আছে কি না জানি না, দুপুর থেকে কলকাতায় সে কী হাঙ্গামা, গন্ডগোল। ট্রাম বাসে আগুন, লুটপাট, বাচ্চচাদের স্কুল বাসকেও রেহাই দেয়নি ট্রেন বন্ধ।’
‘ওসব তো গুণ্ডাদের কাজ।’
‘তবে না তো কী! চারিদিকে গুণ্ডারা ওত পেতে রয়েছে, একটা ছুতো পেলেই হল। শুধু তো রাম নয় তার সঙ্গে বাবরিও রয়েছে। অযোধ্যায় কিছু একটা ঘটে গেলে সারা দেশে আগুন লেগে যাবে। অবু বড়ো হচ্ছে, এইবার আমার দুর্ভাবনা শুরু হল।’
মালবিকা হেসে বলল, ‘আমাকে নিয়ে দুর্ভাবনা হয় না?’
‘হয় না আবার!’
কাহিনি যেখান থেকে শুরু হয়েছিল এবার আমরা ফের সেখানে চলে যাব। সুধাংশু এবং উমার বাড়িতে। রবিবার মালবিকা তার মায়ের সঙ্গে সেখানে আসছে আইবুড়ো ভাত খেতে। সুধাংশু বাজার থেকে চিংড়ি এনেছেন। রান্নাঘরের ভিতরে কল্যাণ চিংড়ির খোসা ছাড়াতে বসেছে। ঘণ্ট করবেন বলে উমা গতকাল একটা মোচা কিনে রেখেছেন আর কিনেছেন দেড়শো টাকা দিয়ে মালবিকার জন্য একটা ছাপা শাড়ি।
রান্নাঘরের দরজা থেকে একটু দূরে চেয়ারে বসে সুধাংশু খবরের কাগজ থেকে দেশের হালচাল সম্পর্কে স্ত্রীকে ওয়াকিবহাল করার জন্য একটু গলা চড়িয়ে খবর শোনাচ্ছেন। উমা তখন চা তৈরি করায় ব্যস্ত।
‘শুনছ, আজ অযোধ্যায় করসেবা। সরযূ নদী থেকে হাতে করে, চাদরে করে বালি এনে জন্মভূমি পরিসরে তৈরি কংক্রিট প্ল্যাটফর্মের আশপাশের গর্ত ভরাট করবে। এক হাজার এক হাজার করে এক—একটা ব্যাচে আসবে বালি দিয়ে গর্তটর্ত ভরিয়ে চলে যাবে। এর পাশাপাশি চলবে প্ল্যাটফর্মটা সাফাইয়ের কাজ। তোমায় তো কাল বলেই ছিলুম হাইকোর্টের নির্দেশ রয়েছে যতক্ষণ না তারা রায় দিচ্ছে ততক্ষণ কোনো নির্মাণ করা যাবে না। বিজেপি—আরএসএস বলেছে, প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছে আদালতের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে তারা পালন করবে। গন্ডগোল সৃষ্টি হয়ে পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় সেদিকে নজর রাখবে।’
‘তা হলে বলছ ভালোয় ভালোয় করসেবা হয়ে যাবে?’ রান্নাঘর থেকে উমা জানতে চাইলেন।
‘হয়ে যাওয়া তো উচিত। নেতারা তো ছেলেমানুষ নয় যে প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবে।’
‘প্রধানমন্ত্রী তো সাধুদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।’
‘তাইতেই তো জ্যোতিবাবু রেগে গেছেন। কাল তোমায় শোনালুম না, ময়দানের একটা মিটিংয়ে উনি বলেছেন—প্রধানমন্ত্রী সাধুসন্তদের সঙ্গে কথা বলছেন কেন? স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পরও সাধুরা দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবেন নাকি?’
‘ঠিকই তো বলেছেন…হ্যাঁ গো, জ্যোতিবাবু ঠিক বলেছেন তো?’ উমা কিঞ্চিৎ উদবিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন, জ্যোতিবাবুকে সমর্থন করাটা তার ঠিক হয়েছে কি না।
সুধাংশু স্ত্রীর উদবেগ প্রশমনের চেষ্টা না করে অন্য খবরে চলে গেলেন। ‘জ্যোতিবাবুর নির্বাচনী কেন্দ্র সাতগাছিয়ায় কাল মমতা ব্যানার্জি মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে এসেছে।’
‘সত্যি!’ উমা রান্নাঘরের দরজায় প্রায় ছুটে এলেন। ‘যাই বলো বাপু, মেয়েটা করে দেখাল বটে। জ্যোতিবাবুর ঘণ্টাও বাজিয়ে দিয়ে এল? এবার কোথাও ঘণ্টা বাজলে আমাকে বোলো তো, শুনে আসব।’
‘আচ্ছা বলব তোমায়।’ সুধাংশু মৃত্যুঘণ্টার পাশের খবরটায় চলে গেলেন এবং কাগজের উপর ঝুঁকে পড়লেন। চায়ের কাপ টেবলে রেখে উমা ফিরে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর মনে হল সুধাংশু যেন বললেন, ‘সর্বনাশ!’
‘কীসের সর্বনাশ? কার সর্বনাশ?’
‘লরি, টেম্পো, ট্রাক, ম্যাটাডোরে মড়া নিয়ে যেতে দেবে না কর্পোরেশন। কারণ ওই সমস্ত গাড়িতে করেই ফলমূল, শাকসবজি, মাছ নিয়ে যাওয়া হয়। বলছে, সংক্রামক রোগের জীবাণু মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে মানুষের শরীরে, যেমন যক্ষ্মার জীবাণু। তার মানে লরি টেম্পোর রোগের জীবাণু রয়ে যায় আর সেগুলো সংক্রামিত হয় কলমি—পালং, আলুপটল, চিংড়ি, ট্যাংরা, তেলাপিয়ায়। সাংঘাতিক। এগুলোই তো খাই।’
উমা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল স্বামীর দিকে। সুধাংশুর দিশাহারা দৃষ্টি স্ত্রীর মুখে।
‘এখান থেকে নিমতলা ঘাট কতদূর জানো?’
‘টেম্পো ম্যাটাডোর বন্ধ করে দিলে আমাদের জন্য খোকার কত কষ্ট হবে ভাবো তো,’ উমা বিপন্ন স্বরে বলল।
‘চিংড়িমাছ, মুলো, পালং এই যে বাজার থেকে আনলুম এগুলো লরি কি ম্যাটাডোরেই তো বাজারে এসেছে।’ সুধাংশু চিন্তায় পড়ে গেলেন। খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে বসার ঘরে গিয়ে টিভি সেট খুলে সোফায় বসলেন। জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য তখন দূরদর্শনে কনসার্ট বাজছে। উমা রান্নাঘরে গিয়ে বঁটি পেতে বসলেন মোচাটা নিয়ে।
ওরা বারোটা নাগাদ এসে পৌঁছল। সন্দেশের বাক্সটা উমার হাতে দিয়ে বকুল ইশারা করল মালবিকাকে প্রণাম করার জন্য। ‘আর বলবেন না দিদি, বেলগাছিয়ার মোড়ে যা ট্র্যাফিক জ্যাম।’
প্রণাম নিয়ে মালবিকার চিবুক নেড়ে উমা বললেন, ‘সুখী হও মা। স্বামীর ভালোবাসা পাও, শতপুত্রের জননী হও—’
