মালবিকা কখনো এমন জায়গায় আসেনি। একটা হলঘরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে সে অন্য পাশে একটা ঘরে চড়া মেকআপ করা কয়েকজন বয়স্ক মহিলাকে তাস খেলতে দেখল। পুলের ধারে সার সার সাদা রং—করা টেবল ও কাঠের চেয়ার। প্রায় টেবলেই লোক বসে খাচ্ছে। বাচ্চচা ছেলেমেয়েরাও রয়েছে । ওরা যে টেবলে বসল তার পাশেরটিতে এক মাঝবয়সি মহিলা। মুখটা ভালো, শরীর ভারী। দুজন পুরুষের সঙ্গে বসে। ওরা সবাই বিয়ার খাচ্ছে। মহিলাটি সমীরণের দিকে তাকিয়ে হাসল।
‘তোমায় চেনে।’
‘আগে থিয়েটার করত এখন যাত্রায় গেছে। অনেকদিন পরে দেখছি।’ কথাটা বলে টেবলে এসে দাঁড়ানো ওয়েটারের সেলাম নিয়ে সমীরণ বলল, ‘একটা বিয়ার, একটা অরেঞ্জ স্কোয়াশ, এই দিয়েই শুরু করা যাক। খাবারটা পরে হবে না কি এখনই বলব?’
মালবিকার কাল থেকেই খিদে পাচ্ছে না। উত্তেজনা, উদবেগ, ভয় সব মিলিয়ে খাওয়ার ইচ্ছেটা লোপ পেয়ে গেছে।
‘আমার খিদে নেই।’
সমীরণ অপেক্ষমাণ ওয়েটারকে বলল, ‘ঠিক আছে আগে এটাই আনো।’ তারপর মালবিকার দিকে তাকিয়ে রইল কোনো কথা না বলে।
মালবিকার বুকটা কেঁপে গেল একবার। কালো কাচের চশমা পরা একটা নিথর মুখ কথা না বলে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন একটা মুখোশ। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। আর তা না করতে পারলে সে আশ্বাস পাবে কী করে? তার মনে হচ্ছে সমীরণ তাকে কাছে আসতে দিতে চায় না।
‘আমার…আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’ মালবিকা চোখ নামিয়ে আবার তুলল। সমীরণের মুখে কোনো ভাবান্তর হতে সে দেখল না। শুনে চমকে উঠল না কেন সমীরণ!
‘কী করব?’ আকুল স্বরে জানতে চাইল মালবিকা।
জবাব পেল না।
‘শুনতে পাচ্ছ?’
‘আজ সকালে টেলিফোন করে মিহির আমাকে বলেছে।’ সমীরণের কণ্ঠ শীতল, তাতে বিচলন নেই।
‘কী বলেছে?’ মালবিকা টেবলে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ল।
‘অনেক কথাই বলেছে। সবই আমার সম্পর্কে, তোমার তা শুনে কাজ নেই। শুয়োরের বাচ্চচাকে আমি শিক্ষা দেব।’
মুখোশে কোনো ভাঁজ পড়তে দেখল না মালবিকা। ক্রোধ চাপার চেষ্টায় যে বিকৃতি ঘটে তার লেশমাত্র নেই। স্বরেও কোনো বৈকল্য নেই।
‘বিয়ে তুমি করবে না। করলে তোমার সর্বনাশ হবে। ওর কথা শুনে মনে হল, কোনো মতলব এঁটে বিয়েটা করতে চাইছে। একবার গোবরডাঙার কথাটা বলল। ওর গাড়ি থেকে আমার গাড়িতে, আমি নাকি জোর করে তোমাকে তুলিয়েছি।’
‘সে কী! প্রতিভাদির অনুরোধেই তো আমি তোমার গাড়িতে গেছি।’ মালবিকার সাহস হল না, মিহিরকে সে আসলে তখন কী বলেছিল, এখন সে—কথা বলতে।
‘তাই বলেছিলে না আমার অনুরোধে বলেছিলে?’
মালবিকার বুক ধড়াস করে উঠল ভয়ে। মিথ্যা একবার যখন বলেইছে তখন সেটাই আঁকড়ে থাকা ভালো।
‘মিহিরকে আমি প্রতিভাদির কথাই বলেছি। হয়তো ও ধরে নিয়েছে—’, সমীরণের হাত তোলা দেখে সে কথা থামাল। বেয়ারা এসে গেছে টেবলে। কমলারঙের পানীয় মালবিকার সামনে রাখল। গ্লাসে বিয়ার ঢেলে বোতলটা রেখে বিলে সই করাল। সমীরণ তাকে বলল, ‘দু—প্লেট ফিশ ফিঙ্গার দিয়ো।’
‘আমি তোমার নামই করিনি। কিন্তু এসব কথা ফোনে তুলল কেন?’ বেয়ারা চলে যেতেই মালবিকা বলল।
‘জানি না। পুরনো একটা ঘটনা তুলে বলল রেপ করার জন্য আমি মেয়েদের গাড়িতে তুলি। ও নাকি আমাকে এক্সপোজ করবে। আমার খপ্পর থেকে তোমাকে উদ্ধার করবে…শুয়োরের বাচ্চচা, গাধার মতো একটা গলা, গান গেয়ে কিনা নাম করবে! সমীরণ মিত্তিরের রাইভাল হবে!’ সমীরণ একচুমুকে গ্লাসের তিনভাগ শেষ করে আবার বোতল থেকে ঢেলে পূর্ণ করল।
মালবিকা মুখোশটায় এবার ফাটল দেখছে। গলার স্বরে উত্তাপ। ‘বিয়ে তুমি করবে না। করলেও মিহিরকে নয়।’
‘মাকে আমি তাই বলেছি। ওকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাবা বলেছে বিয়ে করতেই হবে, মা—ও তাই চায়। আমি এখন কী করব?’ মালবিকার অভ্যন্তরে ধস নামছে। কিছু একটা আঁকড়ে ধরার জন্য সে হাতড়াচ্ছে।
‘আমার বিরুদ্ধে বাড়ির সবাই। আমার কোনো সহায় নেই। আমাকে তো বাবার আশ্রয়েই থাকতে হয়!’ মালবিকার হঠাৎ—ই প্রতিভার একটা কথা এখন মনে পড়ল: ‘লেখাপড়া শিখে এসব আমি মেনে নেব না’, ‘বলির পাঁঠা আমি হব না।’ মনে মনে সে বলল, কিন্তু প্রতিভাদি আপনি তবু লেখাপড়া আর গান শিখেছেন, আমি যে কিছুই শিখিনি। আমাকে তো মেনে নিতেই হবে। মালবিকা মাথা নীচু করে রইল।
বিয়ার শেষ করে সমীরণ মুখ ঘুরিয়ে একটা আঙুল তুলে বেয়ারাকে ইশারা করল আর একটা বোতল আনার জন্য।
‘আমাকে কিছু বলো।’
‘বলেইছি তো। এ—বিয়ে তুমি করবে না।’
‘বাবা লাথি মেরে বার করে দেবে বাড়ি থেকে।’
‘দিলে বেরিয়ে আসবে।’
‘যাব কোথায়, থাকব কোথায়?’
‘চট করে এখনই বলা সম্ভব নয়। ভেবে বলতে হবে। রিসক আছে।’
পাশের টেবলে হাসির শব্দ উঠল। মালবিকা মুখ ঘুরিয়ে দেখল মহিলার আঙুলে সিগারেট। বুকের আঁচল সরে গেছে। টেবলের পাশে মেঝেয় পাঁচ—ছটা খালি বিয়ারের বোতল।
ফিশ ফিঙ্গার আর বিয়ার এল। বিলে সই হল। সমীরণ গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ‘খাচ্ছ না যে?’
‘খেতে ইচ্ছে করছে না, আচ্ছা খাচ্ছি।’ মালবিকা এক চুমুকে স্কোয়াশ শেষ করল। একটা ফিশ ফিঙ্গার তুলে কামড় দিল। চিবিয়ে গলা দিয়ে নামাবার জোর পাচ্ছে না। টুকরোটা মুখের মধ্যে রেখে দিল।
গ্লাস শেষ করে সমীরণ একদৃষ্টে পুলের জলের দিকে তাকিয়ে। মালবিকা চিবোতে শুরু করল। তারপর আর একটা তুলে সেটা হাতে ধরে বসে থাকল। মিনিট পাঁচেক পর দ্বিতীয় বোতলটা শেষ করে সমীরণ মুখ ফেরাল। মুখ লালচে দেখাচ্ছে।
