মালবিকার এক একসময় চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করে—নেমন্তন্নর কার্ডগুলো ছিঁড়ে ফেলে দাও। ডেকরেটারকে অ্যাডভান্সের টাকা দিয়ো না। ভিয়েনের বামুনের সঙ্গে কথা বোলো না। বেনারসি শাড়ি, পাঞ্জাবির তসরের কাপড়, জুতো, সোনার বোতাম, আংটি, নমস্কারির শাড়ি এসবের জন্য টাকা খরচ কোরো না। তোমরা কেউ জানো না আমি কী এক ভয়ংকর কাজ করতে চলেছি। আমার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য আমি জীবনকে বাজি ধরেছি।
মালবিকা এ—সময় স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছল। কাজটা সে করবেই। মায়ের মতো আমি হব না। একটা বাজে লোককে বিয়ে করার জন্য মা আমাকে পেটে ধরেছিল। আমি এই ভুল করব না। সমীরণকে বিয়েতে বাধ্য করাতে চাই না। যেমন স্বামী হয়ে রয়েছে তেমনই শিঞ্জিনীরই থাকুক। ও শুধু আমাকে ভালোবাসুক, ওর মন আমার দখলে থাকুক। সমীরণ খুব সুন্দর, আমি পছন্দ করি সুন্দর পুরুষকে। আমি চাই নিজের মতো করে জীবনকে ভোগ করতে। কেন ভোগ করব না? জীবনটা তো আমারই। তোমরা কেন তাকে ঘাড় ধরে খাঁচায় পুরতে চাও? আমার স্বাধীনতা আমারই হাতে থাকবে।
‘প্রায়ই দেখি তুই আপনমনে বিড় বিড় করছিস, ব্যাপার কী?’ বকুল একসময় বলল। মালবিকা তখন তার ঘরে শুয়ে।
‘কই, কিছু তো নয়! বিড় বিড় করেছি নাকি?’ উঠে বসল মালবিকা।
‘তোর মনে এখনও বোধহয় এ—বিয়েতে আপত্তি রয়ে গেছে।’
‘না না, আমি তো রাজি বলেইছি।’
বকুল তীক্ষ্ন চোখে মেয়ের মুখ লক্ষ করল। অবশেষে কঠিন হয়ে গেল তার দৃষ্টি।
‘মনকে ঠিক করে নে মালি। এ—বিয়েতে সবার ইচ্ছে রয়েছে এটা ভুলে যাসনি।’
‘আমি মনকে ঠিক করেই নিয়েছি।’
‘তোর মুখে হাসি নেই, কেন?’
‘হাসতেই হবে এমন কোনো কথা আছে?’
‘লোকে দেখলে বলবে কী? আজ বাদে কাল বিয়ে হতে যাচ্ছে যার, তার মুখে হাসি নেই, দৃষ্টিকটু লাগে।’
‘আচ্ছা হাসব।’ মালবিকা শুয়ে পড়ল।
‘রোববার পাতিপুকুরে মুখে যেন হাসি থাকে।’
সমীরণের বলে দেওয়া চোদ্দো দিন এল শুক্রবারে। মালবিকা একটার মিনিট পাঁচেক আগেই অর্চনার ঘরে একটা ম্যাগাজিন হাতে হাজির হল।
‘কী রে এই সময়ে?’ অর্চনা আলমারির পাল্লায় আঁটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতে মুখে ময়েশ্চারাইজার লোশন ঘষা বন্ধ রেখে বলল। স্নান সেরে এইমাত্র সে ঘরে এসেছে।
‘এটা ফেরত দিতে এলুম।’ একটু থেমে মালবিকা বলল, ‘গানের স্কুলের প্রতিভাদিকে বলেছিলুম একটা নাগাদ ফোন করতে, এখানে।’ সে ফোনের এমন কাছাকাছি দাঁড়াল যাতে বেজে ওঠামাত্র হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা তুলে নিতে পারে।
‘উনি তো গানের স্কুল ছেড়ে দিয়েছেন, অবু কবে যেন বলল।’
‘হ্যাঁ, কী নিয়ে যেন শিঞ্জিনী বউদির সঙ্গে খটাখটি হতেই ছেড়ে দিয়েছেন। প্রতিভাদি মানুষটি খুব ভালো, যত্ন নিয়ে শেখান, আমাকে তো উনিই শেখাতেন। ওঁকে বলে রেখেছি আমার বিয়েতে আসতেই হবে।’
‘এলে আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিস তো। বাড়িতে এসে যদি অবুকে শেখাতে রাজি হন, তা হলে রাখব।’
‘বলব। তবে বিয়ের দিন আসতে পারবেন কি না সেটাই ফোনে জানিয়ে দেবেন। প্রতিভাদির শিরদাঁড়ায় কী যেন একটা হয়েছে, এই মাসেই অপারেশন হবার কথা।’
‘শিরদাঁড়ায়? তাহলে তো মেজর অপারেশন। তোর বিয়ের আগে হলে আর আসতে পারবেন না।’
এই সময়ের ফোন বেজে উঠল এবং ঝটকা দিয়ে মালবিকার হাত তুলে নিল রিসিভারটা।
‘হ্যালো কে, প্রতিভাদি? আমি মালবিকা।’
‘তোমার সেজজেঠি কি পাশেই?’
‘হ্যাঁ, তোমার অপারেশন কবে?’
‘পরশু রোববার, গানের স্কুল সাতটায় বন্ধ হবে। তারপরই তুমি চলে এসো। শিঞ্জিনী পার্ক সার্কাসের ফ্ল্যাটে যাবে, অবনীও ওর সঙ্গে যাবে। আমাদের খাট—বিছানা, আলমারি এমনকী টিভি, ফ্রিজও ওখানে পরশু চলে গেছে। সোমবার সকালে তোমায় কল্যাণীতে একজনের বাড়িতে নিয়ে ঘিরে রেখে আসব। কোনো ভয় নেই। ও কে? তুমি আসছ?’
‘হ্যাঁ। আটাশে অঘ্রান মানে চোদ্দোই ডিসেম্বর বিয়ের দিন তুমি তা হলে আসতে পারবে না।?’
‘দিন পাক্কা হয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ। কী করে আর আসতে বলব, ডাক্তার যখন দিন ঠিকই করে ফেলেছে।’
‘তা হলে পরশু। ভয় করছে?’
‘না, একদমই না।’
ওধারে সমীরণ ফোন রেখে দিল। অর্চনা খাটের উপর পড়ে থাকা সেদিনের খবরের কাগজের দিকে তাকিয়ে। মালবিকা বলল, ‘প্রতিভাদির অপারেশনের ডেট পরশু।’
‘কী যে হচ্ছে এই রাম জন্মভূমি আর বাবরি মসজিদ নিয়ে, পরশু আবার করসেবা করবে।…হ্যাঁ, কী বললি, প্রতিভাদির অপারেশন হবে পরশু? তা হলে তোর বিয়েতে আসছেন না।’ বলেই অর্চনা খবরের কাগজটা তুলে নিল।
‘রাম জন্মভূমি নিয়ে পরশু কী হবে?’ মালবিকা কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল। সমীরণ বলেছে পরশু সন্ধ্যা সাতটায়।
‘অযোধ্যায় রাম জন্মভূমি ঘিরে একর তিনেকের একটা জমি নিয়ে মামলা হচ্ছে এলাহাবাদ হাইকোর্টে। রায় বেরোবে এগারো তারিখে। সেই জমিটায় মন্দির করতে চায় হিন্দুরা। পরশু লাখ লাখ লোক গিয়ে সেখানে ঝাঁট দিয়ে, গর্ত টর্ত বুজিয়ে, জল ঢেলে পরিষ্কার করবে। লিখেছে, প্রায় দেড়লাখ করসেবক দেশের নানা জায়গা থেকে অযোধ্যায় হাজির হয়ে গেছে। তার মানেই ঝামেলা, একটা বড়ো রকমের গন্ডগোল হবে। অবশ্য দুজন নেতা প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছে সংঘাত হবে না। কিন্তু নেতাদের কথা আজকাল কি কেউ আর মানে?’ অর্চনা খবরের কাগজ থেকে খুঁটে খুঁটে খবর তুলে তার সঙ্গে জুড়ে দিল নিজের মন্তব্যটা।
