‘বিয়ের তোড়জোড় কতদূর?’
‘কালই তো সবে কথা হল। এখনও তো বিয়ের দিনই ঠিক হয়নি, তারপর পাকাদেখা, কেনাকাটা, নেমন্তন্ন করা।’
‘অ। তা হলে এখনও অনেক দেরি আছে।’
‘অনেক আর কোথায়? দিন ঠিক হলে সাত দিনেও বিয়ে হয়।’
মালবিকার মনে হল কালো কাচের আড়াল থেকে একজোড়া তীব্র দৃষ্টি তাকে লক্ষ করছে। তার অন্তঃস্থল পর্যন্ত দেখে নিচ্ছে।
‘মন শক্ত করতে পারবে?’
‘পারব।’ মালবিকা অচঞ্চল স্বরে জানাল।
‘বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?’
‘পারব।’ মালবিকার গলা এবারও কাঁপল না।
‘আর কিন্তু ফিরতে পারবে না।’
‘জানি।’ মালবিকার গলা কঠিন হল।
সমীরণ কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বলল, ‘ঠিক দু—হপ্তা পর তোমাকে ফোন করব। আজ কুড়ি তারিখ, চোদ্দো দিন পর চার তারিখ। দুপুর একটা থেকে সওয়া একটার মধ্যে ফোনের কাছে থাকবে। নম্বরটা আমার কাছে আছে।’
‘ফোনের কাছে সেজজেঠি থাকে।’
‘আমি সেইভাবেই কথা বলব।’
‘কী বলবে তুমি ফোনে?’
সমীরণের মুখে হাসি ফুটল। পাতলা ঠোঁট দুটো ছড়িয়ে গেল। সাদা দাঁতগুলো ঝলসানি দিল। তিলটা সরে গিয়ে ফিরে এল। ভ্রূ দুটো বেঁকে রয়েছে। মালবিকা বিমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। তার ইচ্ছে করছে ঝাঁপিয়ে ওর পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে ফালাফালা করে বুকে মুখটা ঘষতে। আর তার ভয় করছে না। কিছু একটা সমীরণ করবে তার জন্য। তাকে বাঁচাবে। মিহিরকে আর বিয়ে করতে হবে না। ওর ঘাড়ের সেই সাদাটা ওত পেতে রয়েছে। আমাকে সমীরণ বাঁচাবে।
মালবিকার মুখের উপর যা কিছু ফুটে উঠল সমীরণ তা লক্ষ করে যাচ্ছিল। ঝুঁকে মালবিকার মুখের দিকে মুখ এগিয়ে এনে গোপন কথা বলার মতো করে বলল, ‘বলব, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
সমীরণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মালবিকার দুই চোখের কোণ বেয়ে জল নামল। সে মোছার চেষ্টা করল না।
‘তোমাকে কখন বাড়ি ফিরতে হবে?’
‘চারটের ভেতরে যেতেই হবে, মাকে কথা দিয়ে এসেছি। যদি বাবা এসে পড়ে? এখন তো আমায় চোখে চোখে রাখবে।’
‘আমার মনে হয় মিহির তোমার মুভমেন্টের ওপর নজর রাখবে।’
‘মতলব এঁটে বিয়ে করতে চাইছে বললে, কী মতলব?’
‘সেটা কী ও খুলে আমায় বলবে? ওর কথা বলার ঢং থেকে মনে হল। হয়তো প্রতিভা ওকে কিছু বলে থাকতে পারে।’
প্রতিভা আর গান শেখাতে আসে না, মিহিরও আসে না গান শিখতে তা হলে ওদের দুজনের দেখা হবে কী করে? মালবিকা দ্রুত ভেবে নিল। যদি ওদের দেখা হয়ে থাকেও তা হলে প্রতিভা যা বলবে তা শুনলে মিহিরের তো তাকে বিয়ে করতে চাওয়া উচিত নয়। মালবিকা নিশ্চিন্ত বোধ করল, প্রতিভার সঙ্গে মিহিরের দেখা না হওয়া সম্পর্কে। কিন্তু মিহিরের উপর সমীরণ এত রেগে গেল কেন? কী বলেছে সে যেজন্য সমীরণ ‘শুয়োরের বাচ্চচা’ বলল!
‘এখন থেকে তুমি বাধ্য মেয়ের মতো বাড়িতে থাকবে। যে যা বলবে করবে। বিয়ে করতে রাজি নও, এসব কথা একদম বলবে না, কেমন? দেখি কী করা যায়।’
‘করবে তো?’
সমীরণ জবাব দিল না। শুধু তাকিয়ে রইল মালবিকার মুখের দিকে। ছমছম করে উঠল মালবিকার বুক। জীবনে এই প্রথম সে এমন একটা সংকটের মধ্যে পড়েছে, যেখানে সে পুরোপুরি অন্য একজনের নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে গেছে। এমন একটা কাজ তাকে করতে হবে যার ফলাফল সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার মধ্যে অদ্ভুত এক ধরনের উত্তেজনা, ছমছমে ভয়, রহস্যে ভরা ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে ব্যাপারটা তার কাছে জুয়া খেলার মতো লাগছে। যদি হার হয়? তাহলে কী যে তার অবস্থা হবে সে জানে না। মনে মনে সে বলল, ভগবান তুমি আমাকে দেখো।
সেইদিন সন্ধ্যাবেলায় মিহির এল। তার গাড়িতেই বকুল ও দিলীপরঞ্জনকে নিয়ে গেল তাদের বাড়িতে। ঘণ্টা দুই পরে তাদের সে ফিরিয়ে দিয়ে গেল। তিনতলায় আর উঠল না। উচ্ছ্বসিত বকুল মালবিকাকে বলল, ‘ওরা তো এইমাসেই বিয়ে দিতে চায়। মিহিরের মা বলল, পৌষ মাস পড়ে গেলে আরও প্রায় দু—মাস দেরি হয়ে যাবে। অঘ্রানের আজ চার তারিখ। আঠাশ তারিখই ঠিক হল। মাঝে চব্বিশটা দিন। কীভাবে যে কী হবে!’
মালবিকা চুপ করে রইল। তার কথা বলার কিছু নেই। বকুল তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। মুখে প্রতিবাদ না দেখে সে আশ্বস্ত হল। ‘আর না বলিসনি মালি। বিয়ের দিন পর্যন্ত পাকা হয়ে গেছে, এরপরও যদি এ—বিয়ে না তা হলে আমাদের মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না। না ওদের কাছে, না এই বাড়িতে। তোর বাবার তো টাকাকড়ি বলতে কিছুই নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে হাজার পঁয়ত্রিশ হয়তো তুলতে পারবে, এ ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি তো সোনাদানা নিয়ে এ—বাড়িতে আসিনি, শাশুড়ি দিয়েছিল সাড়ে তিন ভরির একটা গলার হার। তোর জেঠিরা যদি হাতে কানে গলায় একটা করে দেয়। উনি তাই কথা বলতে গেলেন দাদাদের সঙ্গে কিছু যদি পাওয়া যায়।’ মেয়ের হাত ধরল বকুল তারপর হাতটা কাঁধে রাখল।
‘তোমরা দিন যখন ঠিক করে ফেলেছ তারপর আর না বলি কী করে।’ মালবিকা নম্র করে চোখে মুখে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে বলল। বাবার জন্য তার কষ্ট হচ্ছে জীবনে এই প্রথম।
বকুলের বুক থেকে যেন পাষাণ ভার নেমে গেল। খুশি চাপতে চাপতে বলল, ‘দেখিস এ বিয়েতে তোর ভালোই হবে। বাপ—মা কি হাত—পা বেঁধে মেয়েকে জলে ফেলে দিতে চায়? টাকা না থাকলে সুখ—শান্তি আসে না। মিহির ছেলে ভালো, টাকাকড়িও আছে। দেখতে—শুনতেও তো খারাপ নয়।’
