মালবিকার এক্ষেত্রেও কথা বলার কিছু নেই। তবু বলার জন্য বলল, ‘আমার বিয়ের জন্য বাবা ধারদেনায় জড়িয়ে পড়বে সেটা ভাবতে আমার খারাপ লাগছে। বড়োজেঠিকে তো চিনি, তারপর চিমটি কেটে ঠেস দিয়ে কথা শোনাবে।’
‘শোনাক। ওর নাতনিদের বিয়ে তোর থেকে ভালো ঘরে হয় কি না দেখব। এই চব্বিশটা দিন তুই আর বাড়ি থেকে বেরোসনি। কথা দে।’
‘দিলুম।’
‘বাঁচালি আমায়।’
চারশোর মতো লোককে নেমতন্ন করা হবে। মালবিকা জানিয়ে দিয়েছে পাড়ার বা স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই, সুতরাং বলার মতো কেউই তার নেই। সমীরণ মিত্র আর শিঞ্জিনী বউদিকেও বলবে না। আত্মীয়স্বজন বলতে জেঠিদের বাপের বাড়ি, বড়োজেঠির বেয়াই বাড়ি, তিন পিসি আর বাবার দুই মামা। বাবার অফিসে, পাড়ার কয়েকটা বাড়িতে আর বরযাত্রীরা সব মিলিয়ে ধরা হয়েছে চারশো লোক।
বকুলের অ্যাডভোকেট বড়োভাসুর লিস্টিটা কাটছাঁট করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কথায়: ‘অ্যাতো লোককে বলার দরকার কী, খরচের দিকটাও তো দেখতে হবে? দিলুর যা সঙ্গতি তাতে এই বাজারে চারশো লোককে খাওয়ানো, ওর পক্ষে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।’
বকুলের আপত্তিতে লিস্টি ছাঁটাই হয়নি।
দিলীপরঞ্জনকে সে বলে দিয়েছে, ‘দশটা নয়, দুটো নয় আমার একটাই মেয়ে। হোক খরচ। ওনার মেয়ের বিয়েতে বারোশো লোক খাইয়েছেন আর তোমার মেয়ের বিয়েতে চারশোও তুমি খাওয়াতে পারবে না? খরচ তো উনি দিচ্ছেন না।’
‘তুমি চটছ কেন। আমার মুখের দিকে চেয়েই বড়দা কথাটা বলেছে। উনি বললেই আমি রাজি হব নাকি? আত্মীয় বাড়ি, বেয়াই বাড়ি না বললে হয়? এদের বাদ দিয়ে আমাদের বংশে কখনো কোনো বিয়ে হয়েছে? আমার বিয়ের কথাটা বাদ দাও, ওটা একসেপশন।’ দিলীপরঞ্জনের শেষ বাক্যটি কোনো জ্বালা বা তিক্ততা নিয়ে মুখ থেকে বেরিয়ে এল না। বরং বংশের ঐতিহ্য ভাঙা এই দুঃসাহসিক কাজটার জন্য প্রচ্ছন্ন একটা গর্ব যেন রয়েছে।
‘আজকাল কত মেয়ে যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিয়ে করছে।’ কথাটা বকুল বলল নিশ্চিন্ত স্বরে। মেয়ের বিয়েকে কেন্দ্র করে এখন স্বামীর সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠছে। জীবনে এই প্রথম।
বকুলের লিস্টিতে শুধু তার মামারা আর দাদা—দিদি অর্থাৎ সুধাংশু এবং উমা। নিমন্ত্রণের কার্ড ছেপে আসার পর সে সন্ধ্যাবেলায় অর্চনার ঘর থেকে উমাকে ফোন করল।
‘দিদি আপনার কাছে এই রোববারেই যাচ্ছি একটা ভালো খবর নিয়ে।’
‘কী ভালো খবর?’
‘বলুন তো কী হতে পারে।’
‘ছেলেপুলে হবে নাকি?’
‘ধ্যেত, কী যে বলেন না। এই বয়সে আবার ওসব—’, হর্ষে, পুলকে বকুলের বাকরোধ হল।
‘এই বয়সে মানে? তোমার আর বয়স কত? তোমাকে দেখলে তো বিয়ে হয়েছে বলে মনেই হয় না। ভালো খবরটা কী? দিলীপবাবুকে তালাক দিয়ে আবার বিয়েটিয়ে করছ নাকি?’
সুখের সায়রে বকুল আবার অবগাহন করল। ‘আমি নয়, বিয়ে করছে আমার মেয়ে আর পাত্রটি হল মিহির।’
বলো কী! সত্যিই ভালো খবর। রোববার আসছ? মালিকেও নিয়ে এসো, ওকে আইবুড়ো ভাত খাওয়াব। এদের যে বিয়ে হতে পারে সেটা কিন্তু বকুল, আমি আঁচ করতুম। মিহির যেভাবে মালির দিকে তাকাত টাকাত, মুখচোখের ভাব যেরকম হয়ে যেত তাতেই বুঝে গেছলুম একটা কিছু হতে পারে।’
‘বিয়ের কথা মিহিরই পাড়ে।’
‘পাড়বেই তো, মালি তো মায়ের মতোই সুন্দরী।’
‘দিদি আপনি বড্ড আমার পেছনে লাগেন।’
‘আহা আমি যেন বাজে কথা বলছি মালির গড়নপেটন, মুখশ্রী তোমার মতো কি নয়?’
‘নিজের মেয়ে বলে বলছি না দিদি, মালি আমার থেকেও দেখতে ভালো, আমার থেকেও লম্বা, আর,’ ফোনে ঠোঁট প্রায় লাগিয়ে বকুল বলল, ‘আর ভীষণ সেক্সি। সেজন্যই তো ওকে নিয়ে আমার ভয় ছিল। বিয়েটা হয়ে গেলে আমি বেঁচে যাই।’
‘রোববার তা হলে ওকে নিয়ে আসছ তো?’
‘হ্যাঁ, এগারো—বারোটা নাগাদ যাব।’
মালির চারিদিকে ব্যস্ততা, সে কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত নয়। কোনো ব্যাপারেই আগ্রহ দেখায় না আবার উদাসীনতাও নেই।
তিনতলা থেকে সে প্রায় নামেই না। সেজজেঠির কাছ থেকে কয়েকটা সিনেমা ম্যাগাজিন নিয়ে এসেছে, তারই পাতা ওলটায়। টেপরেকর্ডারে ফিল্মের গান শোনে। মিহিরের দেওয়া তানপুরাটা তার ছোটো ঘরের এককোণে ফেলে রেখে দিয়েছে। নিজের অজান্তেই সে দিনে দু—তিনবার ক্যালেন্ডারের দিকে তাকায়।
সত্যি কী সমীরণের ফোন আসবে? নিশ্চয় আসবে। না আসবে না। আশায় এবং নিরাশায় দোলাদুলি করতে করতে মন ঠিক এইরকম অবস্থাটাই বেছে নেয়। ঝোঁকটা তখন বেশি পড়ে নৈরাশ্যের দিকেই। যতই তার মনে হতে থাকে সমীরণের ফোন আসবে না ততই তার ইন্দ্রিয়গুলো প্রখর হয়ে উঠতে শুরু করে, নিজেকে বিশ্লেষণ করার প্রবণতা বাড়ে। বহুবার সে নিজেকে প্রশ্ন করেছে, ‘ভুল করছি না তো?’ উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে অনেক রকমের উত্তর পায়। তাইতে সে ধাঁধায় পড়ে যায়।
বাড়িতে এখন উৎসবের মতো পরিবেশ। সবাই কোনো—না—কোনো ভাবে খুশির উত্তেজনা নিয়ে চলাফেরা করছে, কথা বলছে। সবথেকে বড়ো কথা, দিলীপরঞ্জন তার ভবিষ্যৎ পুঁজির অর্ধেকেরও বেশি ভাঙিয়ে এই উৎসবটা তৈরি করছে। বকুল তার অপমানিত জীবনকে সম্ভ্রম দেবার চেষ্টা করছে। এগুলোকে ধ্বংস করতে হবে ভাবতে মালবিকা বেদনা বোধ করে।
আবার সে এটাও ভাবে, যাকে ঘিরে ওরা আনন্দের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে তার ইচ্ছা—অনিচ্ছাকে কোনো দামই ওরা দিল না। উৎসবে বলি হবার জন্য তাকে রেওয়াজ করে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু কেন আমি পাঁঠা হব। প্রতিভাদি বলেছে, সে মেনে নেবে না। ভালো কথা। কিন্তু মেনে না নিয়ে সে কী পাচ্ছে এই ত্রিশ বছর বয়সে? সমীরণ মিত্তিরের কাছ থেকে অনেক পাবে ভেবে প্রতিভাদি, নিশ্চয় ওর সঙ্গে শুয়েছে। কিন্তু ভালোবেসে শুয়েছে কী? সমীরণের মধ্যে ভালোবাসা পাবার জন্য একটা কাঙাল রয়েছে। প্রতিভাদি কি সেই কাঙালটাকে, ভূরিভোজ করতে পেরেছে? সমীরণ ভীষণভাবে শরীর চায়। প্রতিভাদি কি ভীষণভাবে শরীর দিতে পেরেছে? আমি সেটা পারব।
