সমীরণের কাছ থেকে জীবনে প্রথম পাওয়া মাদকীয় সুখ দেহে বহন করে, একটা রমণীয় ভবিষ্যতের স্বপ্ন চোখে ধরিয়ে, উছলে ওঠা রোমাঞ্চের ধকল সামলাতে সামলাতে বাড়ি ফিরেই এ কী অবস্থার মধ্যে পড়তে হল! মালবিকা নিজের ঘরে খাটে বসল। মাথার মধ্যে এলোমেলো বাতাস আর শনশন শব্দ। বিছানায় গড়িয়ে পড়ে সে কপালের উপর দুই বাহু রেখে চোখ বন্ধ করল। এখন তার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
আধো ঘুম, আধো জাগরণের মধ্যে সে টের পেল বাবা ফিরল। মদ খেয়ে আসেনি। দুজনের কথা হচ্ছে তাকে নিয়েই। বিয়েরই কথা। একবার বাবা চেঁচিয়ে উঠল, ‘চাবকে পিঠের চামড়া তুলে দোব।’
‘আস্তে আস্তে।’
‘বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দাও। গান শিখতে যাওয়া?…অত বাইরে বেরোলে বিগড়োবে না?…অপছন্দ! বাবা—মা যাকে পছন্দ করে দেবে তাকেই বিয়ে করতে হবে।…এসব হয়েছে তোমার জন্য।’
‘আমার জন্য?’
‘তবে না তো কী। যেমন বিদ্যেধরী মা তেমনি তার মেয়ে।’
‘মেয়ে তো তোমারও।’
‘হ্যাঁ আমারও। আর সেই জন্যই বলছি বাইরে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। নিজের কথা মনে নেই? কত ছেলে চরিয়ে বেড়াতে? আমাকে ফাঁসিয়ে তো বিয়েটা করলে, দ্যাখো গে মেয়ে এবার কাকে ফাঁসাচ্ছে।’
শুনতে শুনতে মালবিকার মনে হচ্ছিল, বাবা যদি মদ খেয়ে এসে মাকে দু—ঘা দিত তাহলেও ভালো ছিল। রাগটা বেরিয়ে গেলেই ঘুমিয়ে পড়ত। এভাবে নোংরা নোংরা কথা তা হলে আর শুনতে হত না।
কিছুক্ষণ পর তার মনে হল, সমীরণকে সে কি ফাঁসাচ্ছে? সে—ও কি প্রেগনান্ট হবে! শিউরে উঠে মনে মনে বলল, না, না, না, এভাবে নয়। তা হলে মায়ের মতো দশা হবে তার। বরং সমীরণের সঙ্গে কথা বলবে, ওর পরামর্শ চাইবে…পরামর্শ নয়, একটা আশ্বাস।
‘মিহিরের বাড়িতে গিয়ে ওর বাবা—মার সঙ্গে কথা বলে দিন পাকা করব। তুমিও যাবে। দেনা—পাওনার কথা কিছু বলেছে?’
‘শুধু শাঁখা—সিঁদুর। ওরাই গয়না দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে যাবে, বরযাত্রী খাওয়ানোর খরচও দেবে।’
‘খরচ তো আমাদেরও আছে। টাকার জোগাড় করতে হবে। খেতে দাও।’
পরদিন দুপুরে মালবিকা সেজোজেঠি অর্চনার ঘর থেকে সমীরণকে ফোন করল। অবুকে মালবিকাই সঙ্গে নিয়ে গিয়ে গানের ক্লাসে ভরতি করিয়ে দিয়েছে। চাকরের সঙ্গে সে বাসে যায় ও ফেরে। মালবিকার প্রতি অর্চনা প্রসন্ন।
ফোন ধরল সমীরণের চাকর অবনী।
‘কে বলছেন?’
‘আমি মালবিকা, সমীরণদাকে একবার ডেকে দেবে?’
‘দাদা বাইরের ঘরে কথা বলছে, লোক এয়েছে।’
‘বলো এক মিনিটের জন্য আসতে।’ মালবিকা আড়চোখে অর্চনার দিকে তাকাল। পিছন ফিরে বালিশে ওয়াড় পরাচ্ছে। সমীরণের ফোন শোবার ঘরে। নিশ্চয় শিঞ্জিনী এখন ঘরে নেই, থাকলে ফোনটা সেই ধরত।
‘হ্যালো, আমি মালি। একটু কথা বলার ছিল।’ আড়চোখে সে অর্চনাকে দেখে নিল। ওয়াড় পরানো আর শেষই হচ্ছে না।
‘খুব জরুরি কি?’
‘হ্যাঁ।’
‘বাড়িতে কিছু কি বলেছে দেরি হওয়ার জন্য?’ সমীরণের স্বরে উৎকণ্ঠা।
‘না, অন্য ব্যাপারে কথা বলব।’
‘কাল বললে হবে?’
‘হবে।’ গলা নামিয়ে মালবিকা বলল, ‘বাড়িতে নয়।’
ওদিকে কিছুক্ষণ চুপ। ‘সিরিয়াস কিছু?’
‘হ্যাঁ।’
‘কাল একটায় কলামন্দিরের সামনে থেকো, তুলে নিয়ে ক্লাবে যাব। ওখানেই লাঞ্চ। ঠিকমতো চিনে যেতে পারবে তো?’
‘পারব। ঠিক আছে।’
ফোন রাখতেই অর্চনা বলল, ‘তোর মা—র কাছে কাল শুনলুম। মিহিরের বাড়িতে কবে কথা বলতে যাবে?’
‘আজ—কালের মধ্যে যাবে।’
‘মিহিরও তো গান শেখে, এবার দুজনে একসঙ্গে শিখবি। স্বামী—স্ত্রীর একই রকমের হবি থাকলে মন কষাকষি হয় না।’
‘দেখি হয় কি না হয়।’ মালবিকা পা বাড়াল লাজুক সুরে কথাটা বলে।
‘দেখিস তোদের মনের মিল হবে, ছেলেটা ভালো।’
‘আর মেয়েটা ভালো নয় বুঝি?’
মালবিকা উত্তর পাওয়ার জন্য আর অপেক্ষা করেনি।
পরদিন একটার আগেই মালবিকা থিয়েটার রোডের মোড়ে মিনিবাস থেকে নামল।
সার্কুলার রোড পার হয়ে কলামন্দিরের ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতঘড়ি দেখে মনে মনে সময়ের একটা হিসেব করল। সমীরণের সঙ্গে কথা বলা, খাওয়া, বাড়ি ফিরে যাওয়া চারটের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হবে। সকালে দিলীপরঞ্জন চাঁচাছোলা ভাষায় তাকে জানিয়ে দিয়েছে, বাড়ি থেকে বেরোলে ঠ্যাং ভেঙে দেবে। মালবিকা বিশ্বাস করে তার বাবা এই কাজটা করতে পারে। বকুল বারণ করেছিল। চারটের মধ্যে ফিরে আসবে কথা দিয়ে সে বেরিয়েছে। শুধু বলেছিল, ‘সমীরণদাকে বলে আসব, এবার থেকে আর গান শিখতে যাব না।’
ট্যাক্সিটা তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে দাঁড়াল। রোদ—চশমা পরা সমীরণের মুখ জানলা দিয়ে একটু বার হয়ে তার দিকে তাকিয়ে। মালবিকা বুঝতে পারেনি। হাতছানিটা দেখে সে দ্রুত গিয়ে ট্যাক্সিতে উঠল।
‘চিনতেই পারিনি।’
‘চলিয়ে ভাই।’ ট্যাক্সি চলতে শুরু করার পর সমীরণ বলল, ‘সেই জন্যই পরা। মানুষের চোখ ডেকে দিলে তাকে চেনা শক্ত।’
ট্যাক্সিওয়ালাকে সমীরণ বলেই রেখেছিল কোথায় যেতে হবে। ফটক দিয়ে ঢুকে ক্লাবের দরজায় ট্যাক্সি থামল। বাড়িটার জীর্ণ অবস্থা। কয়েক ধাপ উঠে সামনেই কাউন্টার। বাঁ দিকে কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। ধাপগুলো ক্ষয়া। ইংরেজ আমলের ক্লাব। কাউন্টারে টাই পরা মাঝবয়সি একটি লোক বসে। দেখে মনে হয় পুরোনো কর্মচারী। সমীরণকে দেখে হাসল। খাতায় সই করে সমীরণ বলল, ‘সুইমিং পুলের ধারেই বসা যাক।’
